ফিরেছে নওগাঁর ৫ প্রবাসীর লাশ, অপেক্ষায় স্বজনেরা

ফিরেছে নওগাঁর ৫ প্রবাসীর লাশ, অপেক্ষায় স্বজনেরা
ছেলের লাশের প্রতীক্ষায় এক মা। ছবি: আমার দেশ

অবশেষে ফুরোচ্ছে দীর্ঘ অপেক্ষা আর অনিশ্চয়তার প্রহর। সৌদি আরবের রিয়াদে মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারানো নওগাঁর বাকি পাঁচ প্রবাসীর মরদেহ শনিবার দেশে পৌঁছেছে। আড়াই মাস পর প্রিয়জনের নিথর দেহ ফেরায় স্বজনদের শোকের ছায়া আরও ঘনীভূত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত হওয়া বাকি পাঁচ প্রবাসীর মরদেহ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ‘বিজি-৩৩৬’ ফ্লাইটে শনিবার সকাল ৮টা ০৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। বিমানবন্দর থেকে নিহত শাহিনের স্ত্রী মীম স্বামীর লাশ গ্রহণ করে নওগাঁর উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন।

লাশ হয়ে দেশে ফেরা পাঁচ প্রবাসী হলেন—নওগাঁ পৌর এলাকার পার নওগাঁর শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভ, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনগর গ্রামের সাগর আলী।

গত ৯ আগস্ট রিয়াদের একটি সোফা কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মোট ১৬ জন বাংলাদেশি প্রবাসীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। তাঁদের মধ্যে ১২ জনই ছিলেন নওগাঁর। ২৭ আগস্ট প্রথম দফায় সাতজনের মরদেহ দেশে আনা হলেও আইনি ও পরিচয় শনাক্তকরণ জটিলতায় বাকি পাঁচজনের লাশ পড়ে ছিল সৌদির হিমঘরে।

দেশে আনা নিহত শাহীনের স্ত্রী মীম জানান, শাহীন মাত্র চার মাসের শিশু থাকা অবস্থায় তাঁর বাবা মজনু রহমান মারা যান। মা নার্গিস বেগম চরম অভাব-অনটনের সঙ্গে যুদ্ধ করে ছেলেকে বড় করেন। নিজস্ব কোনো ভিটেমাটি না থাকায় তাঁরা ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। একটু বড় হয়ে শাহীন দর্জির কাজ শিখে ঢাকার পোশাক কারখানায় চাকরি নেন। ২০১৮ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। তাঁদের সাত বছর বয়সী ছেলে হামিম ও নয় মাস বয়সী মেয়ে আয়রা মনি রয়েছে। করোনা মহামারীর সময় চাকরি হারালে শাহীন নওগাঁয় ফিরে আসেন।

তিনি আরও জানান, এ বছরই ৬-৭ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ৪ এপ্রিল সৌদিতে যান শাহীন। একদিকে ঋণের বোঝা, অন্যদিকে দুই শিশু সন্তান ও বৃদ্ধা শাশুড়িকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও অর্থকষ্টে দিন কাটছে তাঁদের। মীম আক্ষেপ করে বলেন, "কোথায় থাকব, কী খাব—কিছুই জানি না। শেষ পর্যন্ত পেলাম তো স্বামীর লাশ!" অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এ পর্যন্ত সরকার বা সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা তাঁরা পাননি। নওগাঁ সদর উপজেলা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে লাশ নিয়ে আসার খবর দেওয়া হয়েছিল।

শাহীনের বন্ধুরা পার নওগাঁ বারেকের মসজিদ সংলগ্ন গোরস্থানে লাশ দাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

নিহত শাহীনের বৃদ্ধা মা নার্গিস বেগম বিলাপ করতে করতে বলেন, "আমার একটাই সন্তান, তাকেও হারালাম! ছেলেবউ আর নাতি-নাতনিদের নিয়ে এখন কী করব, কোথায় থাকব? ছেলেকে তো আর ফিরে পাব না। সরকার সহায়তা না করলে আমাদের মরা ছাড়া কোনো পথ নেই।"

নওগাঁ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নূরুল আমিন জানান, আইনি প্রক্রিয়া ও ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও রিয়াদ দূতাবাসের সমন্বয়ে দ্রুততম সময়ে মরদেহগুলো দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরকারি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, নিহতদের মরদেহ বিনা খরচে পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন