কোভিড-১৯ মহামারির সময় টিকা কেনাকাটাসহ এ খাতে বরাদ্দ দেওয়া ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের নথিপত্র খুঁজে পাচ্ছে না সরকারের দপ্তরগুলো। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে নথি চেয়ে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও বিভিন্ন দপ্তর, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার পক্ষ থেকে সাড়া মিলছে না। অর্থ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও দুদক কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন।
কর্মকর্তাদের দাবি, করোনাভাইরাসের টিকা দেওয়ার জন্য অগ্রিম বাবদ নেওয়া ১,২০০ কোটি টাকা গত পাঁচ বছরেও ভারতের প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আদায় করতে পারেনি বাংলাদেশ। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা কেনার জন্য অগ্রিম বাবদ দুই দফায় এ বিপুল পরিমাণ টাকা পরিশোধ করে। এ টিকা আমদানিতে এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লি.। অগ্রিম নিয়েও টিকা না দেওয়ায় টাকা ফেরত চেয়ে ওই সময়ই অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেওয়া হয়। পাঁচ বছর পার হয়ে গেলেও ভারত থেকে ওই টাকা বাংলাদেশ আর ফেরত পায়নি বলে জানিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
ভারতকে দেওয়া টাকাসহ করোনাকালীন এ খাতে বরাদ্দ ও ব্যয়ের খাত এবং অনিয়মের ঘটনা অনুসন্ধান করছে দুদক। অর্থ মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, করোনার টিকা দেওয়ার নামে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ২০২০ সাল থেকে ২২ সাল পর্যন্ত তিন বছরে মোট ব্যয় করেছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদ ও দুদক সূত্র জানিয়েছে, এর মধ্যে অন্তত ২২ হাজার কোটি টাকা তসরুপ হয়েছে। টিকা কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত ছিলেন পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপসহ কয়েকটি সংস্থা ও পতিত সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকসহ শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক ব্যক্তি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) অনুসন্ধানেও কমপক্ষে ২২ হাজার কোটি টাকা অপচয় ও দুর্নীতির তথ্য উঠে এসেছে। টিকা ও টিকার সরঞ্জামাদি কেনাকাটায় এ দুর্নীতি হয়েছে বলে তাদের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
দুদক অনুসন্ধান টিমের সদস্যরা জানিয়েছেন, বিভিন্ন দপ্তর, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে এ সংক্রান্ত নথি, সিদ্ধান্তপত্র, আমদানি সংক্রান্ত তথ্য ও আর্থিক বিবরণী চেয়ে গত মার্চ থেকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে, স্বাস্থ্য খাতে করোনাকালীন অর্থ বরাদ্দ ও টিকা কেনাকাটাসহ এ-সংক্রান্ত নথি সংগ্রহ ও দুদকের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
আওয়ামী লীগ সরকারের এ টিকা কেলেঙ্কারির ঘটনা অনুসন্ধান করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুদকে অভিযোগ দেওয়া হয়। দেড় বছরের বেশি সময় পার হলেও দুদক এখন পর্যন্ত প্রতিবেদন দিতে পারেনি। তবে এর জন্য বিভিন্ন মহলের অসহযোগিতাকে দায়ী করেন দুদক কর্মকর্তারা। অপরদিকে সরকারের নীতি নির্ধারকরা জানিয়েছেন, দুদকের চাহিদা অনুযায়ী নথিপত্র যথাযথভাবে দেওয়া হচ্ছে। তবে, কিছু কিছু নথি না পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের কর্মকর্তারা।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখার এক কর্মকর্তা জানান, করোনাকালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একজন অতিরিক্ত সচিবের তদারকিতে একটি বিশেষ সেল গঠন করা হলেও অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয়ের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক ছিল না। পুরো বিষয়টি দেখভাল করা হতো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে। ফলে এসবের নথিপত্রও সেখানেই ছিল বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় ভারত টিকা দেবে বলে বাংলাদেশের কাছ থেকে অগ্রিম ১,২০০ কোটি টাকা নিলেও টিকা দেয়নি। টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেটাও ভঙ্গ করেছে প্রতিবেশী দেশটি। এমন অভিযোগ ছিল তৎকালীন সরকারের অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামালেরও। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের কাছ থেকে পাওনা আদায়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
করোনার টিকায় বরাদ্দ ও ব্যয় কত
বাংলাদেশে ২০২০ সালের ৮ মার্চ প্রথম করোনা শনাক্ত হয়। ওই বছরের ১৮ মার্চ করোনা আক্রান্ত হয়ে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। একই বছরের ডিসেম্বরে করোনা (কোভিড–১৯) মহামারি মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জরুরিভিত্তিতে টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায় এবং প্রটোকল ঘোষণা করে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঘোষণার পরপরই সরকার দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি কাটছাঁট করে টিকা কার্যক্রম শুরু করার জন্য জরুরিভিত্তিতে ১০ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করে। পরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে একজন অতিরিক্ত সচিবের তদারকিতে বিশেষ করোনা সেল গঠন করা হয়।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখার এক কর্মকর্তা জানান, ২০২১-২২ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতের জন্য মোট ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। এর বাইরেও ওই অর্থবছরে করোনার টিকা কেনাকাটা বাবদ অতিরিক্ত আরো ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করে সরকার। পরের অর্থবছরে করোনার জন্য বিশেষ ৫,০০০ কোটি টাকাসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মোট বরাদ্দ করা হয় ৩৬ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা। সে সময় বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী মোস্তফা কামাল বলেন, এ বরাদ্দের বাইরেও করোনার টিকা কিনতে টাকা লাগলে তা বরাদ্দ দেওয়া হবে।
বিশেষ বরাদ্দসহ দুই অর্থবছরে করোনার জন্য মোট ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ও ব্যয় হয়েছে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখা থেকে তৈরি করা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ‘করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশ বিশ্বের রোল মডেল’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ একদিনেই এক কোটি ২০ লাখ ডোজ টিকা দিয়ে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। এ টিকা ক্রয়, রক্ষণাবেক্ষণ ও টিকাদান কার্যক্রমসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রমে সরকারের প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
করোনার টিকা কার্যক্রম শেষে এ খাতের বরাদ্দের বিষয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘করোনা মহামারিতে আমরা পানির মতো টাকা খরচ করেছি। টিকা শেষ হয়ে গেলে বিশেষ বিমান পাঠিয়ে টিকা এনেছি। এগুলো সংরক্ষণে ডিপ ফ্রিজ কিনতেও অনেক টাকা ব্যয় হয়েছে। করোনা রোগীদের চিকিৎসায় হাসপাতাল ভাড়া করতে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়েছে। ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী প্রত্যেককেই বিশেষ ভাতা দিয়েছি। এসব খরচ আমরাই বহন করেছি। কারো থেকে একটা পয়সাও নেইনি।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বাজেট শাখার একজন কর্মকর্তা জানান, করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার প্রথম দিকেই ২০২০ সালের জুনে ‘কোভিড–১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস’ নামে ১,১১৭ কোটি টাকায় একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। ওই বছরের ডিসেম্বরে করোনার টিকা কেনা ও সরবরাহের জন্য ৬,৮১৬ কোটি টাকার আরো একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। এসব নথিপত্র দুদককে সরবরাহের কথাও জানান ওই কর্মকর্তা।
টিকা কেনাকাটায় মহাদুর্নীতি
করোনায় সরকারের হিসাবমতে, ৪০ হাজার কোটি টাকা খরচের কথা বলা হলেও এ খাতে বড় ধরনের দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপচয় হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে টিআইবি। সংস্থাটির ‘করোনাভাইরাস সংকট মোকাবিলায় সুশাসন : অন্তর্ভুক্তি ও স্বচ্ছতার চ্যালেঞ্জ’ শিরোনামে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টিকা সরবরাহকারী দেশগুলোর টিকার মূল্যহার, পরিবহন, সংরক্ষণ, টিকাকর্মী নিয়োগ এবং তাদের বেতন-ভাতাসহ সব ধরনের খরচ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এর ব্যয় কোনোভাবেই ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি নয়। সে হিসাবে অন্তত ২২ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে।
জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরিপ্রেক্ষিতে দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার করোনার টিকা কেলেঙ্কারির ঘটনা তদন্ত ও অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেয়। এ বিষয়টি অনুসন্ধানের জন্য দুদকে একটি অভিযোগ দেয় বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদও (বিএমআরসি)।
২০২৫ সালের ১৭ মার্চ দেওয়া এ অভিযোগের বর্ণনায় বলা হয়েছে, করোনার টিকা কেনাকাটা বাবদ শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের নেতৃত্বে একটি চক্র ২২ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। দুদক এ অভিযোগ আমলে নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে।
বিএমআরসির এ অভিযোগের অনুসন্ধানের বিষয়ে দুদকের তৎকালীন মহাপরিচালক আক্তার হোসেন বলেছিলেন, করোনা ভাইরাসের টিকা কেনার আড়ালে রাষ্ট্রের ২২ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সালমান এফ রহমান ও বেক্সিমকো ফার্মা এবং এর সঙ্গে জড়িত অন্যদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। অভিযোগ অনুসন্ধানের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সম্প্রতি অবসরে যাওয়া এ কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এটির অনুসন্ধান করছে। পরে তারা কর্তৃপক্ষের কাছে পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্য তাদের প্রতিবেদন পেশ করবে। এটি দুদক আইনের স্বাভাবিক বিধান। অনুসন্ধানের বিষয়ে দুদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, টিকা কেনাকাটায় আর্থিক লেনদেনের অনিয়ম খতিয়ে দেখতে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে এ সংক্রান্ত নথিপত্র ও তথ্য চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও সরকার ঘোষিত বরাদ্দ, ব্যয় ও টিকা সরবরাহকারীদের মূল্য এবং লেনদেনের নথিপত্র তলব করা হয়েছে।
ভারত ফেরত দেয়নি ১,২০০ কোটি টাকা
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ সরকার ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের মাধ্যমে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার করোনার টিকা আমদানির জন্য একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি করে। এ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ভেঙে ভারতকে ১,২০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী ভারতের ৩০ কোটি ডোজ টিকা দেওয়ার কথা ছিল। প্রথম চালানে তারা বাংলাদেশকে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার (কোভিশিল্ড) ২০ লাখ ডোজ টিকা দিয়েছিল। এরপরই ভারত তাদের নিজস্ব করোনা পরিস্থিতির কারণে টিকা রপ্তানি বন্ধ করে দেয়।
ওই পরিস্থিতিতে ভারতকে দেওয়া টাকা ফেরতের বিষয়ে ওই সময়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামালের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, করোনার টিকা আমদানির জন্য সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তি করেছি। টিকা দিতে না পারলে অবশ্যই টাকা ফেরত পাব। ইতোমধ্যেই আমরা টাকা ফেরত চেয়ে ভারতকে চিঠিও দিয়েছি।
ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে ভারতকে দেওয়া টাকা বাংলাদেশ ফেরত পেয়েছে, এমন তথ্য নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারেননি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলে সেখানকার কর্মকর্তারা স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বাজেট শাখায় যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। তবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বাজেট শাখার কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি। তারা জানান, ২০২৩ সালের পর করোনার টিকা সংক্রান্ত কোনো নথিপত্র এখানে নেই। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেই তদারকি করা হয়েছিল।
দুদক ও সরকারের বক্তব্য
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ড. আ ন ম বজলুর রশীদের কাছে আমার দেশ-এর প্রশ্ন ছিল, ২০২০ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত কোভিড-১৯ অতিমারির সময়ে টিকা ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনায় ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। এর মধ্য থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা অনিয়ম হয়েছে। এ ধরনের একটি অভিযোগের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে দুদকে। তবে সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়ে নথি পাচ্ছেন না। এ বিষয়টি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ কীভাবে দেখছে। এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনুসন্ধানে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে ও হবে।
করোনার টিকা কেলেঙ্কারির ঘটনা অনুসন্ধানের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করা হয় দুদক চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি বলেন, বিষয়টি এখনো অনুসন্ধানের পর্যায়ে রয়েছে। যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষের পর নথি পেলে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে।
করোনার টিকা কেলেঙ্কারির ঘটনা অনুসন্ধান করছে দুদকের উপ-পরিচালক জাহিদ কালামের নেতৃত্বে একটি টিম। টিমের একজন সদস্য আমার দেশকে বলেন, অভিযোগের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, আর্থিক লেনদেন ও নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের নানা দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত টিমের অপর এক কর্মকর্তা বলেন, তৎকালীন ক্ষমতাসীন প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট দেশীয় টিকা উৎপাদনের পথ রুদ্ধ করে বিদেশ থেকে টিকা আমদানির পথকে অগ্রাধিকার দেয়। টিকা আমদানি, সরবরাহ ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের নামে একটি চক্র অন্তত ২২ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে আমাদের কাছে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, বঙ্গভ্যাক্সের অনুমোদন প্রক্রিয়া শুরু হলে গ্লোব বায়োটেককে বেক্সিমকোর সঙ্গে যৌথ শেয়ারে যেতে চাপ দেওয়া হয়। এ প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় দেশীয় এ উদ্যোগকে নানা অজুহাতে আটকে দেওয়া হয়।
তথ্য প্রদানে বাধ্যবাধকতা রয়েছে
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, দুদকের পক্ষ থেকে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান বা তদন্তের স্বার্থে তথ্য চেয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সাড়া না পাওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আইন লংঘনের শামিল। তথ্যপ্রদানে অসহযোগিতার তথ্য যদি সঠিক হয় এবং তা যদি যৌক্তিক কারণবিহীন হয়, তবে তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি-সুরক্ষাকারী অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হবে। অন্যদিকে দুদকেরও শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিষ্ক্রিয়তার কারণে স্থবির হয়ে থাকার যৌক্তিকতা নেই। তথ্য সংগ্রহে আইনের আশ্রয়ের পাশাপাশি নিজস্ব পেশাগত উৎকর্ষের মাধ্যমে তদন্ত করার চেষ্টা করা উচিত বলেও জানান তিনি।
সালমান এফ রহমান এখন কারাবন্দি আর জাহিদ মালেক আত্মগোপনে থাকায় এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তাদের প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করা হলেও সেখানকার কেউ এ ব্যাপারে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


