হাসিনার ‘সবুজ সংকেতের’ প্রমাণ মিলেছে

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত রিপোর্ট চাপা আট মাস

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত রিপোর্ট চাপা আট মাস
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডে নিহত হন ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন।

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডে নিহত হন ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন।

পিলখানা হত্যাকাণ্ডে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সুপরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যান এবং ভারতের সরাসরি সম্পৃক্ততার অকাট্য প্রমাণ মিলেছে। জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘সবুজ সংকেত’ এবং একটি সমান্তরাল কমান্ড-কাঠামো তৈরির ভয়ংকর চিত্র উঠে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

গত বছরের ৩০ নভেম্বর তদন্ত কমিশনের ২১১ পৃষ্ঠার রিপোর্ট জমা দেওয়ার আট মাসেও তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

এদিকে, পিলখানার ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলাও হয়নি। সরকারের এমন রহস্যজনক নীরবতায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরা।

সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর মেজর জেনারেল (অব.) এ এল এম ফজলুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের ‘জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন’ তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এ রিপোর্ট জমা দেয়। কমিশন-প্রধান সে সময় স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, রিপোর্টটি ‘আনক্লাসিফায়েড’ এবং সরকার তা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে পারে। ড. ইউনূসও আশ্বস্ত করেছিলেন, এ প্রতিবেদনের মাধ্যমে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের অন্ধকার অধ্যায়ের অবসান ঘটবে। কিন্তু দীর্ঘ আট মাসেও ওই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশে সরকারি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে পিলখানা হত্যাকাণ্ডে ভারতের সরাসরি সম্পৃক্ততা, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হাসিনার ‘সবুজ সংকেত’ এবং একটি সমান্তরাল কমান্ড কাঠামো তৈরির ভয়ংকর চিত্র ফুটে উঠেছে। ১১৪ কর্মদিবস ধরে পরিচালিত ওই তদন্তে ৩০০-এর বেশি সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন শহীদ পরিবারের সদস্য, বেঁচে থাকা সেনা কর্মকর্তা, কারাবন্দি বিডিআর সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ কর্মকর্তা ও সাংবাদিক। তদন্তের স্বার্থে ৩৩ জনের বিরুদ্ধে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় এবং ছয় দেশের দূতাবাসসহ জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীর কাছে তথ্য চাওয়া হয়। ভারতের সম্পৃক্ততা নিয়ে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতেও সুপারিশ করা হয়।

কমিশন তাদের প্রতিবেদনে অনেকগুলি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করেছিল। কিন্তু আজ অবধি তা বাস্তবায়ন হয়নি। পাশাপাশি রিপোর্ট প্রকাশের কোনো উদ্যোগ না নেওয়া এবং বিচারের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসায় শহীদ পরিবারের সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

তদন্ত কমিশন সূত্র জানায়, ১৬ বছর আগের ঘটনার বহু আলামত নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং অনেক অভিযুক্ত বিদেশে পালিয়ে যাওয়ায় প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত সম্পন্ন করেছিলেন। কিন্তু রিপোর্ট জমা দেওয়ার পরবর্তী কার্যক্রমে সরকারের অনীহা এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছিলেন, বিডিআর বিদ্রোহ পুনঃতদন্তে সরকার নতুন কমিশন গঠন করবে, যা তাদের নির্বাচনি ইশতেহারের অংশ। কিন্তু এর মাত্র দুদিন পর ২৫ ফেব্রুয়ারি শহীদ সেনা দিবসে রাজধানীর বনানী সামরিক কবরস্থানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা নতুন করে কোনো তদন্ত কমিশন গঠন করব না।’

রিপোর্ট জমার পর সরকারের নীরবতা

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে। সাত সদস্যের ওই কমিশনের সভাপতি ছিলেন বিজিবির (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) ফজলুর রহমান। সদস্যদের মধ্যে ছিলেন মেজর জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাইদুর রহমান বীর প্রতীক, সাবেক যুগ্ম সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ, সাবেক ডিআইজি এম আকবর আলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক শাহনেওয়াজ খান চন্দন। পরে গত বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি মেজর (অব.) এটিকেএম ইকবালকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

১৬ বছর আগের পিলখানা হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সরাসরি সম্পৃক্ততা এবং ভারতের ভূমিকার অকাট্য প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়ে তদন্ত কমিশনের সদস্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ‘দীর্ঘ ১৬ বছর পর নথিপত্র ধ্বংস ও তথ্যের গোপনীয়তার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কমিশন সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যে, ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত এবং এর পেছনে ভারতের ইন্ধন ছিল।’

তিনি বলেন, ‘পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সময় সেনাবাহিনীর অপারেশনাল সক্ষমতাকে অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছিল। সেনাবাহিনীকে ঘটনাস্থল ঘিরে রাখার নির্দেশ দেওয়া হলেও হাসিনার সরাসরি তত্ত্বাবধানে সেনাবাহিনীর সমান্তরাল (প্যারালাল) একটি অবৈধ কমান্ড তৈরি করা হয়েছিল। কমিশনের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক ওই সময় সেনাবাহিনীর ‘প্রপার চেইন অব কমান্ড’কে অকার্যকর করে দিয়ে অবৈধ কমান্ডের মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে সামনে এগোতে নিষেধ করেছিলেন। এমনকি ঘটনার সময় তিন বাহিনীর প্রধানকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রেখে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছিল, যা নজিরবিহীন।’

অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম আরো বলেন, ’২৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ হতে ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ পর্যন্ত ৮২৭ জন ভারতীয় পাসপোর্টধারী এবং বিদেশি পাসপোর্টধারী ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। তাদের মধ্যে ৬৫ জনের বাংলাদেশ থেকে বহির্গমনের তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে ঐ তারিখের মধ্যে ১২২১ জনের বহির্গমনের তথ্য ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের নিকট থাকলেও তাদের মধ্যে ৫৭ জনের আগমনের কোন তথ্য তাদের নিকট নেই।’

‘পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় আওয়ামী লীগ নেতা ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসকে প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে চিহ্নিত করেছে কমিশন। কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে আসে, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের অনেক আগে থেকেই তাপসের সঙ্গে অপরাধীদের গোপন বৈঠক হয়েছে। এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না; বরং হাসিনা থেকে শুরু করে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ পর্যন্ত দলীয় কাঠামো ব্যবহার করে সুপরিকল্পিতভাবে ওই বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়’ —যোগ করেন তিনি।

অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম আরো বলেন, “সরকারের উচিত হবে কূটনৈতিক চ্যানেলে ভারতের কাছে ঘটনার আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাওয়া এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। একই সঙ্গে কমিশন ওই ঘটনাকে দেশের ট্রায়াল কোর্টে (ক্রিমিনাল কোর্ট) নিয়ে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার সুপারিশ করেছে।”

তিনি বলেন, ‘কমিশন অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পিলখানা ট্র্যাজেডিকে পরিকল্পিত জাতীয় বিপর্যয় হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং এ দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা নতুন বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য বলে মনে করছে।’

অভিযুক্তরা ধরাছোঁয়ার বাইরে

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক, সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে। এতে হাসিনাকে ‘সবুজ সংকেত’ প্রদানকারী, তাপসকে ‘প্রধান সমন্বয়ক’ এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনসহ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা, তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ, নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক ও ডিজিএফআই প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোল্লা ফজলে আকবরের নামও এসেছে উঠে এসেছে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে।

প্রতিবেদনে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু রিপোর্ট প্রকাশের আট মাসেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জাতীয় আইনজীবী পরিষদের পক্ষ থেকে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে চিঠিও দেওয়া হিয়েছিল।

পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে তদন্ত কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন শহীদ মেজর তানভীর হায়দার নূরের স্ত্রী তাসনুভা মাহা। তিনি জানান, ঘটনার দিন তার স্বামী দরবার হল থেকে ফোনে বিডিআরের পোশাকে ভারতের ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড (এনএসজি) সদস্যদের উপস্থিতির কথা জানিয়েছিলেন। বর্তমান কমিশনের রিপোর্টেও ভারতীয় সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে।

তিনি বলেন, ‘আমার স্বামীর লাশ এখনো পাওয়া যায়নি। অথচ বর্তমান তদন্ত রিপোর্টে ব্যারিস্টার তাপসের সঙ্গে কয়েকজন র‍্যাব সদস্যের যোগসাজশে আমার স্বামীকে গুম করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।’

শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে কমিশনের রিপোর্ট অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশ, সব অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জবাব চাওয়া এবং সাক্ষী ও শহীদ পরিবারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জোরালো দাবি জানানো হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন