জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও জুলাইযোদ্ধাদের সুরক্ষা দিয়ে নতুন আইন করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায়মুক্তি অধ্যাদেশ, ২০২৬’ নামে নতুন এ আইনের খসড়া আজ বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের নিয়মিত বৈঠকে উপস্থাপন হতে পারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমার দেশকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত আইনের ছয়টি ধারা রয়েছে। এগুলোতে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে জুলাই যোদ্ধাদের নামে দায়ের হওয়া মামলাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রত্যাহার হয়ে যাবে। এজন্য কাউকে আবেদন করতে হবে না। অপর একটি ধারায় বলা হয়েছে, আগামী দিনেও কেউ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যুক্ত ছিলেন এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জুলাই অভ্যুত্থানের ঘটনা নিয়ে মামলা করতে পারবেন না। কোনো আদালত এমন মামলা গ্রহণ করবে না।
আইনের খসড়ার অপর একটি ধারায় বলা হয়েছে, গণঅভ্যুত্থানের ৩৬ দিনের মধ্যে কেউ ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলে তিনি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে ক্ষতিপূরণ চেয়ে আবেদন করতে পারবেন। কমিশন আবেদন যাচাই-বাছাই করে ক্ষতিপূরণ নির্ণয় করে তা প্রদানের বিষয়ে সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ করতে পারবে।
প্রস্তাবিত আইনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে খসড়ায় বলা হয়েছে, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে স্বৈরাচারী সরকারের নির্দেশে পরিচালিত নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ও সশস্ত্র আক্রমণ প্রতিরোধ এবং জনশৃঙ্খলা পুনর্বহাল ও নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আত্মরক্ষাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ অনিবার্য হয়ে উঠেছে।’ জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে দায়মুক্তি দিয়ে করা প্রস্তাবিত আইনটি সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী সম্পূর্ণ বৈধ বলেও মত দিয়েছেন আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মামলা
২০২৪ সালের ১ জুলাই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। এক পর্যায়ে সারা দেশে এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে এবং সরকার পতনের এক দফার গণআন্দোলনে রূপ নেয়। এতে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের অভিভাবকরাও যোগ দেন। টানা ৩৬ দিনের মাথায় গণঅভ্যুত্থানে সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের হাতে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জাতিসংঘ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ করা এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকালে বাংলাদেশে এক হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। এ সময় আহত হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। আহতরা বাংলাদেশের নিরাপত্তাবাহিনীগুলোর দ্বারা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
আইন মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমার দেশকে জানান, ১ জুলাইয়ের কোটা আন্দোলনের শুরু থেকে ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত সময়ে ৩৬ দিনে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ও অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে সারা দেশে অসংখ্য মামলা করে শেখ হাসিনার সরকার। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এসব মামলা পর্যালোচনা করে প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেয় আইন মন্ত্রণালয়। বেশকিছু মামলা প্রত্যাহার হলেও নানা ধরনের আইনি জটিলতার কারণে আরো কিছু মামলা প্রত্যাহারের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে, কতগুলো মামলা প্রত্যাহারের অপেক্ষায় রয়েছে এমন কোনো পরিসংখ্যান জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন ওই কর্মকর্তা।
জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তির বিষয়ে আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, ‘জুলাই যোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে দেশকে ফ্যাসিস্ট শাসন থেকে মুক্ত করেছিল। অবশ্যই তাদের দায়মুক্তির অধিকার রয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার খুনিদের বিরুদ্ধে তারা যে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম করেছিল, সেজন্য তাদের দায়মুক্তি দিয়ে আইন প্রণয়নের প্রয়োজনও রয়েছে।’
দায়মুক্তি আইনের বৈধতার বিষয়ে ড. আসিফ নজরুল আরো বলেন, ‘আরব বসন্ত বা সমসাময়িককালে বিপ্লব (বা গণঅভ্যুত্থানে) জনধিকৃত সরকারগুলোর পতনের পর বিভিন্ন দেশে এ ধরনের দায়মুক্তির আইন হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদে দায়মুক্তির আইনের বৈধতা রয়েছে এবং ১৯৭৩ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য দায়মুক্তি আইন হয়েছিল। এসব নজির ও আইনের আলোকে আইন মন্ত্রণালয় দায়মুক্তি অধ্যাদেশের একটি খসড়া তৈরি করেছে। ইনশাআল্লাহ উপদেষ্টামণ্ডলীর আগামী বৈঠকে তা অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।’
জুলাইকে নিরাপদ রাখা অন্তর্বর্তী সরকারের পবিত্র দায়িত্ব বলেও উল্লেখ করেন আইন উপদেষ্টা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


বিসিবি পরিচালক নাজমুলের পদত্যাগের দাবিতে আলটিমেটাম