মাদকের জোয়ারে ভাসছে রংপুর জেলারজ পৌর শহরসহ উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের প্রত্যন্ত অঞ্চল। আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের সংখ্যা। মাদক ব্যবসায় প্রকাশ্যে কলকাঠি নাড়ছেন স্থানীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক নদীর বালু লুটকারী সবুজ সোনার মেম্বার ও মাদক ব্যবসায়ী ইলিয়াস আলী। দুয়েকজন চুনোপুঁটি ধরা পড়লেও বরাবরের মতো রাঘববোয়ালরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিটি স্পটে শুরু হয় বেচাকেনা আর জেঁকে বসে মাদক সেবনের আসর। প্রতি মাসে সময়মতো মাসোহারা নেয় বদরগঞ্জ থানা পুলিশ। জনবল সংকট এবং যানবাহনের অজুহাতে মাদক বিক্রেতা ও সেবনকারীদের ধরতে ব্যর্থ রংপুর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
তথ্যানুন্ধানে জানা গেছে, বদরগঞ্জ উপজেলায় মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা দেড় শতাধিক। তবে মাদক কারবারির সংখ্যা কত, সে পরিসংখ্যান থানায় থাকলেও মাদকসেবীর সংখ্যা নারী-পুরুষ ও যুবক-যুবতীসহ সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এখানে সব ধরনের মাদক সহজলভ্য হওয়ায় স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা মাদক সেবনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। আশঙ্কাজনক হারে দিনদিন বেড়েই চলছে মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের সংখ্যা। ফলে অভিভাবকরা সন্তানদের নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন।
বদরগঞ্জ থানা পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মাঝে মধ্যে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে হানা দিয়ে মাদকসহ চুনোপুঁটিদের গ্রেপ্তার করে তাদের কোটা পূরণে ব্যস্ত থাকলেও রুই-কাতলাদের স্পর্শ করছেন না তারা।
সরেজমিন দেখা গেছে, প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে মাদক বিকিকিনি আর সেবন। পিপীলিকার সারির মতো মাদক সেবনকারী ও ব্যবসায়ীদের অবাধ বিচরণ আস্তানাগুলোয়। মাদক স্পটগুলোয় মাদকসেবী ও বিক্রেতাদের আসা-যাওয়ায় মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। শিশু এবং মেয়েরাও মাদক ব্যবসা ও সেবন থেকে দূরে নেই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, থানা পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে মাদক কারবারিরা যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন। প্রশাসনের ছত্রছায়ায় তারা নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়েও কিছু বলার সাহস পান না এলাকার মানুষ।
বদরগঞ্জ পৌর শহরের আখতার হোসেন, মুক্তারুল, দুলাল মিয়াসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের শালপাড়া এলাকার জুলফিকার আলী, তার স্ত্রী ও ছোট বোন কুমিল্লা থেকে মাদকের চালান আনেন। এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে ওই গ্রামের আনিছুল হক, রফিকুল মিয়া ও ফজলুল হকসহ অনেকের কাছ থেকে।
নাগেরহাট বাজারের আতিকুর, মাহফুজ ও দিপুসহ স্থানীয় ব্যবসায়ী মহল জানায়, নাগেরহাট বন্দরটি তিনটি উপজেলার সীমান্ত জোন হওয়ায় মাদক কেনাবেচার প্রধান স্পট হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন ঝাঁকে ঝাঁকে আসা মাদক কারবারি ও সেবীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে গোটা এলাকা। এখানে মাদক কেনাবেচা একেবারেই ওপেন সিক্রেট। এ বিষয়ে পুলিশকে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন অভিযোগ দেওয়ার পরও মাদক বেচাকেনা এবং সেবনকারীদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
তারা আরো বলেন, এই এলাকার বালু লুটেরা এবং মাদক ব্যবসায়ীরা একজোট হয়ে মাদক কেনাবেচা ও সেবন করেন। সেই সঙ্গে স্থানীয় বিএনপির নেতা থেকে শুরু করে অনেকেই মাদক কারবারীদের পক্ষে থাকায় তাদের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়া এলাকার লোকজনের জন্য কঠিন।
বাজারের লোকজন জানান, নাগেরহাটের পূর্ব দিকে শাহিন ও তার স্ত্রী লায়লা বেগমসহ কয়েকজন মহিলা দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা করে আসছেন। তার বাড়িটি নির্জন এলাকায় হওয়ায় মাদক বিক্রিতাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। একই এলাকার ইয়াবা ও ফেনসিডিল ব্যবসার ডন এলাহী বকস। তার নামে বিভিন্ন থানায় ডজনখানেক মামলা থাকলেও এলাহীর ব্যবসায়িক পার্টনার নয়াপাড়া এলাকার সেরাজুলের ছেলে মোতালেবের নামে কোনো মামলা নেই। মোতালেব পার্টনার হিসেবে তার মাদক ব্যবসা পরিচালনা করেন। এছাড়া ইলিয়াস আলী গরুর ওষুধের ব্যবসার কথা বলে ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক বিক্রি করেন। তার বিরুদ্ধে বদরগঞ্জসহ পার্শ্ববর্তী থানায় ৯টির বেশি মাদক মামলা রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ইয়াবা ও ফেনসিডিল বিক্রেতা বলেন, কুতুবপুর ডাংগলপাড়া এলাকার মৃত মানিকের ছেলে সাজেদুল, একই গ্রামের সাইদার রহমান, বাগানপাড়া গ্রামের নুরে সোফার ছেলে ইলিয়াস আলী, নয়াপাড়ার সিরাজুলের ছেলে মোতালেব ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন ইত্যাদি পাইকারি বিক্রির পাশাপাশি খুচরা বিক্রি করে থাকেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব অবৈধ মাদকের হোতাদের কোনোদিন স্পর্শ করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অনেক সময় পুলিশ এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা এসে মাদক বিক্রেতাদের সঙ্গে দেখা করে ‘খুশি’ হয়ে ফিরে যান। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার কারণে এই এলাকা মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
তারা জানান, রাধানগর ইউপির জুলফিকার আলী, সেলিনা ও মুকুল চন্দ্র, কুতুবপুর ইউপির সাজেদুল রহমান, সাইদার রহমান, শাহিন, রোস্তম অটো চুরির পাশাপাশি মাদক ব্যবসায় জড়িত। তার সহযোগী কৃষ্ণনগর এলাকার মুকুল মিয়া, লোহানীপাড়া ইউপির পানারহাট মালতোলা এলাকার মশিয়ার রহমান, ওহিদুল এবং মোছলমারী এলাকার রুবেলসহ আরো অনেকে।
এসব মাদক কারবারি স্থানীয় ইউপি সদস্য মাহবুবার রহমানের আশীর্বাদপুষ্ট। কুতুবপুরের নাগেরহাট এলাকার সেরাজুলের পোলট্রি মুরগি ব্যবসার আড়ালে তার ছেলে মোতালেবের মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা পর্দার অন্তরালে মাদক ও ক্যাসিনো বাণিজ্য চালিয়ে জিরো থেকে হিরো বনে গেছেন খুব অল্প সময়ে।
সেরাজুল ও ইয়াবা কারবারি ইলিয়াসের ক্ষমতার উৎস জানতে গিয়ে বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল। ওই এলাকার নদীর বালু লুট এবং মাদক ব্যবসায় নেপথ্য থেকে কলকাঠি নাড়েন কুতুবপুর ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি সবুজ সোনার মেম্বার। এছাড়া ডজনখানেক মাদক মামলার আসামি ইয়াবা কারবারি ইলিয়াসের সঙ্গে রয়েছে পুলিশ ও ইউপি সদস্যের গভীর ঘনিষ্ঠতা। এ নিয়ে এলাকার সচেতন মহলে বিভিন্ন আলোচনা রয়েছে।
আরো জানা গেছে, বদরগঞ্জ রেলস্টেশন, শ্যামপুর হাট, শ্যামপুর রেলস্টেশনের বস্তি, বিষ্ণুপুরের বিচিবাড়িরহাট, পাঠানেরহাট, টেক্সেরহাট, শেখেরহাট, লালদীঘি, মুচিরহাট, কাঁচাবাড়িহাট, বৈরামপুর ডাঙ্গারহাট, অরুন্নেছাহাট, পদাগঞ্জেরহাট, মাঠেরহাট, মণ্ডলেরহাট এবং পার বিষ্ণুপুরের বাজারগুলোয় অবাধে বিক্রি হচ্ছে মাদক।
এ অভিযোগের বিষয়ে সবুজ মেম্বার এবং ইলিয়াসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বালু বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করলেও মাদক কারবারি এবং সেবনকারীদের সঙ্গে কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে জানান।
এদিকে উপজেলায় মাদক কারবারি ও মাদকসেবীদের পরিসংখ্যান জানতে চাইলে বদরগঞ্জ থানার ওসি হাসান জাহিদ সরকার বলেন, ‘ভাই রেজিস্টার না দেখে বলা যাবে না।’
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর রংপুরের উপপরিচালক আবু জাফর আমার দেশকে বলেন, শুধুমাত্র রংপুর শহরে আমাদের একটি অফিস। সেখান থেকে উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা কঠিন। এছাড়া আগে থেকেই আমাদের জনবল এবং যানবাহন সংকট রয়েছে। তা সত্ত্বেও আমরা প্রতিনিয়ত বদরগঞ্জসহ সব উপজেলায় মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

