আজ নববর্ষ পহেলা বৈশাখ, উৎসবের দিন

ঐ নূতনের কেতন ওড়ে

সৈয়দ আবদাল আহমদ

ঐ নূতনের কেতন ওড়ে

‘ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়, তোরা সব জয়ধ্বনি কর।’ আজ পহেলা বৈশাখ। আজ নববর্ষ। স্বাগত ১৪৩৩।

বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতি ও গর্বিত ঐতিহ্যের রূপময় ছটায় উদ্ভাসিত সর্বজনীন উৎসবের দিন আজ। আনন্দ-হিল্লোল, উচ্ছ্বাস-উষ্ণতায় দেশবাসী আবাহন করবে নতুন বছরকে। ‘নব আনন্দে জাগো আজি’। অর্থ-সঙ্গতি থাকুক আর না-ই থাকুক, সবার হৃদয়ে আজ রবীন্দ্র-নজরুলের সুর বাজবে— ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো....।’

বিজ্ঞাপন

বাংলা নববর্ষের শুভ এই দিনটি এবার উদ্‌যাপন করা হচ্ছে ভিন্ন আমেজে। দীর্ঘ পনেরো বছরের দুঃশাসন অবসানের পর নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করছে। গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরেছে দেশ। বিগত আমলের সেই অন্ধকার সময়ের গ্লানি, দুঃখ-বেদনা অসুন্দর ও অশুভকে ভুলে গিয়ে আমরা নতুন উদ্যম ও প্রত্যয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। জুলাই ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান আমাদের সামনে বৈষম্যহীন দেশ গড়ে তোলার সুযোগ এনে দিয়েছে।

এবারের পহেলা বৈশাখ তাই অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। গণতান্ত্রিক ও মুক্ত পরিবেশে নিজস্ব সাংস্কৃতির ধারায় পালিত হতে যাচ্ছে এই উৎসব। নতুন স্বপ্নের আবির ছড়ানো নববর্ষকে স্বাগত। বাংলা নববর্ষের শুভ এই দিনটি জনজোয়ারে প্রাণময় উৎসবে উদ্ভাসিত, হিল্লোলিত। যার যার সাধ্যমতো আনন্দ আয়োজনে উজ্জ্বল, অন্যরকম একটা দিন পহেলা বৈশাখ। নতুন এই দিনটি পুরোনো সব ব্যর্থতা-গ্লানি, বঞ্চনা, দুঃখ-কষ্ট ও আবর্জনার জঞ্জাল সরিয়ে নতুন আশা, কর্মোদ্দীপনা, স্বপ্ন, প্রত্যয় ও প্রাণশক্তিতে উজ্জীবিত হওয়ার ডাক দিচ্ছে। নতুনের কেতন ওড়ানো বৈশাখ এসেছে নতুন সম্ভাবনা, প্রত্যাশা ও সমৃদ্ধি অর্জনের লড়াইয়ে জয়লাভের প্রতিশ্রুতি এবং প্রেরণা নিয়ে। বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন বছরের কাছে মানুষের প্রত্যাশা তাই— ‘শোনাও নতুন গান’। বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ স্বস্তি আনুক দেশে। সত্যিকার গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসুক’। আলোয় স্নিগ্ধ প্রশান্ত হোক সমাজÑ এ আহ্বান জানাচ্ছে বৈশাখ। ‘যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গীতি/অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাকÑএসো হে বৈশাখ।’

আজ ভোরে দিগন্তের তিমিরে সূর্যোদয়ের প্রথম রশ্মি বিচ্ছুরিত হয়ে ওঠার সঙ্গে উৎসব-আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে উঠতে দেখা যাবে সবাইকে। আজই সূচিত হবে বাংলা নববর্ষের জন্মক্ষণ। এখন থেকেই বৈশাখের সর্বজনীন উৎসব-আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে উঠতে দেখা যাবে সারাদেশ এবং সব বয়সের মানুষকে। শহরের রাস্তা ও উদ্যানে নামবে মানুষের ঢল। শুধু তা-ই নয়, শহর-নগর, গ্রাম-গ্রামান্তরÑ সর্বত্রই বইবে বর্ষবরণের প্রাণোচ্ছল উৎসব-তরঙ্গ। পীড়াদায়ক দাবদাহ তুচ্ছ করে, অস্বস্তি উপেক্ষা করে ভোর থেকে দুপুর-বিকাল-সন্ধ্যা-গভীর রাত পর্যন্ত আজ চলবে বৈশাখ বরণ। দেখা যাবে কোথাও গান বাজছে, কোথাও মেলা বসেছে। কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে ঢাকের শব্দ, ঢোল, বাঁশি, নাগরদোলার শব্দ, পায়ে পায়ে উত্থিত ধূলিপুঞ্জের মধ্যে মানুষের গুঞ্জরণ-ধ্বনি, নাগরদোলায় ঘূর্ণনের সঙ্গে সঙ্গে ভয়জাগানো কিছু শব্দ, শিশুর কলেরব উচ্ছ্বাস। বৈশাখী মেলায় রকমারি সম্ভার হাতের চুড়ি, কানের দুল, সুগন্ধি সাবান, হাওয়াই মিঠাই, চুলের ফিতা, নেইলপলিশ, রঙিন বেলুন, কাঠের পুতুল, মাটির পুতুল, আম কাটার চাকু, জিলাপি, খৈ-বাতাসা, ঘরগেরস্থির দরকারি বস্তু... আরো কত কী!

আজ পহেলা বৈশাখ সরকারি ছুটির দিন। সংবাদপত্র অফিসও আজ বন্ধ থাকছে। ভোরেই সূচিত হয়ে যাবে বর্ণাঢ্য বৈশাখী অনুষ্ঠানমালা। সংবাদপত্রগুলোর বিশেষ ক্রোড়পত্র থাকবে হাতে হাতে। রেডিও-টিভিতে গত রাত থেকেই প্রচার করছে বিশেষ বৈশাখী অনুষ্ঠানমালা।

মোগল সম্রাট আকবরের নির্দেশে তার সভাসদ আমীর ফতেহউল্লাহ খান শিরাজী প্রায় চারশ’ বছর আগে হিজরি সনের সঙ্গে মিল রেখে ফসলি সন হিসেবে বাংলা সন বা বঙ্গাব্দের প্রচলন ঘটিয়েছিলেন। শস্যভিত্তিক ঋতুকে সামনে রেখে কৃষকের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে প্রচলন করা হয়েছিল বাংলা সনের। তখনই বঙ্গাব্দের সূচনা হয় বৈশাখের প্রথম দিন থেকে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তা এই জনপদের মানুষের গর্বিত ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত। বৈশাখী উৎসব সংস্কৃতির অন্যতম সমৃদ্ধ এক উপাদানে পরিণত হয়েছে। বাংলা নববর্ষে হালখাতাই মুখ্য ছিল এককালে। তার সঙ্গে ছিল বৈশাখী মেলা। ছিল আরো কিছু উৎসব। ছিল কিছু আনন্দসম্ভার। এখনো হালখাতা আছে। ক্রমেই মুখ্য হয়ে উঠছে আনন্দ-উৎসব। নাচ, গান, মেলা, নতুন হালখাতা, মিষ্টিমুখ, বর্ষবরণের আনন্দ শোভাযাত্রা, নতুন পাঞ্জাবি, শাড়ি, ফতুয়া কেনার ধুম, খাওয়া-দাওয়া, বেড়ানো, শুভ নববর্ষ জানানোর রেওয়াজ— উৎসবের নানা অনুষঙ্গে নববর্ষ উদ্‌যাপন নিত্যনতুন মাত্রিকতায় উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে চলেছে। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে ধনী-নির্ধন, শিক্ষিত-শিক্ষাবঞ্চিত— সব বয়সি মানুষের সর্বজনীন উৎসব হিসেবে উদ্‌যাপিত হয়ে আসছে এই পার্বণ। পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। আমাদের সাহিত্যে, গানে, কবিতায় মূর্ত হয়ে উঠেছে বৈশাখী নববর্ষ।

বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পহেলা বৈশাখের বাণীতে তিনি ঐতিহ্য এবং নান্দনিকতায় সমৃদ্ধ স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার দৃপ্ত প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। পহেলা বৈশাখের প্রথম প্রহরে টাঙ্গাইলে তিনি কৃষকদের মধ্যে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ করবেন। এটা ইশতেহারে দেওয়া তারেক রহমানের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন।

বর্ষবরণের অনুষ্ঠানমালা

ছায়ানট

রমনা বটমূলে অন্যান্য বছরের মতো এবারও ছায়ানটের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে নববর্ষ পহেলা বৈশাখের সূচনা হবে ভোর ৬টা ১৫ মিনিটে। ছায়ানটের দুই ঘণ্টার পরিবেশনায় বরাবরের মতো এবারও কবিতা ও সেতার বাদনের মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হবে। এবার থাকছে ৮টি সম্মেলক ও ১৪টি একক গান এবং আবৃত্তি ২টি। সব মিলিয়ে ছায়ানটের দুই শতাধিক শিল্পী এ আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ১৪ এপ্রিল ভোরের আলো ফুটতে ফুটতে ভৈরবীতে রাগালাপ দিয়ে ছায়ানটের ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ বরণের সূচনা হবে। এ পরিবেশনার জন্য শিল্পীরা তিন মাস ধরে প্রস্তুতি নিয়েছেন। ছায়ানটের এবারের বার্তা—‘চিত্র যেথা ভয়শূন্য, ‍উচ্চযেথা শির।’ যথারীতি অনুষ্ঠান সাজানো হয়েছে নতুন আলো, প্রকৃতি এবং মানুষকে ভালোবাসবার গান, দেশপ্রেম-মানবপ্রেম আর আত্মবোধন-জাগরণের সুরবাণী দিয়ে।

চারুকলার বৈশাখী শোভাযাত্রা

নববর্ষকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদের এবারের মূল আকর্ষণ ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। এর প্রধান চমক লাল ঝুঁটির মোরগ। পহেলা বৈশাখে সকাল নয়টায় বৈশাখী শোভাযাত্রা বের হবে। শোভাযাত্রায় পাঁচটি বিশেষ মোটিফ রাখা হয়েছে। লাল ঝুঁটির মোরগ ছাড়াও রয়েছে শান্তির পায়রা, ঘোড়া ও পাখি এবং দোতরা। এবারের অয়োজনে নকশিকাঁথার মোটিফ ও মুঘল সাম্রাজ্যের শিল্প ধারাকে বিশেষ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। চারুকলার দেয়ালগুলো নকশিকাঁথার আদলে রঙিন আল্পনা করা হয়েছে। জয়নাল গ্যালারির সামনে মাটির সরার আল্পনা, চিত্রকর্ম প্রদর্শনী এবং ঐতিহ্যবাহী গাজীর পটের মাধ্যমে লোকগাথা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। চারুকলা কর্তৃপক্ষ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

সুরের ধারা হাজারো কণ্ঠে বর্ষবরণ এবার রবীন্দ্র সরোবরে

বিগত বছরগুলোর মতোই এবারও অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে চ্যানেল আই-সুরের ধারা হাজারো কণ্ঠে বর্ষবরণ। বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩-কে বরণ করতে ১৪ এপ্রিল সকাল ৬টা থেকে ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবর সুরের মূর্ছনায় আচ্ছন্ন থাকবে। এবারের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত শিল্পীদের পাশাপাশি ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর শিল্পীরাও অংশ নেবেন। লোকজ মেলা। এতে থাকবে দেশীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধন। নাগরদোলা, লাঠি খেলাসহ দেশীয় নানা তৈজসপত্রের পসরা নিয়ে বসবেন দোকানিরা।

শিল্পকলা একাডেমি

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে চৈত্র সংক্রান্তি ও নববর্ষ উপলক্ষে পাঁচ দিনের বর্ণাঢ্য কর্মসূচি চলছে। জারি গান, বাউল গান, পুঁথিপাঠ, কবি গান, গম্ভীরা, ভাওয়াইয়াসহ নানান লোকজ গানের আসর থাকবে। নৃত্য করবে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। মঞ্চে পরিবেশিত হবে ‘রহিম-বাদশা রূপবান কন্যা’ নাটক, বিশেষ পুতুল নাচ ‘বাঘের বিয়ে’। এছাড়া অ্যাক্রোভেটিক প্রদর্শনী এবং বিশেষ চলচ্চিত্র দেখানো হবে। একাডেমি প্রাঙ্গণে বৈশাখী মেলাও বসেছে।

বাংলা একাডেমি

বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে এবারও বর্ণাঢ্য বৈশাখী মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। মেলা চলবে ৭ দিন। বিসিকের সহযোগিতায় মেলায় হস্তশিল্প, মৃৎশিল্প এবং কারু পণ্যের বিপুলসংখ্যক স্টল বসেছে। একাডেমি বটতলায় দেশীয় গান, লোকজ পরিবেশনা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলবে।

জাতীয় প্রেস ক্লাব

জাতীয় প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে সদস্যদের মিলনমেলার আয়োজন করা হয়েছে। এদিন সকাল ৮টা থেকে সদস্যদের মাঝে পরিবেশন করা হবে খই, মুড়ি, বাতাসা ও গুড়ের পায়েস, পান্তা ও খিচুড়ি ইলিশ। ক্লাবের কাবাব চত্বরে বাউল গান ও পুতুল নাচের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়াও দুপুরে নববর্ষের বিশেষ দেশীয় খাবার থাকছে।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি প্রাঙ্গণে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ব্যাপক কর্মসূচি নিয়েছে। এতে মুড়ি-মোয়া, মুড়ালি, কদমা ও বাতাসার পাশাপাশি দুপুরে বিশেষ খাবারের আয়োজন থাকছে। এতে থাকছে বিশেষ সংগীত পরিবেশনাও। শিশুদের জন্য চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং খেলাধুলার ব্যবস্থা আছে।

এছাড়াও ঢাকা ক্লাব, গুলশান ক্লাবসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং পাঁচতারা হোটেলগুলোতে রয়েছে বৈশাখী আয়োজন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...