ইইউর চাপে এয়ারবাসের ১০ উড়োজাহাজ কিনছে সরকার

ইইউর চাপে এয়ারবাসের ১০ উড়োজাহাজ কিনছে সরকার

মার্কিন কোম্পানি বোয়িংয়ের পর এবার ফ্রান্সের এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ কিনতে যাচ্ছে সরকার। আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে এয়ারবাসের সঙ্গে চূড়ান্ত ক্রয়চুক্তি সই করবে সরকার। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) চাপে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, দাম ও অন্যান্য শর্তসহ কেনাকাটার বিস্তারিত তথ্য চুক্তি সইয়ের পর প্রকাশ করা হবে। বাংলাদেশের জাতীয় ও বাণিজ্যিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই সরকার এ চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ মিশ্র বহরে পরিচালিত হবে। অর্থাৎ একই বহরে থাকবে বোয়িং ও এয়ারবাস—দুই নির্মাতার উড়োজাহাজ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিমানের বহর ব্যবস্থাপনায় এটি হবে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।

এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা বলেন, আমরা বিমানকে ধীরে ধীরে আধুনিক মিক্সড ফ্লিটে রূপান্তর করছি। এ লক্ষ্যে বোয়িংয়ের ১৪টি এবং এয়ারবাসের ১০টি নতুন উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চলতি বছর পাঁচটি উড়োজাহাজ লিজে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার বিপরীতে ৪০টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছে। আমাদের লক্ষ্য শুধু বহর বাড়ানো নয়; জ্বালানি ও ব্যয় সাশ্রয়ী এবং আন্তর্জাতিক মানের একটি প্রতিযোগিতা সক্ষম ফ্ল্যাগ ক্যারিয়ার গড়ে তোলা। উড়োজাহাজগুলো প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সূচি অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে বহরে যুক্ত হবে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এর আগে যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য করেছিল বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করতে। এবার করছে ইইউ। শেষ পর্যন্ত সেই চাপ সামলে উঠতে পারেনি সরকার। এবার এয়ারবাস থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে। তবে বোয়িংয়ের মতো এখানেও তাড়াহুড়া ও স্বল্পতম সময়ে চুক্তির তোড়জোড় চলছে।

সূত্র জানায়, ইইউ ইতোমধ্যে বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ও ইইউয়ের মধ্যে নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার নিয়ে আলোচনার সময় তারা এ অভিযোগ জানায়। উড়োজাহাজ না কিনলে এসব অভিযোগ চলতেই থাকবে। তাদের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যও অনেক। আমাদের রপ্তানির প্রায় অর্ধেক সেখানে যায়। তাই দুই পক্ষকেই খুশি করার কৌশলী রাস্তায় থাকতে হচ্ছে সরকারকে।

এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতার সভাপতিত্বে গত ৯ জুন মন্ত্রণালয়ে সভা হয়। সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে রয়েছে এয়ারবাস থেকে চারটি ওয়াইড বডি এ৩৫০-৯০০ উড়োজাহাজ স্বল্পতম সময়ে কেনা হবে। পাশাপাশি ছয়টি ন্যারো বডি উড়োজাহাজও ফ্লিটে যোগ হবে। এজন্য নতুন করে কোনো কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন কমিটি হবে না। এপ্রিলে বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার যে কমিটি ছিল, তারাই মূল্যায়নের কাজটি করবে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এক শতাংশ সাইনিং মানির টাকা দেবে। এয়ারবাস কেনার অনুমোদনও বিমান পরিচালনা পর্ষদ থেকে করিয়ে নিতে হবে। এয়ারবাস যে সময়সীমা উল্লেখ করেছে, তার সঙ্গে মিল রেখে কেনার কাজটি শেষ করবে বিমান।

এর আগে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি থেকে অব্যাহতি নিতে হবে। তাদের নিয়মানুযায়ী টেন্ডার ডাকার বাধ্যবাধকতা আছে। তবে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাবটি সিঙ্গেল সোর্স প্রপোজাল। কারণ তারাই নির্মাতা, তারাই সরবরাহকারী। এখানে টেন্ডারের সুযোগ নেই।

সূত্র জানায়, বিষয়টি শুধু বাণিজ্যিক বা আর্থিক বিবেচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর সঙ্গে বাংলাদেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ গভীরভাবে সম্পৃক্ত। বিশেষত, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্পের ৫০-৫৫ শতাংশ পণ্য ইউরোপের বাজারে রপ্তানি হয়ে থাকে। পাশাপাশি ইইউয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা বিভিন্ন কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হয়। সেক্ষেত্রে এয়ারবাস কেনার আলোচনা হয়। বোয়িংয়ের সঙ্গে যেভাবে চুক্তি হয়েছে, এক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত হয়।

এয়ারবাসের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে চারটি দূরপাল্লার এ৩৫০-৯০০ উড়োজাহাজ পাবে বিমান। এগুলো ২০৩২ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে সরবরাহ হবে। প্রথম উড়োজাহাজটি ২০৩৪ সালের জানুয়ারি-জুনে, দ্বিতীয়টি জুলাই-ডিসেম্বরে, তৃতীয়টি ২০৩৫ সালের জানুয়ারি-জুনে এবং চতুর্থটি জুলাই-ডিসেম্বরে সরবরাহ করবে এয়ারবাস। এর মধ্যে কমপক্ষে একটি উড়োজাহাজ ২০৩২ সালের মধ্যে আনার চেষ্টা করবে সরকার।

সব ছাড় সমন্বয়ের পর প্রতিটি উড়োজাহাজের সম্ভাব্য নিট মূল্য দাঁড়ায় ১৬ কোটি ৫০ লাখ ৮৫ হাজার ৫৫০ ডলার (প্রায় ১৯৮১ কোটি টাকা)। বোয়িংয়ের তুলনায় এয়ারবাসের দাম বেশি হলেও তারা ছাড় দিয়ে বাংলাদেশে নতুন করে প্রবেশ করতে চাইছে। পাশাপাশি ছয়টি ন্যারো বডি উড়োজাহাজও ফ্লিটে যোগ হবে। মডেলভেদে এর প্রতিটির বাজারমূল্য সাধারণত ৫৫-৯০ মিলিয়ন ডলার (৬৫০ কোটি থেকে ১০৫০ কোটি টাকা) পর্যন্ত হয়ে থাকে।

কয়েক দশক ধরেই ঢাকার আকাশ দখলের প্রতিযোগিতা চলে আসছে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং ও ফ্রান্সের এয়ারবাসের মধ্যে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বেশি থাকায় বারবার পিছিয়ে পড়ে এয়ারবাস। যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে তাদের বিক্রি প্রস্তাব পাস করিয়ে নেয়। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় দেশটি ১০টি উড়োজাহাজ বিক্রির চুক্তি করে বাংলাদেশের সঙ্গে। পরে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এসে তা বাস্তবায়ন করতে বাধ্য হয়। এবারও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। যার দাম প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। প্রতিটি উড়োজাহাজের দাম গড়ে ৩২০০ কোটি টাকা। এসব উড়োজাহাজ ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালে সরবরাহ করবে বোয়িং।

বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তির পর এয়ারবাস দৃশ্যত পিছিয়ে পড়লেও তারা লেগে ছিল। সরকারের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত ধরনা দিয়েছে তারা। নতুন করে দিয়েছে বিক্রির প্রস্তাব। এয়ারবাসের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রাফায়েল গোমেজ নোয়া বিমানমন্ত্রীর কাছে মে মাসে পাঠানো চিঠিতে জানান, তারা আবার আলোচনা শুরু করতে এবং তা এগিয়ে নিতে আগ্রহী।

টেকসই ও মিশ্র বহর গড়ে তোলার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিমানের জন্য এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করে সরকার। সরকারের এই মিশ্র বহর গড়ার উদ্যোগে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় দেশগুলোর কূটনীতিকরা।

গত ১৫ জুলাই বিমানমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা ও প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, স্পেন, জার্মানি ও ইইউ প্রতিনিধিদের মধ্যে সৌজন্য সাক্ষাতে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ ও ইইউয়ের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর আলোকপাত করা হয়। আলোচনায় বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন খাতের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আলোচনাকালে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই বহর গড়ে তুলতে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কিনতে আগ্রহী সরকার। অন্যদিকে ইউরোপীয় প্রতিনিধিরা প্রস্তাবিত এই উড়োজাহাজ ক্রয়ে বাংলাদেশকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। সাক্ষাতে বাংলাদেশ ও ইইউভুক্ত দেশগুলোর মধ্যকার বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরো সুদৃঢ়, গতিশীল ও বহুমাত্রিকভাবে সম্প্রসারণের বিষয়ে উভয়পক্ষ গুরুত্ব আরোপ করে। এ সময় পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, বিশেষ করে বেসামরিক বিমান চলাচল খাতের উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। গত ১৫ জুলাই সন্ধ্যায় বিমানের বোর্ড মিটিংয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম আমার দেশকে বলেন, এয়ারবাস ও বোয়িং দুটিই এয়ারক্রাফট ম্যানুফ্যাকচারিং প্রতিষ্ঠান। এখানে একটি কম্পিটিশন সব সময় থাকে। দুপক্ষই এখানে শক্তিশালী। আমাদের আন্ডার ডেভেলপড কান্ট্রিতে সাধারণত পরাশক্তি যারা আছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র বা ইইউ; তাদের তো একটা প্রভাব থাকেই আমাদের ওপর। তারা চাইবে তাদের কমার্শিয়াল ইন্টারেস্ট সার্ভ করতে। আমাদের স্বার্থ আমাদেরই দেখতে হবে।

তিনি আরো বলেন, বর্তমান বহরের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত না করে নতুন বিনিয়োগে গেলে তা ভবিষ্যতে আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে এত দীর্ঘমেয়াদি ডেলিভারি সময়সীমার ক্ষেত্রে ঝুঁকি থেকেই যায়।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এই বিমান সংস্থার আধুনিকায়ন এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বিমান ও কার্গো হাবে রূপান্তরিত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ২০৩৪-৩৫ অর্থবছরের মধ্যে বিমানের বহর ৪৭টি উড়োজাহাজে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা পর্যালোচনা করছে সরকার।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন