নজরুলের সংসদ সদস্য পদের কী হবে

নজরুলের সংসদ সদস্য পদের কী হবে
গাজী নজরুল ইসলাম

দল থেকে বহিষ্কার হওয়া সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ থাকবে কী না তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন বিশ্লেষকদের থেকে দুই ধরনের মতামত পাওয়া গেছে। তাদের একটি অংশ মনে করেন, দল থেকে বহিষ্কার হওয়ার কারণে সংসদ সদস্য পদ খারিজ হওয়ার সম্ভাবনা কম। এ ধরনের কোনো নজির এখন পর্যন্ত নেই। বহিষ্কারের প্রেক্ষিতে এমপি পদ শূন্য হওয়ার বিধান সংবিধানেও নেই। এ ক্ষেত্রে দল থেকে বহিষ্কার হওয়ার কারণে হয়তো তিনি স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হিসেবে গণ্য হবেন। অপর অংশ মনে করেন, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী দলীয়ভাবে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য নিজ দল থেকে বহিষ্কার হলে সংসদ সদস্য হিসেবে থাকার কোনো সুযোগ নেই। তিনি দলীয় বা স্বতন্ত্র কোনোভাবেই এমপি থাকতে পারবেন না।

নারীঘটিত কারণে নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে নির্বাচিত সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে গতকাল দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে দলটি তার দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করবে বলে জানিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যেসব কারণে সংসদ সদস্য পদ শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে সেখানে দল থেকে বহিষ্কার হওয়ার কোনো বিষয় নেই। ওই ব্যক্তি নিজে দল থেকে পদত্যাগ করলে কিংবা দলের বিপক্ষে ভোট দিলেই তার এমপি পদ শূন্য হবে। এছাড়া যেসব কারণে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা হারাবেন সেসব কারণ ঘটলে, টানা ৯০ কার্যদিবস সংসদে অনুপস্থিত থাকলে বা নিজ থেকে পদত্যাগ করলেই কারো সংসদ সদস্য পদ শূন্য হবে বলে বিশ্লেষকরা জানান। অবশ্য সংশ্লিষ্ট দল তাদের দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়টি স্পিকার কিংবা নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন করলে ওই ব্যক্তির সংসদ সদস্য পদ শূন্য হবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন একাধিক নির্বাচন বিশ্লেষক।

বাংলাদেশের বিগত সংসদগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দল থেকে বহিষ্কার হওয়ার কারণে কারো সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়নি। অষ্টম জাতীয় সংসদের এমপি আবু হেনাকে বিএনপি দল থেকে বহিষ্কার করলেও সংসদের বাকি মেয়াদ স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জানা গেছে, ওই সময় ওই সংসদ সদস্যের পদ শূন্য ঘোষণা করতে বিএনপির তরফ থেকে স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের দ্বারস্থ হলে স্পিকারের তরফ থেকে ব্যাখ্যা করা হয় যে, দলের বিরুদ্ধে কথা বলার অথবা সমালোচনার ব্যাপারে অনুচ্ছেদ ৭০ কোনো সমস্যা নয়। সংসদের ভেতরে এবং বাইরে দলের সমালোচনা করুক কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু সংসদে ভোটাভুটির প্রশ্ন থাকলে তাকে দলের পক্ষে ভোট দিতে হবে। দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তবেই সদস্যপদ যাবে। ওই সংসদ সদস্য পদত্যাগ করেননি অথবা দলের বিরুদ্ধে ভোটও দেননি। তাই তার সদস্যপদ খারিজ হওয়ার সুযোগ নেই।

প্রসঙ্গত, ওই সময়কার আইন অনুযায়ী স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হিসেবে গণ্য করার সুযোগ থাকলেও বিদ্যমান আইনে এক্ষেত্রে কিছু জটিলতা রয়েছে বলে নির্বাচন আইন বিশ্লেষকরা মনে করেন। ২০০৮ সালের সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে নির্দিষ্টসংখ্যক ভোটারদের সমর্থনের প্রয়োজন পড়ে। যেটা ২০০১ সালে ছিল না। এর ফলে দলীয় মনোনয়নে নির্বাচিত কোনো ব্যক্তিকে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হিসেবে গণ্য করতে গেলে আরপিও বরখেলাপ হবে বলে তারা মনে করেন।

দশম জাতীয় সংসদের সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে আওয়ামী লীগ প্রাথমিক সদস্যপদসহ দল থেকে বহিষ্কার করে তার সদস্য পদ খারিজ করার জন্য দলের পক্ষ থেকে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে চিঠি দেওয়া হয়। স্পিকার ওই চিঠির বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) চিঠি দেয়। ইসির তরফ থেকে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে শুনানির জন্য ডাকলে তা চ্যালেঞ্জ করে তিনি আদালতে রিট করেন। তবে, আদালতে ওই রিট খারিজ হলে লতিফ সিদ্দিকী শুনানির নির্দিষ্ট সময়ের আগে গিয়ে নিজেই আত্মপক্ষ সমর্থন করে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করবেন বলে ঘোষণা দেন। যার কারণে ইসির শুনানি প্রক্রিয়াটি শেষ হয়নি। পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর লতিফ সিদ্দিকী সংসদে বক্তব্য দিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং ওই দিনই স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরে স্পিকার ৩ সেপ্টেম্বর লতিফ সিদ্দিকীর আসনটি শূন্য হওয়ার বিষয়টি সংসদকে অবহিত করেন।

আইনত সংসদে কারো সদস্যপদ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে সে বিষয়ে কোনো মতামত বা সিদ্ধান্ত জানানোর এখতিয়ার সংসদের নেই। আইনে বলা আছে, এ ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তি করবে নির্বাচন কমিশন। সংসদ সদস্য বিরোধ নিষ্পত্তি আইনে বলা আছে, (ধারা-৪) কোনো সংসদ সদস্যের সদস্যপদ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে বিরোধ তৈরি হওয়ার ১৪ দিনের মধ্যে স্পিকার তা শুনানি করে নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনে পাঠাবেন। কমিশন স্পিকারের বিবৃতি পাওয়ার ১৪ দিনের মধ্যে বিষয়টি যাকে নিয়ে বিরোধ তাকে ও বিরোধ উত্থাপনকারী পক্ষকে তাদের বক্তব্য লিখিতভাবে দেওয়ার নির্দেশ দেবে। বক্তব্য পাওয়ার পর কমিশন উভয় পক্ষের শুনানি নিয়ে ১২০ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাবে।

এদিকে সাতক্ষীরা-৪ আসনের এইচ এম গোলাম রেজাকে তার দল জাতীয় পার্টি বহিষ্কার করলেও তার সংসদ সদস্য পদ বহাল ছিল। তিনি জাতীয় পার্টির এমপি হিসেবেই তখন সংসদে বহাল ছিলেন। অপরদিকে ভিন্ন কারণে সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়েছিল হাসিবুর রহমান স্বপনের। সপ্তম জাতীয় সংসদের বিএনপি দলীয় এমপি হাসিবুর রহমান স্বপন ১৯৯৮ সালে বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন। দল ত্যাগের কারণে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের দায়ে তখন তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়েছিল।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান আমার দেশকে বলেন, আমরা দলের সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করব। যেহেতু তাকে আমরা দল থেকে বহিষ্কার করেছি আমরা মনে করি তার সংসদ সদস্য পদ থাকার কথা নয়। তবে, আইনে কী আছে সেটা নির্বাচন কমিশন দেখবে। তারা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে।

তিনি বলেন, আমরা মনে করি বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের এজন্য আমরা কমিশনকে অবহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তারা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

নির্বাচনি আইন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নিজামউদ্দিন আহমদ বলেন, দলের মনোনয়নে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য দল থেকে বহিষ্কার হলেও তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে বহাল থাকবেন। এক্ষেত্রে তিনি স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হিসেবে গণ্য হবেন। তবে তিনি নিজ থেকে পদত্যাগ করলে তার আসনটি শূন্য হবে। আর নৈতিক স্খলনজনিত কারণে যদি দুই বছরের বেশি সাজাপ্রাপ্ত হন তাহলেই কেবল আসন শূন্য হতে পারে।

বহিষ্কার করার পর সেই দল যদি নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করেন সেক্ষেত্রে কী হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো সংসদ সদস্যকে নিয়ে বিরোধ হলে তা নিষ্পত্তির দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। এক্ষেত্রে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার বিষয় রয়েছে। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির বিষয়টি নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি আমার দেশকে বলেন, দল থেকে কেউ বহিষ্কার হলে কার্যত তার সংসদ সদস্য পদ যাবে না। তবে দল থেকে নির্বাচন কমিশনকে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আবেদন করলে সেখান থেকে একটা সিদ্ধান্ত আসতে পারে। কমিশন সন্তুষ্ট হলে তার আসন শূন্য হতে পারে। আর যে অপরাধের জন্য বরখাস্ত হয়েছেন, আদালতে সেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া সাপেক্ষে দুই বছরের বেশি সাজা হলে সংসদ সদস্য পদ চলে যাবে।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন আমার দেশকে বলেন, আমি মনে করি দল থেকে বহিষ্কার হলে তার সংসদ সদস্য পদ থাকবে না। কারণ তিনি দলীয় প্রার্থী ছিলেন। দল থেকে বহিষ্কার হলে তিনি আর দলীয় প্রার্থী থাকেন না।

২০০১ সালে দলীয়ভাবে নির্বাচিত এমপি বহিষ্কার হওয়ার পর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে গণ্য হওয়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ২০০১ সালের বিধান আর বর্তমানের বিধান এক নয়। বর্তমান আইনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগেই নিজেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী ঘোষণা করতে হয়। ভোটারদের একটি অংশের সমর্থন নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে হয়।

নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ আমার দেশকে বলেন, এ ধরনের কোনো বিষয় হলে স্পিকারের দপ্তর থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছে মতামত চাওয়া হবে। যদি তারা মতামত চায় তখন আমরা আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেব। আর আপনি যেটা বলছেন—ওই দলের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেবে। তারা চিঠি দিলে হয়তো আমরা দেখতে পারি। কিন্তু সংবিধান অনুযায়ী এটা স্পিকারের দপ্তর হয়ে আসতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন