সরকারের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পরও বন্ধ হচ্ছে না সার ডিলার নিয়োগে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, মজুত ও সার পাচার। সারা দেশে রাতের আঁধারে পাচার করা হচ্ছে সার। সার সংকটে বিপাকে পড়েছেন কৃষক। তারা সারের ডিলার নিয়োগে দুর্নীতি, পাচার ও মজুত বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ, মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করছেন।
মান্দা (নওগাঁ) প্রতিনিধি জানান, নওগাঁর মান্দা উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নে চাহিদার তুলনায় সার বরাদ্দ কম পাওয়ায় বিক্ষোভ করেছেন কৃষকরা। বুধবার সকাল নয়টার দিকে নওগাঁ-রাজশাহী মহাসড়কের জয়বাংলা মোড়ে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন তারা। পরে স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা ও মান্দা থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কৃষকদের বুঝিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এরপর মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
ইউনিয়নের ছোট মুল্লুক গ্রামের কৃষক শ্রীমান আলি মোল্লা বলেন, ‘এ মৌসুমে আলু, সরিষা ও পেঁয়াজ চাষের জন্য জমি প্রস্তুত করেছি। এখন কয়েক বস্তা সার প্রয়োজন। সারের জন্য রাত তিনটা থেকে লাইনে বসে আছি, এখনো সার পাইনি। সার না পেলে ফসল করব কীভাবে?’ একই গ্রামের কৃষক অখিল চন্দ্র বলেন, ‘এ মৌসুমে আমার অন্তত ২৫ বস্তা সার লাগবে। সময়মতো সার না পেলে ফসল চাষ করা কঠিন হয়ে পড়বে।’
কালিকাপুর ইউনিয়নের বিসিআইসির সার ডিলার আবুল হোসেন বলেন, অক্টোবর মাসে তিনি সামান্য সার বরাদ্দ পেয়েছেন। চাহিদা অনুযায়ী সার না পেয়ে কৃষকরা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সীমা কর্মকার বলেন, চাহিদার তুলনায় সার সরবরাহ কম হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। চলতি মাসেই আরো এক দফা সার বরাদ্দ পাওয়ার চেষ্টা চলছে। নতুন বরাদ্দের সার পৌঁছালে সংকট থাকবে না বলেও আশা করছেন তারা।
নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, নওগাঁ সদর উপজেলা থেকে অন্য জেলায় ১২০ বস্তা সার পাচারের সময় দুটি গাড়ি আটক করেছেন স্থানীয়রা। পরে খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন ঘটনাস্থলে পৌঁছে সারগুলো জব্দ করে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেয়। গত মঙ্গলবার দুবলহাটি-হাপানিয়া সড়কে এ ঘটনা ঘটে।
এ বিষয়ে নওগাঁ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নূরুল আমিন বলেন, স্থানীয়দের সংবাদের ভিত্তিতে কৃষি কর্মকর্তা ও পুলিশ সঙ্গে নিয়ে রাতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে ৬০ বস্তা করে মোট ১২০ বস্তা ডিএপি সার জব্দ করা হয়েছে। ডিলার বা তার প্রতিনিধি উপস্থিত না থাকায় আইনগত প্রক্রিয়ায় সারগুলো দুবলহাটি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে হেফাজতে রাখা হয়েছে।
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, সাতক্ষীরা জেলার ৭৮টি ইউনিয়ন এবং তিনটি পৌরসভায় সার ডিলার নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের প্রতিবাদে বুধবার সাতক্ষীরা জজকোর্টের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
বক্তারা বলেন, সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ব্যবসায়ী ও যোগ্য ব্যক্তিদের বঞ্চিত করে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে ডিলারশিপ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরা জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি আব্দুস সামাদ, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক কামরুজ্জামান ভুট্টো, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব শেখ শরিফুজ্জামান সজীবসহ স্থানীয় বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।
নালিতাবাড়ী (শেরপুর) প্রতিনিধি জানান, নিয়ম উপেক্ষা করে অন্য উপজেলায় বিক্রির অভিযোগে শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে এক হাজার কেজি টিএসপি ও এমওপি সার আটক করে প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করেছেন স্থানীয়রা। পরে জব্দ করা সার ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সরকার-নির্ধারিত মূল্যে কৃষকদের কাছে বিক্রি করে পাওয়া অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট পরিবেশক মেসার্স আজিম ট্রেডার্সকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। গতকাল বুধবার নালিতাবাড়ী উপজেলার বাইটকামারী হাজির বাজার এলাকায় সার আটক করা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল মালেক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন।
তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, সরকার নির্ধারিত নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাড়াশ উপজেলায় সারের ডিলার নিয়োগের তালিকা ঘিরে কোটি টাকার লেনদেন, দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে।তালিকায় বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা, নেতার ছেলে, ভাই, ভাতিজা, স্ত্রী ও ঘনিষ্ঠজনদের নাম থাকলেও বাদ পড়েছেন দীর্ঘদিনের সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ীরা।
গত মঙ্গলবার কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে নতুন ডিলারদের তালিকা প্রকাশের পরপরই বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।
নিয়োগসংক্রান্ত তালিকার তথ্য অনুযায়ী, তাড়াশ পৌরসভায় সার ডিলার হিসেবে অনুমোদিত হয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি খন্দকার সেলিম জাহাঙ্গীরের ছেলে খন্দকার শাফি জাহাঙ্গীর। তার প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স শাহেরা আকবর এন্টারপ্রাইজ। তালম ইউনিয়নে রীনা সুলতানার প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স স্বাধীন ট্রেডার্স, তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সোলায়মান হোসেনের স্ত্রী। বারুহাস ইউনিয়নে বেনজিন আহমেদ (শফি)’র মেসার্স শাহানা ট্রেডার্স। তিনি উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও উপজেলা বিএনপির সদ্য সাধারণ সম্পাদক আমিনুর রহমান টুটুলের খালাতো ভাই। মাগুরাবিনোদ ইউনিয়নে শাহিনুর ইসলাম শাহিনের শশী সারিন ট্রেডার্স। তিনি উপজেলা বিএনপির সদ্য সাবেক সভাপতি স ম আফসার আলীর সহদোর।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


