রংপুর সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরীর বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য জানতে চাওয়ায় এক সাংবাদিকের নামে জিডি করার অভিযোগ উঠেছে। রংপুর সিআইডি অফিসের কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, পদাবনতিপ্রাপ্ত সহকারী পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী মদ্যপান, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া ভাউচার তৈরি, সরকারি জ্বালানি তেল আত্মসাৎ এবং বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তারা।
তাদের দাবি, সরকারি গাড়ির নামে অতিরিক্ত জ্বালানি তেলের বিল দেখিয়ে নিয়মিত অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের বিভিন্ন সময়ে সরকারি গাড়ি ব্যবহার ও জ্বালানির হিসাব দেখিয়ে শত শত লিটার তেলের বিল উত্তোলন করা হয়েছে। এছাড়া অচল মোটরসাইকেল ও ট্রাকের নামেও নিয়মিত জ্বালানি বরাদ্দ দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
অভিযোগকারীরা আরো বলেন, কনস্টেবল সাদ্দামের মাধ্যমে প্রতি মাসে জ্বালানি তেল বিক্রি করে আলাদাভাবে অর্থ নেওয়া হতো। পাশাপাশি রংপুর মহানগর ও জেলার বিভিন্ন মদের দোকান ও ভাটিখানা থেকে কয়েকজন পুলিশ সদস্য ও অফিস সহকারীর মাধ্যমে মাসোহারা আদায়েরও অভিযোগ রয়েছে।
তারা আরো দাবি করেন, অতীতেও বিভিন্ন কর্মস্থলে সুমিত চৌধুরীর বিরুদ্ধে মদ্যপ অবস্থায় অসদাচরণ, দায়িত্বে অবহেলা, অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং বিভিন্ন সময়ে স্ট্যান্ড রিলিজ, বদলি ও শাস্তি দেওয়া হয়। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও চলমান রয়েছে বলে তারা জানান।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে রাজশাহীতে মদ্যপ অবস্থায় জনতার হাতে মারধরের শিকার হওয়ার পর পুলিশ সদর দপ্তরের তদন্তে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পরে ফরিদপুর নৌ পুলিশে কর্মরত অবস্থায়ও মদ্যপান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে গালাগাল ও অসদাচরণের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের পর তাকে অন্যত্র বদলি করা হয়।
সিআইডির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সুমিত চৌধুরী ২৫ ব্যাচের পুলিশ কর্মকর্তা। বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদ থেকে সহকারী পুলিশ সুপার পদে অবনমিত করা হয়। ২০২০ সালে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয় এবং ২০২১ সালে তদন্ত শেষে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী গুরুদণ্ড দেওয়া হয়। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
সাংবাদিকের নাম জড়িয়ে জিডির বিষয়টি স্বীকার করে রংপুর সিআইডি অফিসের এডমিন ইন্সপেক্টর আবুল হাসান কবির আমার দেশকে বলেন, রংপুর সিআইডি অফিসের সদ্য বদলি হওয়া ইন্সপেক্টর রুহুল আমিন এবং অফিসে তথ্য নিতে আসা সাংবাদিকের বিষয়ে সুমিত চৌধুরী স্যার যে জিডি করেছেন, এখানে সাংবাদিককে কোন দোষারোপ করা হয়নি। জিডিতে বদলিকৃত ইন্সপেক্টরের সঙ্গে কথোপকথনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
রংপুর সাংবাদিক সমাজের আহ্বায়ক সিনিয়র সাংবাদিক লিয়াকত আলী বাদল বলেন, তথ্য চাওয়ায় সাংবাদিকের নামে জিডি করা ঠিক করেননি সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার।
রংপুর সাংবাদিক ইউনিয়ন আরপিইউজের সভাপতি সালেকুজ্জামান সালেক ও সাধারণ সম্পাদক সরকার মাজহার মান্নান বলেন, সরকারিভাবে সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে গণমাধ্যম কর্মীরা যেকোনো তথ্য জানতেই পারেন। সে কারণে তিনি রাগান্বিত হয়ে সাংবাদিকের নামে জিডি এটা মেনে নেওয়ার মতো নয়। সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী সাংবাদিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক ও দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার রংপুর ব্যুরো প্রধান বাদশাহ ওসমানীর নামে করা সাধারণ ডায়েরি প্রত্যাহার না করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের রংপুর জেলা সেক্রেটারি অধ্যাপক ফখরুল আনাম বেনজু বলেন, রংপুর জেলা এবং মেট্রোর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সিআইডিতে চৌকশ এবং নিখুঁত পুলিশ কর্মকর্তা প্রয়োজন। যে কর্মকর্তা এত বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাকে কীভাবে রংপুর সিআইডিতে রেখেছেন? রংপুর রেঞ্চ ডিআইজি আমিনুল ইসলাম বলেন, রংপুর সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরীকে বলেছি এস ঘটনায় সাংবাদিককে না জড়ানোর জন্য। এর পরেও তিনি সাংবাদিকের নামে জিডি করে ভুল করেছেন।
সিআইডি হেডকোয়ার্টারের ডিআইজি (এডমিন)মিয়া মাসুদ করিম বলেন, ‘তার অনেক বিষয়ে আগে থেকে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানেন। কিন্তু তথ্য জানতে চাওয়ায় সাংবাদিকের নামে জিডি করা মোটেও ঠিক করেননি। বিষয়টি আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব।’
এ বিষয়ে রংপুর সিআইডির পদাবনতিপ্রাপ্ত সহকারী পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরীর কাছে তার অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়ে জানতে চাইলে অফিসের ইন্সপেক্টর এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ডেকে সবার সামনে বলেন, ‘আমি কোনো অন্যায়-অনিয়ম, দুর্নীতি করি না। আমার সব অফিসার আমার সামনেই রয়েছেন, তারাই বলুক আমি কখনো তাদের সঙ্গে কোনো অন্যায় করেছি কি না। এই মিথ্যা তথ্যগুলো আপনাকে যে দিয়েছে, সে আমাদের শত্রু। তাকে আমরা অবশ্যই চিহ্নিত করব।’
জেডএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

