কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের বালু সরবরাহ অনুমোদনের আগেও অনিয়ম হয়েছে, পরেও হচ্ছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ১৩ শর্তে বালু তোলার অনুমোদন দেওয়া হলেও ন্যূনতম শর্তও মানছে না। ‘টোকিও-এমআইএল-জেভি’ নামের প্রতিষ্ঠানটি সমুদ্রে পরিবেশগত বিপর্যয় সৃষ্টি করে ১২ ইঞ্চি সাকশন ড্রেজার দিয়ে বালু তুলছে। অথচ শর্ত ছিল ১৮ ইঞ্চি কাটার ড্রেজার দিয়ে বালু তুলতে হবে।
সূত্র জানায়, ১৩ শর্তের মধ্যে অন্যতম শর্ত ছিল— পরিবেশগত ছাড়পত্রের পাশাপাশি এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ইআইএ) না করে কোনো অবস্থাতেই বালু তোলা যাবে না। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ সেই শর্তও মানেনি। এমনকি পরিবেশ অধিদপ্তরে ছাড়পত্র কিংবা ইআইএ করার জন্য কোনো আবেদনই করেনি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি সরকারি কোষাগারে জেলা প্রশাসন নির্ধারিত সরকারি রয়্যালটি জমা দেওয়া ছাড়া আর কোনো শর্তই মানছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের (এমআইএল) কক্সবাজারে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আপনিও দেশের জন্য কাজ করছেন, আমরাও দেশের জন্য কাজ করছি। বিষয়টি সেই বিবেচনায় দেখতে হবে।’
গত রোববার দুপুরে বঙ্গোপসাগরের মহেশখালী মোহনায় গিয়ে দেখা গেছে, দুটি ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। দুটি স্পিডবোট দিয়ে ড্রেজার দুটি পাহারা দেওয়া হচ্ছে। সাংবাদিকরা ওই এলাকায় পৌঁছালে ড্রেজার থেকেই একাধিক কর্মচারী সাংবাদিকদের ভিডিও করতে থাকেন। এ সময় একটি স্পিডবোট ড্রেজারের কাছাকাছি আসে।
স্পিডবোট থেকে একজন নেমে এসে নিজেকে ম্যাক্স ইন্টারন্যাশনালের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। সিফাত হোসেন নামের ওই কর্মকর্তাও ড্রেজারের কর্মচারীদের সাংবাদিকদের ছবি ও ভিডিও করার নির্দেশ দেন। তিনি দাবি করেন, সরকারের সব শর্ত মেনেই বালু তোলা হচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা না বলে এর বেশি বলতে পারবেন না তিনি। সংশ্লিষ্ট কোনো কাগজপত্রও তিনি দেখাতে পারেননি।
বালু তোলায় ব্যবহার করা ড্রেজার মেশিন সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ড্রেজারটি ১২ ইঞ্চি সাকশন ড্রেজার মেশিন। যা সাগরে গর্ত তৈরি করে এবং সমুদ্রে পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটায়। যদিও জেলা প্রশাসনের শর্তে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, ১৮ ইঞ্চি কাটার ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করতে হবে। কাটার ড্রেজার দিয়ে বালু তুললে সাগরে নাব্য বৃদ্ধি পায় এবং পরিবেশগত কোনো ক্ষতি হয় না। কাটার ড্রেজার ব্যবহার ব্যয়বহুল হওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেটা ব্যবহার না করে ১২ ইঞ্চি সাকশন ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করছে, যা তুলনামূলক কম খরচের।
যেভাবে প্রকল্পের সৃষ্টি
মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের সংযোগ সড়ক প্রকল্পের ২৭.২ কিলোমিটার (কিমি) সড়ক ১২ হাজার ৯৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ)। এতে কিমিপ্রতি ব্যয় হবে ৪৭৬ কোটি টাকা। অভিযোগ ওঠে, এই সড়ক নির্মাণে ব্যবহৃত বালু সরবরাহকে কেন্দ্র করে সরকারের প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার রাজস্ব কৌশলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পকেটে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন।
কোনো দরপত্র ও পরিবেশগত ছাড়পত্রের তোয়াক্কা না করেই ‘টোকিও-এমআইএল-জেভি’ নামের প্রতিষ্ঠানকে সাগর থেকে বালু তোলার অনুমতি দেয় জেলা প্রশাসন। বালু তোলা ঘিরে সবচেয়ে বড় দুর্নীতি লুকিয়ে আছে জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নানের স্বাক্ষরে দেওয়া অনুমোদনপত্রে।
বালু তোলার অনুমোদন ও অন্যান্য কাগজপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতি ঘনফুট বালুর মূল্য ছয় টাকা ৯৪ পয়সা নির্ধারণ করা হলেও ড্রেজিং খরচ বাবদ চার টাকা ৫৬ পয়সা সরকারি কোষাগার থেকেই ঠিকাদারকে পরিশোধ করা হবে! সংশ্লিষ্ট অনেকেরই অভিযোগÑ জেলা প্রশাসনের দেওয়া এই অনুমোদনের ফলে ‘বালু বিক্রি করে লাভ করবে ঠিকাদার, কিন্তু উত্তোলনের ব্যয় বহন করবে সরকার!’ এই অভিযোগ ওঠার পর কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বিষয়টি স্বীকার করেই সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছিলেন, ভূমি মন্ত্রণালয়ের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কমিটি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
লুটপাটের সুযোগ
মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গভীর সমুদ্রবন্দর সংযোগ সড়কসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ১০০ কোটি থেকে প্রায় ১৪০ কোটি ঘনফুট বালুর প্রয়োজন। ব্যয় কমাতে সমুদ্র উপকূল বা নদী থেকে বালু তোলাই একমাত্র বিকল্প পথ। সেই সুবাদে সাগর থেকে বালু তোলার জন্য সরকারি হিসাব মতেই ভ্যাট ছাড়া প্রতি ঘনফুট বালুর নির্ধারিত মূল্য ছয় টাকা ৯৪ পয়সা ধরলে ওই পরিমাণ বালু থেকে সরকারের অন্তত ৬৯৪ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার কথা ছিল। অভিযোগ উঠেছে, বালু মহাল বরাদ্দ কমিটি ও সংশ্লিষ্ট উপ-কমিটি থাকলেও জেলা প্রশাসক নিজের ইচ্ছামতো এই অনুমোদন দিয়ে সরকারের প্রায় ৪৫০ কোটি রাজস্ব লোপাটের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন।
জেলা প্রশাসন সূত্র বলছে, সাগর থেকে বালু তোলার রয়্যালটি নির্ধারণে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ পৃথক প্রস্তাব জমা দেয়। উভয় সংস্থাই তাদের নির্ধারিত ‘শিডিউল অব রেটস’ অনুযায়ী প্রতি ঘনফুট বালুর মূল্য ১৬ টাকা ৭০ পয়সা প্রস্তাব করে। অন্যদিকে গণপূর্ত বিভাগ তাদের বিশ্লেষণে এই দর ১৬ টাকা ৮০ পয়সা নির্ধারণ করলেও ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী বালুর রয়্যালটি ধরা হয় ছয় টাকা ৯৪ পয়সা।
অভিযোগ উঠেছে, পাউবো, সওজ এবং গণপূর্তের রেট ও বিশ্লেষণ তোয়াক্কা না করে মাত্র ছয় টাকা ৯৪ পয়সা দরে কোনো ধরনের টেন্ডার ছাড়াই ‘টোকিও-এমআইএল-জেভি’কে প্রাথমিকভাবে ১৩টি শর্তে ছয় কোটি ৩৪ লাখ ৫৯ হাজার ঘনফুট বালু তোলার অনুমতি দেয় জেলা প্রশাসন। গত ২ এপ্রিল জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নানের সই করা চিঠিতে এই অনুমোদন দেওয়া হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সাগর থেকে ড্রেজিং করে বালু উত্তোলনে ঘনফুটপ্রতি চার টাকা ৫৬ পয়সা করে সরকারের রাজস্ব থেকে বহন করা হবে।
অভিযোগ মতে, জেলা প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন প্রকল্পগুলোয় সর্বনিম্ন ১০০ কোটি ঘনফুট বালুর বিপরীতে সরকারি রাজস্ব থেকে বালু উত্তোলনের খরচ বাবদ প্রায় ৪৫৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা ঠিকাদারের পকেটে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের অনুমোদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ড্রেজিং খরচ সরকার পরিশোধ করায় সরকারি কোষাগারে রাজস্ব হিসাবে জমা হবে প্রতি ঘনফুট বালুতে মাত্র দুই টাকা ৩৭ পয়সা। অথচ ‘উন্নয়ন ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান সরকারের কোনো ব্যয় ছাড়াই প্রতি ঘনফুট বালুর বিপরীতে পাঁচ টাকা ৩৭ পয়সা রাজস্ব দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি নিজ খরচে বালু তোলার প্রস্তাবও দেয় জেলা প্রশাসনকে।
সূত্র জানায়, শুধু ‘উন্নয়ন ইন্টারন্যাশনাল’ নয়, আরো একাধিক প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ দর দিয়ে প্রতিযোগিতায় থাকলেও সেগুলো আমলে নেয়নি প্রশাসন।
নেই ইআইএ, পরিবেশ ছাড়পত্র
পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন জানিয়েছেন, সমুদ্র থেকে বালু তোলার বিষয়ে পরিবেশ ছাড়পত্র নেওয়া তো দূরের কথা, কেউ আবেদনই করেনি। ইআইএ ছাড়া বালু তোলার কোনো সুযোগ নেই। অনুমোদন ছাড়া বালু তোলা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যা বলছে
‘টোকিও-এমআইএল-জেভি’র দায়িত্বে থাকা ম্যাক্স ইন্টারন্যাশনালের কক্সবাজারে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন দাবি করছেন, সরকারের সব শর্ত পূরণ করেই বালু তোলা হচ্ছে। বৈশ্বিক এই সংকটের মুহূর্তে অনেক টাকা খরচ করে বৈধ উপায়ে বালু তোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যদিও নানা পরিস্থিতির কারণে সে পরিমাণ বালু তোলা সম্ভব হচ্ছে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ওখানে ১৮ ইঞ্চি ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। কিন্তু আপনার চোখে কেন পড়ল না!
তার ভাষায়, পরিবেশ ছাড়পত্রসহ সব ধরনের কাগজপত্র জেলা প্রশাসনে জমা দিয়েই এই অনুমোদন নেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক যা বললেন
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, বালু উত্তোলনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শর্ত ভঙ্গ করছে কিনা তা দেখার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে। তারা যাচাই করে জেলা প্রশাসনকে জানাবে। বালু তোলা শুরু করার বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তবে এখন পর্যন্ত কতটুকু বালু তোলা হয়েছে, সে ব্যাপারে জেলা প্রশাসনকে জানায়নি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটিকে অনুমোদন ও ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। পরে গঠিত কমিটির সম্মতিতে বালুর রেট নির্ধারণ করে অনুমোদন দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, সড়কটির প্রকল্প পরিচালকের কাছে ডিপিপি চেয়ে চিঠি দেওয়া হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ফলে প্রকল্পে কত বালু প্রয়োজন এবং ঠিকাদারকে কত দামে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

