দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় আলুর বাম্পার ফলন হলেও দাম নিয়ে চরম হতাশ আলু চাষিরা। আলুর অধিক উৎপাদনে কৃষকের মুখে হাসির বদলে এখন হতাশার ছাপ। কেননা, বাম্পার ফলনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক। কোথাও কোথাও আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র পাঁচ থেকে আট টাকা কেজি দরে।
শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি জানান, কৃষকের ঘরে থাকার কথা ছিল স্বস্তি ও প্রাপ্তির হাসি। কিন্তু বাস্তবতা ঠিক উল্টো। বাজারে এক কাপ দুধচায়ের দামে বিক্রি হচ্ছে তিন কেজি আলু। বাম্পার ফলন যেন আশীর্বাদ নয়- অভিশাপ হয়ে নেমে এসেছে শেরপুরের কৃষকের জীবনে।
উপজেলার কুসুম্বি ও মির্জাপুর ইউনিয়নের খিকিন্দা, কেল্লা, চণ্ডেশ্বর, উত্তর পেঁচুল, মাখাইলচাপড়, তালতা গ্রাম থেকে গ্রামে এখন আলুর স্তূপ। কিন্তু এ ফলনের আনন্দ ম্লান করে দিয়েছে বাজারদর। জমিতেই প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ছয় থেকে আট টাকায়। কৃষকের হিসাব বলছে, বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা আর বিক্রি করে হাতে আসছে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। অর্থাৎ লোকসান ২০-৩০ হাজার টাকা। গত বছর বড় লোকসান দেওয়া কৃষকরা এবারও একই চক্রে পড়েছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফারজানা আকতার ও কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জুলফিকার হায়দার বলেন, ফলন ভালো হয়েছে কিন্তু বাজারমূল্য কম থাকায় কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কৃষকদের দাবি, রপ্তানির আশ্বাস নয়, এখনই দরকার বাজারে সরকারি হস্তক্ষেপ। ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ ও সরাসরি ক্রয়ব্যবস্থা না হলে আগামী মৌসুমে আলু চাষে আগ্রহ হারাবেন অনেকেই।
নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, নওগাঁয় আলু নিয়ে কৃষকের লোকসান কাটছেই না। মাঠ থেকে পাইকারি বাজার সর্বত্রই আলুর দামে ধস নেমেছে। গত বছর সরকার আলুর বাজারমূল্য ২২ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও তাতে উৎপাদন খরচ উঠেনি। এবার পরিস্থিতি আরো শোচনীয়। বর্তমানে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি আলুর দর নেমেছে পাঁচ থেকে সাত টাকায়, যা উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম। ভোক্তা পর্যায়ে দাম ২৫ থেকে ৩০ টাকা স্থিতিশীল থাকলেও কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না।
সদর উপজেলার তিলকপুর ইউনিয়নের আব্দুর রহমান বলেন, ‘গত মৌসুমেও আলু চাষ করে লোকসানের সম্মুখীন হয়েছিলাম। সে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় ঋণ করে এবারও দুই বিঘা জমিতে আবাদ করেছি। কিন্তু এবারও উৎপাদন খরচ তুলতে পারব না।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হুমায়রা মণ্ডল বলেন, ‘গত মৌসুমে লোকসানের পর কৃষকদের কম করে আলু চাষ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তারপরও অনেক কৃষক চাষ করেছেন। এখন ফলন ভালো হওয়ায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে, আর এ কারণেই দাম কমেছে।’
পার্বতীপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি জানান, পার্বতীপুরে আলুর বাম্পার ফলন হলেও দাম না পাওয়ায় কৃষকরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। বর্তমানে পার্বতীপুরের হাটবাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে দেশি ১০ থেকে ১২ টাকা কেজি দরে আর কাটিলাল, ডায়মন্ড জাতীয় আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি সাত থেকে আট টাকা দরে।
দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর উপজেলার ১০ ইউনিয়ন ও একটি পৌর সভায় চলতি মৌসুমে ৯ হাজার ৪৯৭ একর জমিতে আলু চাষ করা হয়। গত বছরের চেয়ে এবার দুই হাজার একর জমিতে আলু কম লাগানো হয়। ৬০ টাকা কেজি দরে আলু বীজ সংগ্রহ করে কৃষকরা জমিতে আলু বীজ রোপণ করেন। লাভের আশায় কৃষকরা জমিতে চড়া দামে রাসায়নিক সার, কীটনাশক প্রয়োগ করে। ফলন ভালো হয়। গত শনিবার ছোট হরিপুর গ্রামে সরেজমিন গেলে আলু ক্ষেতের মালিক জসিম, মজিবার রহমান, কালু মিয়ার সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, ‘এবার অনেক আশা করি আলু লাগিয়েছিলাম। কিন্তু আশা পূরণ হইল না বাহে। এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজিব হুসাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, গত বছরে আলুর দাম ছিল প্রচুর। এক কেজি আলু ৮০-৯০ টাকা দরে গ্রাহকরা ক্রয় করেছেন। সে কারণে কৃষকদের আলু চাষাবাদে আগ্রহ বেড়ে যায়। এবার ঘন কুয়াশা অল্পদিন স্থায়ী থাকার কারণে আলুক্ষেতে তেমন রোগবালাই দেখা দেয়নি। তাই আলুর ফলন ভালো হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

