থানা হাজতে দুর্জয় চৌধুরীর ঝুলন্ত মরদেহ

ওসিসহ ৪ পুলিশকে আসামি করে ৯ জনের নামে আদালতে মামলা

ওসিসহ ৪ পুলিশকে আসামি করে ৯ জনের নামে আদালতে মামলা

কক্সবাজারের চকরিয়ার থানা হাজতে গলায় ফাঁস লাগিয়ে দুর্জয় চৌধুরী নামের এক স্কুল কর্মচারির মৃত্যুর ঘটনায় অবশেষে মামলা হয়েছে। মৃত্যুর দীর্ঘ ২২ দিন পর কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মামলাটি রুজু করা হয়। আরও দুইদিন পর রোববার আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে আগামী ২১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মামলাটি রেকর্ড করে আদালতকে জানানোর জন্য কক্সবাজার পুলিশ সুপার সাইফুদ্দীন শাহীনকে নির্দেশ দিয়েছেন।

এ মামলায় ঘটনাকালিন সময়ে চকরিয়া থানার ওসি শফিকুল ইসলাম, সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মোহাম্মদ মহিউদ্দীন ও দুজন কনস্টেবলসহ ৯ জনকে আসামি করা হয়। ইতোপূর্বে নিহত দুর্জয় চৌধুরীর বাবা কমল চৌধুরী মামলাটি চকরিয়া থানায় জমা দিলেও পুলিশ কর্মকর্তাদের আসামি করায় সেটি রেকর্ড করা হয়নি।

বিজ্ঞাপন

এ মামলায় পুলিশের চার সদস্য ছাড়াও চকরিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা রাবেয়া খানম, সহকারী শিক্ জসীম উদ্দিন, সহকারী শিক্ষক মোস্তফা কামাল, বিদ্যালয়ের অফিস সহায়ক পারভেজ ও বিদ্যালয়ের নৈশপ্রহরী নুর মোহাম্মদকেও আসামি করা হয়েছে।

আদালত সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। জেলা ও দায়রা জজ আদালত সূত্র জানিয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার (১১ সেপ্টেম্বর) কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ফৌজদারি দরখাস্তটি জমা দেন নিহত দুর্জয় চৌধুরীর বাবা কমল চৌধুরী। ওইদিন দরখাস্তটি আমলে না নিলেও রোববার ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মামুনুর রশিদ দরখাস্তটি আমলে নিয়ে আবেদনটি মামলা হিসেবে রেকর্ড করার জন্য পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেন।

এ ঘটনায় জেলা পুলিশ ইতোপূর্বে ‘কর্তব্যে অবহেলার দায়ে চকরিয়া থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম, সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মহিউদ্দীন ও দুই কনস্টেবলকে ‘ক্লোজড’ করেছিল।

গত ২২ আগস্ট ভোর রাতে চকরিয়া থানা হাজতের ভেতরে গলায় শার্ট দিয়ে প্যাঁচানো ঝুলন্ত অবস্থায় ওই চকরিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের কম্পিউটার অপারেটর দুর্জয় চৌধুরীর মরদেহ পাওয়া যায়।

নিহত দুর্জয় চৌধুরী (২৭) চকরিয়া পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড ভরামুহুরী হিন্দুপাড়ার কমল চৌধুরীর ছেলে। তিনি চকরিয়া সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

চকরিয়া থানা সূত্র মতে, চকরিয়া পৌর সদরের সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী দুর্জয় চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২ লাখ ৮৩ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে ২১ আগস্ট রাতে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাবেয়া খানম। এ সময় প্রধান শিক্ষকসহ আরও বেশ কয়েকজন শিক্ষক অভিযুক্ত দুর্জয় চৌধূরীকে ধরে থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। পরে স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও চকরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রপায়ন দেব আসামি দুর্জয় চৌধুরীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন।

সূত্র মতে, নির্দেশনা পেয়ে পুলিশ রাত ১১টার দিকে একটি সাধারণ ডাইরি (জিডি) গ্রহণ করে দুর্জয় চৌধুরীকে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে থানা হাজতে আটক রাখে। পরে থানার সিসিটিভি ফুটেজে রাত ১টা ২৭ মিনিটের দিকে দুর্জয় চৌধূরীকে থানা হাজতের ভেতর হাঁটতে দেখা গেলেও ভোররাত ৪টার দিকে তার ঝুলন্ত লাশ দেখতে পায় পুলিশ।

দুর্জয় চৌধূরীর পিতা কমল চৌধূরীর অভিযোগ, ‘আমার ছেলে দুর্জয় চৌধূরীর বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই তাকে বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে আটকে রাখেন প্রধান শিক্ষক রাবেয়া খানম। পরে এদিন রাতে লিখিত অভিযোগ দিয়ে দুর্জয় চৌধূরীকে থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। লিখিত অভিযোগ পেয়ে পুলিশ দুর্জয় চৌধূরীকে থানা হাজতে আটক রাখে। শুক্রবার ভোররাত ৪টার দিকে থানা হাজতের দরজার গ্রিলের সাথে শার্ট প্যাঁচানো অবস্থায় আমার ছেলের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।’

তিনি জানান, গত ২৬ আগস্ট তার ছেলের হত্যাকাণ্ডের জন্য চকরিয়া থানায় এজাহার দায়ের করেছিলেন। কিন্তু এজাহারটি মামলা হিসেবে রেকর্ড না করে এএসপি (সার্কেল) অভিজিৎ দাসের উপস্থিতিতে ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা’ করে মামলা নেয়া হবে বলে জানানো হয়। রোববার (১৪ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত এজাহারটি গ্রহণ করা না করায় আদালতে মামলা করতে বাধ্য হয়েছেন।

চকরিয়া থানার তৎকালীন ওসি শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, বৃহস্পতিবার রাত ৯টা থেকে শুক্রবার ভোররাত পর্যন্ত তিনি এএসপি সার্কেলের সাথে চকরিয়ার সাহারবিল ও ডুলাহাজারা ইউনিয়নে অভিযানে ছিলেন। সকালে থানাহাজত থেকে দুর্জয় চৌধূরীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন