চট্টগ্রামের হালিশহরে বন্দর নগরী বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের নামে বরাদ্দ পাওয়া জমিতে ‘সুপার মার্কেট’ নির্মাণ প্রকল্পে শতকোটি টাকার দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও মানি লন্ডারিংয়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সরকারি বরাদ্দপ্রাপ্ত এ জমির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা প্রকল্পকে কেন্দ্র করে বিগত তিন দশকে একাধিকবার কমিটি পরিবর্তনের আড়ালে গড়ে উঠেছে দুর্নীতির সাম্রাজ্য। এতে জড়িত সমিতির প্রভাবশালী নেতা ও বিতর্কিত ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা।
এ নিয়ে অবশেষে তদন্তে নেমেছে বিভাগীয় সমবায় কার্যালয়। গত ২ জুলাই উপনিবন্ধক মোহাম্মদ মাহবুবুল হক হাজারীর সই করা এক নোটিসে এই তদন্তের কথা জানানো হয়। এর আগে ভুক্তভোগী সমিতির সদস্যরা দুর্নীতি দমন কমিশনেও অভিযোগ দিয়েছিলেন। দুদকও সেটির তদন্ত করছে। সমবায় কার্যালয়ের অডিটেও সমিতির বিষয়ে ১০টি খাতে বেশকিছু দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে।
জানা যায়, ১৯৮৮ সালে নিবন্ধিত সমিতির নামে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ১৯৯১ সালে হালিশহর হাউজিং এস্টেটের জি ও এইচ ব্লকের মধ্যবর্তী স্থানে ০.৯৫ একর জমি বরাদ্দ দেয়। জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা। প্রকল্পের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল সুপার মার্কেট নির্মাণ ও সদস্যদের মাঝে দোকান বরাদ্দ দেওয়া। নিবন্ধনের সময় সমিতির সদস্য ছিল ২১৯ জন। কিন্তু ঘুস ও অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে তা বাড়িয়ে ৫১০ জনে উন্নীত করা হয়। বর্তমানে সদস্য সংখ্যা ৮০০ রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে সদস্য বৃদ্ধির বিনিময়ে সংগৃহীত টাকা সমিতির ফান্ডে জমা না হয়ে চলে যায় তৎকালীন কমিটির নেতাদের পকেটে।
সমিতির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কারো কাছ থেকে পাঁচ লাখ আবার কারো কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা করে মোট ৪০ কোটি টাকা নেওয়া হয়। এরপর সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের হালিশহর শাখা থেকে পাঁচ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়। অথচ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ২২ কোটি ৬১ লাখ টাকা, কাজ শুরু হয় ২০০২ সালে। কার্যাদেশ দেওয়া হয় ডেল্টা ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনকে। ২০০৭ সালে প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন করে সেটির বাজেট ৫৮ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে ৬০ শতাংশের মতো।
সমিতির সদস্যরা জানান, প্রকল্প শেষ না হওয়ায় ২০১৬ সালে ৩০৭ জন দোকান মালিক জেলা সমবায় কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেন। এরপর গঠিত তদন্ত কমিটি প্রকল্পের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসানকে সুদসহ মোট পাঁচ কোটি ৪৯ লাখ টাকা আত্মসাতের দায়ে অভিযুক্ত করে। জেলা সমবায় কর্মকর্তার একাধিক অডিট রিপোর্টেও এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সাধারণ সদস্যদের মধ্যে মোমিন মোল্লা, দিদার আহমেদ ও রনিসহ অন্তত ১০ জন সদস্য অভিযোগ করেন, বর্তমান কমিটির সভাপতি সাহাবউদ্দিন ও সম্পাদক ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও মানি লন্ডারিংয়ের একাধিক অভিযোগ রয়েছে। তারা বর্তমানে পলাতক থাকলেও, তাদের অনুসারীদের মাধ্যমে সাধারণ সদস্যদের হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে। সিডিএ অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী খোলা জায়গা থাকা সত্ত্বেও বর্তমান কমিটি তা নকশা বহির্ভূতভাবে নির্মাণ করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করছে। এতে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে তারা, যা কোনোভাবেই সমিতির ফান্ডে জমা হচ্ছে না। সমিতির মূল দলিলপত্র, সদস্য রেজিস্ট্রার, লেজার, দৈনিক হিসাব বহি- সবই অনুপস্থিত। কেউ জানে না প্রকৃত সদস্য কে, কে বাদ পড়েছে আর কে নতুন যোগ হয়েছে। এমনকি প্রতিটি সদস্যের ছবি, আইডি কার্ড, ঠিকানা সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও কিছুই অবশিষ্ট নেই।
প্রায় ৩৭ বছর ধরে সমবায় অফিসের একাধিক কর্মকর্তার সহযোগিতায় একই পরিবারভিত্তিক কমিটি পরিচালনার অভিযোগও উঠেছে। কখনো বাবা, কখনো ছেলে, আবার কখনো স্ত্রী- এই পদ্ধতিতে কমিটি গঠনের ইতিহাস তদন্ত করলেই দুর্নীতির চিত্র স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।
দোকান বুঝে পাননি কেউ
এই সমিতি নিয়ে অডিটেও উঠে এলো ভয়াবহ রকমের তথ্য। জেলা সমবায় অফিসের সর্বশেষ অডিট রিপোর্ট সংগ্রহ করেছে আমার দেশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরের অডিটে উঠে এসেছে ভয়াবহ অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও কোটি কোটি টাকার হিসাব গরমিলের তথ্য।
অডিট প্রতিবেদনে দেখা যায়, সমিতির মার্কেট নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৭৪ কোটি ৩১ লাখ ৯৭ হাজার ৭১০ টাকা। অথচ দীর্ঘদিন ধরে ৭৯ কিস্তিতে বিপুল পরিমাণ টাকা আদায় করা হলেও আজ পর্যন্ত কোনো সদস্য দোকান বুঝে পাননি। এ বিষয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটির কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা নেই।
সমবায় আইন ও বিধিমালার একাধিক ধারা লঙ্ঘন করে এই প্রকল্প পরিচালিত হয়েছে বলে অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে। কর্মচারী নিয়োগে কোনো সার্ভিস রুলস প্রণয়ন করা হয়নি, বার্ষিক হিসাব দাখিল করা হয়নি, এমনকি অবচয় তহবিল না রাখায় সমিতি লাভ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অডিট রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে, চলতি বছরেই সমিতির লোকসান হয়েছে প্রায় ১৭ লাখ টাকা। আর লোকসান দাঁড়িয়েছে এক কোটি ৪৭ লাখ টাকার বেশি।
২০১২-১৩ অর্থবছরে ইলেকট্রো মেকানিক্যাল কাজের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হলেও কাজের অগ্রগতি বা অস্তিত্ব কোথাও পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে, সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান আত্মসাৎ করেছেন এক কোটি ৯৫ লাখ টাকা, যার ওপর সুদসহ আরো ৭১ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। এই বিপুল অর্থ আদায়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
নিয়ম অনুযায়ী সমিতির সদস্যদের কাছ থেকে নিয়মিত সঞ্চয় আদায় করার কথা থাকলেও সেটিও বন্ধ রয়েছে বহুদিন ধরে। সমিতির ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অডিটের জন্য উপস্থাপিত হিসাবপত্রও প্রযোজ্য নিয়ম মেনে তৈরি হয়নি। প্রকল্পে বিপুল ব্যয় হলেও কোনো সভার কার্যবিবরণীতে এ সংক্রান্ত আলোচনা নেই।
অডিট প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বছরের পর বছর ধরে গৃহীত অর্থের যথাযথ ব্যবহার না হওয়ায় সমিতিটি এখন দেউলিয়া হওয়ার মুখে। সাধারণ সদস্যদের স্বার্থ চরমভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে, যা সামগ্রিকভাবে সমবায় আন্দোলনের জন্যও উদ্বেগজনক বার্তা।
সাধারণ সদস্যদের দাবি, স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং প্রকল্পটিকে বাঁচাতে অযোগ্য কমিটিকে দ্রুত অপসারণ করে গণতান্ত্রিকভাবে নতুন কমিটি গঠন করতে হবে।
এ বিষয়ে কমিটির সভাপতি সাহাবউদ্দিন ও সম্পাদক ওমর ফারুকের বক্তব্য জানতে তাদের বারবার কল করা হলেও রিসিভ করেননি। বিভাগীয় সমবায় কার্যালয়ের উপনিবন্ধক মাহবুবুল হক হাজারী আমার দেশকে বলেন, সমিতির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছি। সরেজমিন গিয়ে সমিতির সদস্যদের সঙ্গে কথাও বলেছি। তদন্ত শেষে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

