জুলাই বিপ্লবের অমর যোদ্ধা

পুলিশের গুলিতে শহীদ রফিকের পরিবারের খোঁজ নেয় না কেউ

পুলিশের গুলিতে শহীদ রফিকের পরিবারের খোঁজ নেয় না কেউ

ঢাকার একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করতেন রফিক। সামান্য বেতন দিয়ে কোনমতে বৃদ্ধ বাবা-মা, বোন ও স্ত্রী-কন্যার ভরণপোষণ করতেন। স্বপ্ন ছিল ইতালি যাওয়ার। দুবাই হয়ে ইউরোপের দেশটিতে যাওয়া সহজ, তাই দুবাইয়ের ভিসাও লাগিয়েছিলেন পাসপোর্টে। কিন্তু চব্বিশের জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোয় দেশের জন্য দায় থেকে বাড়ি মানিকগঞ্জে এসে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন রফিক। সংসারের সচ্ছলতা ফেরানোর তার সে স্বপ্ন পূরণ হতে দেয়নি পুলিশ। শেখ হাসিনার পতনের দিন ৫ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে মিছিলে পাটুরিয়া ঘাটে নৌ পুলিশের গুলিতে শহীদ হন তিনি। তার মৃত্যুতে নিঃস্ব হয়ে যায় পরিবারটি।

ঘটনার দুই বছর কেটে গেলেও তার পরিবার আজও শোক, অনিশ্চয়তা ও অভাবের সঙ্গে লড়াই করছে। ঘটনার পর মানিকগঞ্জের দানবীর ও বর্তমান সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা নিহত রফিকের বাড়ি এসে সহযোগিতা করেছেন। খোঁজখবর নেয় জামায়াতে ইসলামীও। এখন একমাত্র রিতা আপা ছাড়া কোনো নেতাকর্মী বা প্রতিষ্ঠান রফিকের পরিবারের খোঁজ নিচ্ছে না বলে জানিয়েছেন রফিকের বাবা রইজদ্দিন।

বিজ্ঞাপন

পরিবারের অভিযোগ, রফিক নিহত হওয়ার পর প্রথম দিকে কিছু মানুষ সমবেদনা জানালেও এখন আর কেউ তাদের খবর নেন না। রফিকের মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন তার স্ত্রী, একমাত্র মেয়ে রাইসা, বৃদ্ধ বাবা ও মা এবং উচ্চ মাধ্যমিক পড়ুয়া বোন। তার আয়েই চলত সংসার, সন্তানের পড়াশোনা এবং বৃদ্ধ বাবা-মার চিকিৎসা। হঠাৎ করে তাকে হারিয়ে পরিবারটি এখন দিশাহারা। কোনোমতে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে তাদের।

রফিকের স্ত্রী শ্রাবণী বলেন, স্বামীকে হারানোর কষ্ট তো কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। কিন্তু শিশুসন্তানকে নিয়ে কীভাবে বাঁচব, কীভাবে পড়াশোনা করাব; সেটাই এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা। সবাই তখন অনেক কথা বলেছিলেন কিন্তু এখন আমাদের পাশে কেউ নেই।

জানা গেছে, রফিকের একমাত্র মেয়ে রাইসা আক্তার (৪) বাবার কথা মনে করে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ে। সে এখনো বুঝে উঠতে পারেনি, কেন তার বাবা আর বাড়ি ফিরে আসবেন না। বৃদ্ধ বাবা-মাও ছেলের শোকে ভেঙে পড়েছেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই দম্পতি এখন ছেলে হারানোর বেদনার পাশাপাশি সংসারের অভাব-অনটন সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। মেয়েকে লেখাপড়া করাতে পারছেন না।

প্রতিবেশীরা জানান, রফিক ছিলেন পরিশ্রমী ও শান্ত স্বভাবের মানুষ। পরিবারের প্রতি তার ছিল গভীর দায়িত্ববোধ। তার মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো এলাকায়ই নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

স্থানীয়দের দাবি, রফিকের পরিবারকে দ্রুত আর্থিক সহায়তা, সন্তানের পড়াশোনার দায়িত্ব এবং বৃদ্ধ বাবা-মার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি। তারা বলেন, একজন মানুষের মৃত্যু শুধু একটি ঘটনার পরিসংখ্যান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের স্বপ্ন, নিরাপত্তা ও ভবিষৎ। ফ্যাসিস্ট হাসিনা রফিকের পরিবারকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। সরকার তাদের পাশে না দাঁড়ালে ইনসাফ হবে না বলে মনে করেন এলাকাবাসী।

আজ রফিক নেই কিন্তু তার রেখে যাওয়া স্ত্রী-সন্তান, বোন ও বৃদ্ধ বাবা-মার চোখে এখনো একটাই প্রশ্ন—তাদের পাশে দাঁড়াবে কে?

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন