সার ডিলার নিয়োগে চরম অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতিতে বিএনপির তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অনেক জায়গায় আওয়ামী ঘরানার লোকজন ডিলারশিপ পাওয়ায় চলছে ব্যাপক সমালোচনা। অনিয়ম ও জালিয়াতি করে পাওয়া ডিলারশিপ বাতিলের দাবি জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা।
বাগেরহাটে সার ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিনের ত্যাগীদের মূল্যায়ন না করে বিএনপি নেতাদের স্বজনদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের। আওয়ামী ঘরানার ব্যক্তিদেরও সার ডিলারের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে বলে দাবি তাদের। এসব ঘটনায় ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
বরিশালে বিএনপি নেতার দুই ভাই সারের ডিলারশিপ পেয়েছেন। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় বইছে। মেহেন্দিগঞ্জে তথ্য গোপন করে সারের ডিলারশিপ নিয়েছেন গৃহবধূ বিউটি বেগম। বিউটি ও তার স্বামী আলম খন্দকারের নামে ভোলা জেলায় পৃথক দুটি সারের ডিলারশিপ রয়েছে বলেও অভিযোগ।
মানিকগঞ্জে নতুন সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। সাটুরিয়ায় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এক জনপ্রতিনিধির স্ত্রীর ডিলারশিপ পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত যুবদল নেতা ডিলারশিপ না পাওয়ায় চলছে ব্যাপক সমালোচনা।
এদিকে সুনামগঞ্জের শাল্লায় সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তা বাতিলের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বক্তারা।
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের খাউলিয়া ইউনিয়নে আবুল আহসান বিশ্বাস নামে একজনকে লাইসেন্স দেওয়ার ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও সাবেক ডিআইজি রহিম খানের ভাগনে। এ নিয়োগের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও কৃষি কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে।
মোরেলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, উপজেলা পর্যায়ের যাচাই-বাছাই কমিটি আবেদনগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সুপারিশ করেছে। এর ভিত্তিতে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখানে দলীয় পরিচয়কে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
উপজেলা কৃষক দলের সভাপতি জয়নাল আবেদীন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম করে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়েছি। কিন্তু এখনো আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা নানা কৌশলে সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন।
মোল্লাহাট উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব জাহিদুল ইসলাম মিয়া বলেন, সার ডিলার নিয়োগের মাধ্যমে আওয়ামীপন্থি ব্যবসায়ীদের প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। দলীয় তাগিদের অবমূল্যায়ন করে স্বজনপ্রীতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের অভিযোগ, শুধু মোরেলগঞ্জ বা মোল্লাহাট নয়, প্রায় সব ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে একই ধরনের অনিয়ম হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোতাহার হোসেন বলেন, উপজেলা পর্যায়ের যাচাই-বাছাই কমিটি আবেদনগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সুপারিশ করেছে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, সেগুলোর সবই সত্য নয়। কিছু অভিযোগ পেয়েছি। সেগুলোর বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।
ভোলার বাসিন্দা বরিশালের ডিলার
বরিশাল সদরের ৮ নম্বর চাঁদপুরা ইউনিয়ন এবং ৯ নম্বর টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়নে বিএনপি নেতার দুই ভাই সারের ডিলারশিপ পেয়েছেন। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় বইছে। সদর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক বাবুল খন্দকারের দুই ভাই সিরাজ খন্দকার ও শাহ আলম খন্দকার দুটি ইউনিয়নে সারের ডিলারশিপ পেয়েছেন।
একইভাবে মেহেন্দিগঞ্জের আলিমাবাদ ইউনিয়নের ‘মেসার্স ভাই ভাই ট্রেডার্স’ নামে সার ও কীটনাশকের ভুয়া ট্রেড লাইসেন্স তৈরি করে এবং তথ্য গোপন করে ডিলারশিপ নিয়েছেন গৃহবধূ বিউটি বেগম। বিউটি ও তার স্বামী আলমের ভোলায় পৃথক দুটি সারের ডিলারশিপ রয়েছে বলেও অভিযোগ।
জানা গেছে, সদর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক বাবুলের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবে তার ছোট ভাই সিরাজ খন্দকার টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়নে সারের ডিলারশিপ পেয়েছেন। অন্যদিকে আরেক ভাই শাহ আলম খন্দকার চাঁদপুরা ইউনিয়নের কুন্দিয়ালপাড়া গ্রামের বাসিন্দা হিসেবে খন্দকার স্টোর নামে সারের ডিলারশিপ নিয়েছেন।
নতুন নিয়োগ পাওয়া সার ডিলার খন্দকার শাহ আলম ও খন্দকার সিরাজ সাংবাদিকদের জানান, তারা সরকারি নিয়মনীতি মেনেই ডিলারশিপ পেয়েছেন।
এদিকে বিউটির স্বামী আলম খন্দকারের নামে ভোলার রাজাপুর ইউনিয়নের জনতা বাজারে সার খুচরা বিক্রেতার সাব-ডিলারশিপ রয়েছে। এছাড়া বিউটির কর্নরোকপুর মোল্লা বাজারে মেসার্স জাহাঙ্গীর ট্রেডার্স নামে আরো একটি সারের ডিলারশিপ পরিচালনা করেন। জাহাঙ্গীর ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী বিউটি নিজেই।
সূত্র জানায়, আলিমাবাদ ইউনিয়নের সারের ডিলারশিপ পাওয়ার জন্য বিউটি তার পূর্বের ভোলার ভোটার ঠিকানা তড়িঘড়ি করে পরিবর্তন করে মেহেন্দিগঞ্জের আলিমাবাদ ইউনিয়নে নিয়ে আসে। অন্যদিকে বিউটির পিতা-মাতা, স্বামীসহ পরিবারের সব সদস্যের স্থায়ী ঠিকানা ভোলা এবং তারা সবাই ভোলায় স্থায়ীভাবে থাকেন।
এ বিষয়ে ১০ নম্বর আলিমাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইমরান হোসেন বলেন, বিউটির নামের ট্রেড লাইসেন্সটি সম্পূর্ণ অবৈধভাবে তৈরি করা। এটি ভুয়া ট্রেড লাইসেন্স। বিউটির ট্রেড লাইসেন্সের কোনো ডকুমেন্ট আমাদের ইউপিতে নেই।
মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা চন্দ্র শেখর বসু বলেন, আমরা কাগজপত্র দেখে নিয়মমাফিকভাবে বিউটিকে সারের ডিলারশিপের জন্য নাম পাঠিয়েছি। তবে তার কাগজপত্রে যদি কোনো ঘাটতি থাকে তা খতিয়ে দেখা হবে।
মানিকগঞ্জে আ.লীগ নেতার স্ত্রী সার ডিলার
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় উপজেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এক জনপ্রতিনিধির স্ত্রীর ডিলারশিপ পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এদিকে দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এক যুবদল নেতার ডিলারশিপ না পাওয়াকে কেন্দ্র করেও চলছে আলোচনা। এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে দল থেকে অব্যাহতি নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ওই যুবদল নেতা।
সাটুরিয়ার হরগজ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল আওয়াল আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার স্ত্রী মালা আক্তার নতুন সার ডিলার হিসেবে মনোনীত হওয়ায় স্থানীয়ভাবে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে, দরগ্রাম ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ৪০ বছর ধরে এ ব্যবসা করার অভিজ্ঞতা থাকলেও নতুন ডিলার নিয়োগে তিনি মনোনীত হননি বলে জানা গেছে।
শাল্লায় নিয়োগ বাতিল দাবিতে মানববন্ধন
সুনামগঞ্জের শাল্লায় সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে নিয়োগ বাতিলের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা। মানববন্ধনে বক্তারা সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে নিয়োগ স্থগিত করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ও যোগ্য ব্যবসায়ীদের ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। দাবি বাস্তবায়ন না হলে হরতাল-অবরোধসহ কঠোর কর্মসূচি পালনের হুঁশিয়ারিও দেন তারা।
মঙ্গলবার দুপুরে পুরোনো শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে ‘স্থানীয় সচেতন নাগরিক’-এর ব্যানারে এ মানববন্ধন হয়। ৪ নম্বর শাল্লা ইউনিয়নের শহীদ মিয়ার পরিচালনায় মানববন্ধনে ব্যবসায়ীদের পক্ষে বক্তব্য দেন উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক তারেক হাসান মুন্না, সাবেক ছাত্রনেতা এইচএম এরশাদ, শফি মিয়া, রাব্বুল হোসাইন ও ব্যবসায়ী বাবু মিয়া প্রমুখ।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, টাকার বিনিময়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ শাল্লা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সভাপতি বিশ্বজিৎ চৌধুরী নান্টুর স্ত্রী ঝিমলি তালুকদারকে বাহাড়া সদর কেন্দ্রে এবং ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী জুয়েল রায়কে উপজেলার আনন্দপুর কেন্দ্রে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
মানববন্ধনে সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও ইউএনও পিয়াস চন্দ্র দাসের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বক্তারা। তাদের অভিযোগ, ইউএনও পিয়াস শাল্লায় যোগদানের পর থেকে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আসছেন। বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সার ডিলার নিয়োগ বাতিল করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে নতুন করে নিয়োগের ব্যবস্থা না করা হলে হরতাল, অবরোধসহ কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে শাল্লা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শুভজিৎ রায় কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সুনামগঞ্জের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ওমর ফারুক বলেন, এ বিষয়ে আমি কোনো কিছু বলতে পারব না।
ইউএনও পিয়াস দাস বলেন, আমরা কাউকে সুপারিশ করে পাঠাইনি। তদন্ত করে যা পেয়েছি, জেলায় তাই পাঠিয়েছি। এ বিষয়ে আমাদের কোনো হস্তক্ষেপ ছিল না।
[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন স্থানীয় প্রতিনিধিরা]
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


