বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে, চামড়ায় পড়েছে বলিরেখা। যেখানে এই বয়সে বিশ্রামে থাকার কথা, সেখানে পেটের দায়ে এবং আত্মসম্মান বজায় রাখতে এখনো ভ্যানের হ্যান্ডেল ধরে আছেন ৭৮ বছর বয়সি আব্দুল রশিদ। জীবনের শেষ বিকেলে এসেও তিনি কারও কাছে হাত পাতেননি, বরং হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন নিজের সংসার।
বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার খলিশাখালী গ্রামের মৃত এরফান শিকদারের ছেলে আব্দুল রশিদ। দীর্ঘ পারিবারিক জীবনে তিনি ৩ ছেলে ও ২ মেয়ের জনক। সন্তানদের বিয়েশাদি দিয়ে থিতু করলেও বর্তমানে তিনি সন্তানদের ওপর নির্ভরশীল নন। বৃদ্ধা স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা ঘরে বসবাস করেন এবং নিজের উপার্জনেই দুজনের ভরণপোষণ ও সংসার চালাচ্ছেন।
রশিদ মিয়ার জীবনের বড় একটা অংশ কেটেছে এই ভ্যানের চাকার সাথে। ২০০১ সাল থেকে তিনি পেশাদারভাবে ভ্যান চালানো শুরু করেন। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে রোদ, বৃষ্টি, ঝড় উপেক্ষা করে প্রতিদিন তিনি ভ্যান নিয়ে বের হন। এখনো দিনে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত আয় করেন, যা দিয়ে কোনো রকমে চলে তাদের দুই বুড়ো-বুড়ির সংসার।
আজ থেকে ঠিক দুই বছর আগের কথা। হুট করেই তার একমাত্র আয়ের উৎস ভ্যানটি চুরি হয়ে যায়। আকাশ ভেঙে পড়ে বৃদ্ধ রশিদ মিয়ার মাথায়। একদিকে আয়ের পথ বন্ধ, অন্যদিকে নতুন ভ্যান কেনার সামর্থ্য নেই। কিন্তু তিনি দমে যাননি। নিজের নামে লোন পাওয়ার সুযোগ না থাকায়, অন্য একজনের নামে ঋণ (লোন) তুলে আবার একটি নতুন ভ্যান কিনেন। এরপর শুরু হয় সেই ঋণ শোধ করার নতুন এক যুদ্ধ। দিনরাত পরিশ্রম করে সম্প্রতি তিনি সেই ঋণের সমস্ত টাকা পরিশোধ করেছেন। ঋণের বোঝা মুক্ত হয়ে এখন তিনি অনেকটাই স্বস্তিতে।
বর্তমানে ৭৮ বছর বয়সে এসে শরীরে দানা বেঁধেছে নানা রোগব্যাধি। আগের মতো শক্তি পান না হাতে-পায়ে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া কিংবা ভারী মালপত্র টানা এখন তার পক্ষে অসম্ভব। কিন্তু তাই বলে তো বসে থাকলে উনুন জ্বলবে না। তাই শারীরিক অসুস্থতা ও বয়সের কথা বিবেচনা করে এখন তিনি দূর-দূরান্তে যান না। শুধু নিজের গ্রাম ও আশেপাশের পরিচিত এলাকার মধ্যেই সীমিত পরিসরে ভ্যান চালান।
আব্দুল রশিদ মিয়া সমাজের সেইসব মানুষদের একজন, যারা অন্যের ওপর বোঝা না হয়ে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে বাঁচতে ভালোবাসেন। সমাজে যখন বৃদ্ধ বাবা-মাকে অবহেলার গল্প অহরহ শোনা যায়, কিংবা সামান্য কারণে মানুষ ভিক্ষাবৃত্তির পথ বেছে নেয়, তখন বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার মঘিয়া ইউনিয়নের খলিশাখালীর এই আব্দুল রশিদ মিয়া এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বয়স আর অসুস্থতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তার এই সততা ও পরিশ্রমের জীবনসংগ্রাম এলাকার তরুণ প্রজন্মের জন্য এক বিরাট অনুপ্রেরণা।
এএস
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

