বগুড়া পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষক নিয়োগে কর্তৃপক্ষ অনিয়মের আশ্রয় নেয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কলেজের উপাধ্যক্ষ ও সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগে মানা হয়নি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা। নিয়োগের ক্ষেত্রে লঙ্ঘন করা হয়েছে জ্যেষ্ঠতাও।
বিধি-বিধান না মেনে উপাধ্যক্ষ পদ সৃষ্টি করে কলেবর বাড়ানো হয়েছে। অথচ এ পদের আদৌ প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে প্রায় অর্ধশত শিক্ষকের স্বাক্ষর করা একটি লিখিত আবেদনে বিষয়টি জানানো হলেও সেটিকে আমলে না নিয়ে রাজনৈতিক চাপে নিয়োগ দেওয়া হয়। এছাড়া নিয়োগপাপ্তরা আওয়ামী অনুসারী বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, গত চার মাস আগে কোনো বিধি না মেনেই জনবল কাঠামোর বাইরে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়ভাবে উপাধ্যক্ষ পদ সৃষ্টি করা হয়। সেখানে ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২১’ মানা হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিষ্ঠানটির একাধিক শিক্ষক-কর্মচারীর অভিযোগ করে জানিয়েছেন, চলতি বছরের ৯ এপ্রিল গভর্নিং বডির সভায় হিসাববিজ্ঞান বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক মো. হাবিবুর রহমান রজিবকে উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়, জ্যেষ্ঠতার দিক থেকে তালিকায় যার নাম ১১ নম্বরে। গত ১০ মে গভর্নিং বডির সভায় তাকে নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে তার অফিসও সুসজ্জিত করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রতিবাদকারী শিক্ষকদের কমিটি থেকে বাদ দেওয়ার ব্যাপারেও চাপ প্রয়োগ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, চলতি বছরের ২৬ জুলাই কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের সেকেন্ড টার্ম পরীক্ষার ফলাফলে ব্যবসায় শিক্ষা শাখার পাঁচ পরীক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য হয়। অথচ এই বিভাগে পাঁচ শিক্ষক দায়িত্বে আছেন। মান বাঁচানোর জন্য সবাইকে গ্রেস দিয়ে পাস করানো হয়। অথচ জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা অনুসারে ‘ব্যবসায় শিক্ষা’ বিভাগের শিক্ষকদের এমপিও বাতিল হতে পারে, যা না মেনে বরং দায়িত্বশীল পদে রাখা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তিনি কৌশলে গ্রুপিং করছেন। তার বড় ভাই মো. আফজাল হোসেন মুকুল বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের শহর কমিটির সহসভাপতি ছিলেন। তিনি বর্তমানে বিএনপির কাছের লোক বলে দাবি করেন।
এদিকে, মো. আলমগীর হোসেন নামে একজনকে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার প্রোফাইল ঘেঁটে দেখা যায়, তিনি একজন ফ্যাসিস্টের অনুসারী ও হাসিনা-মুজিবের বন্দনাকারী। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন—ফ্যাসিস্টের পতনের পরও পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়া তার নিয়োগ হয় কীভাবে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে তাকে নিয়োগ দেয় স্কুল কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে স্কুলের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কাজী মনজুরুল হক বলেন, নিয়োগের ব্যাপারটি ঠিক রয়েছে। আগামীতে পূর্ণাঙ্গ অধ্যক্ষ নিয়োগের ফাইলটিও সভাপতি বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে।
বগুড়া জেলা শিক্ষা অফিসার রমজান আলী বলেন, নিয়োগটি সম্পূর্ণ নিয়ম মেনে পরীক্ষা নিয়েই করা হয়েছে। ২০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে তিনি প্রথম হন। তিনি ফ্যাসিস্টের অনুসারী হওয়ার পরও পুলিশ ভেরিফিকেশন না করেই নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। এখন এসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, আমি নিজেও শুনেছি ও জেনেছি।
নিয়োগ পাওয়া উপাধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে চাকরি করছি, আমি যোগ্য। তবে ১১ জনকে অতিক্রম করে তাকে এ পদে নিয়োগের বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান।
এদিকে, গভর্নিং বডির সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন), মো. আসাদুজ্জামান গভর্নিং বডির প্রতিটি সভায় উপস্থিত থাকেন। তিনি প্রতিষ্ঠানের প্রভাষক মো. হাবিবুর রহমান রজিবের সব অন্যায় কর্মকাণ্ডকে সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা করে যাচ্ছেন বলে শিক্ষকদের একাংশের দাবি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্কুলের সভাপতির অনুরোধে অনেক কাজই বাধ্যতামূলক করতে হয়েছে। আমি স্কুল গভর্নিং বডির কেউ না।
বগুড়া পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজের বর্তমান সভাপতি মো. জেদান আল মুসা, পিপিএম (পুলিশ সুপার) বলেন, আগামীতে স্কুলের প্রতি আমরা যত্নশীল হব। স্কুলের ভবন নির্মাণে অচিরেই কাজ শুরু করতে যাচ্ছি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

