পৃথিবীর ‘ফুসফুস’ আমাজন। বাংলাদেশের ফুসফুস সুন্দরবন আর কুমিল্লার ফুসফুস ধর্মসাগর দিঘি। প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট- এ দুই কারণেই ধর্মসাগরের সৌন্দর্য আজ হুমকিতে। তবে এর প্রধান কারণ মানবসৃষ্ট।
ঐতিহ্যবাহী ধর্মসাগর দিঘি কুমিল্লা নগরীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। এত বড় জলাধার নগরীর আশপাশে কোথাও নেই। সাড়ে ৫০০ বছর আগের ধর্মসাগর তাই ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক-বাহক তো বটেই, এ অঞ্চলের মানুষের জন্য এক টুকরো স্বস্তির জায়গাও। ‘কুমিল্লার ফুসফুস’ বলেই তাই ধর্মসাগরকে অভিহিত করে থাকেন স্থানীয়রা।
নগরীর বিশিষ্টজনরা বলছেন, ধর্মসাগর দিঘির পানি একসময় মানুষ পান করত । কিন্তু এখন তা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তা থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে, যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ধর্মসাগর দিঘির পশ্চিমে পুলিশ সুপারের কার্যালয়, এলজিইডি ভবন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কার্যালয়, পূর্বে কুমিল্লা স্টেডিয়াম, উত্তরে রানির কুঠির, নজরুল ইনস্টিটিউট, গুলবাগিচা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং দক্ষিণে রিভাইবেল চার্চ এবং কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ও মহানগর বিএনপির অফিস।
ধর্মসাগর নাম শুনে অনেকের চোখের সামনে ভেসে উঠতে পারে বিশালাকার ঢেউ আছড়ে পড়া কোনো উত্তাল সাগর। তবে এ ধর্মসাগর সাগর নয়, বিশালাকার এক দিঘি। কুমিল্লা শহরে যারাই ঘুরতে আসেন, তাদের ধর্মসাগর পাড়ে না গেলে অতৃপ্তি রয়ে যায় বলে অনেক তরুণের অভিব্যক্তি।
সকাল-বিকাল কিংবা সন্ধ্যায় ক্লান্ত-শ্রান্ত মানুষের ভিড় লেগেই থাকে এ ধর্মসাগর পাড়ে। কেউ বসে থাকেন বিষণ্ণ মনে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে চুটিয়ে আড্ডা দেন। কেউবা পরিবার-পরিজন নিয়ে একটু মুক্ত বাতাসের সন্ধান করেন ধর্মসাগরের চারপাশে। কত শত প্রেম-বিচ্ছেদ, কত-না নির্মম মৃত্যুর সাক্ষী এই ধর্মসাগর ।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৪৫৮ সালে ত্রিপুরারাজ ধর্মমাণিক্য খনন করেন এই দিঘি। আয়তন ২৩ দশমিক ১৮ একর। এ অঞ্চলের মানুষের পানির কষ্ট নিবারণ করাই ছিল রাজার মূল উদ্দেশ্য। ‘রাজমালা’ গ্রন্থ আনুযায়ী, মহারাজা ধর্মমাণিক্য রাজত্ব করেন দীর্ঘ ৩২ বছর। তার নামেই দিঘির নামকরণ হয় ‘ধর্মসাগর’। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কুমিল্লা ভ্রমণে এলে সংগীতজ্ঞ শচীন দেব বর্মণের সঙ্গে যেসব জায়গায় সময় কাটাতেন, তার মধ্যে ধর্মসাগর এলাকা অন্যতম।
সময়ের পরিক্রমায় এখন আর সুপেয় পানির জন্য ধর্মসাগরের ওপর নির্ভর করতে হয় না কুমিল্লাবাসীকে। তবে সাড়ে ৫০০ বছর আগের সেই দিঘি এখন পরিণত হয়েছে ঐতিহ্যে। ধর্মসাগর ঘিরে গড়ে উঠেছে নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।
দল বেঁধে হাঁটা, যোগব্যায়াম, পথশিশুদের বিনামূল্যে পড়ালেখা করানোÑএরকম বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে সংগঠনগুলো।
বিকালে দর্শনার্থীদের নৌভ্রমণের সুযোগও রয়েছে এই দিঘিতে। শুক্র ও শনিবার ছুটির দিনে ধর্মসাগরপাড়ে দর্শনার্থী সমাগমে তিল ধারনের ঠাঁই থাকে না ।
কুমিল্লার কান্দিরপাড়ের ইমরান হোসেন লেখাপড়া করেন চাঁদপুর ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজিতে। শনিবার বিকালে বসেছিলেন ধর্মসাগরপাড়ে। তিনি আমার দেশকে বলেন, এখানে এসেছি মাইন্ড ফ্রেশের জন্য। কিন্তু ময়লা দেখে অস্বস্তি লাগছে। একটু আগে আমি একটি কোল্ড ড্রিংকস খেয়েছি। বোতলটি নির্দিষ্ট স্থানে ফেলেছি। সবাইকে সচেতন হতে হবে। এখানে ডাস্টবিন নেই । সিটি করপোরেশন মনে হয় এগুলো চোখে দেখে না।
বান্ধবীদের নিয়ে ঘুরতে এসেছেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সামিয়া আক্তার। তিনি বলেন, আড্ডা দেওয়ার সময় বখাটেদের উৎপাত দেখা যায়। পুলিশের উচিত এখানে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি করা।
এছাড়া সাধারণ মানুষ কোনো কিছু খেয়ে নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে না ফেলে যেখানে-সেখান ফেলে রাখে । যে কারণে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে । বাবার কাছে শুনেছি এই দিঘির পানি খুবই সুন্দর ছিল । কিন্তু এখন পানিটা কালচে হয়ে গেছে । দিঘির ভেতরে প্রচুর ময়লা জমে আছে; এগুলো দেখার বুঝি কেউ নেই।
কুয়েত থেকে আড়াই বছর পর দেশে এসেছেন কুমিল্লার চর্থার আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, কচুরিপানা, পুরোনো বাঁশ, বিভিন্ন ধরনের ময়লা-আবর্জনা জমে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। বসে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। এগুলো পরিষ্কার করার দায়িত্ব কাদের, তা জানি না। তবে প্রতিদিন পরিষ্কার করা দরকার। কারণ, শহরের মানুষ প্রতিদিন এখানে আসে বিনোদনের জন্য ।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লার সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর মাসুম বলেন, ধর্মসাগর দিঘির পরিবেশ রক্ষায় কোনো তদারকি হচ্ছেÑএমন কিছু চোখে পড়ে না। দিঘিরপাড়ে হাঁটতে গেলে পথচারীদের অভিযোগ শুনি তার ভেতরে বিভিন্ন ধরনের ময়লা-আবর্জনা জমে দুর্গন্ধ বের হয় । এ কারণে সেখানে বসে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয় ।
তিনি আরো বলেন, ধর্মসাগরপাড় আমাদের কুমিল্লার ফুসফুস । নিয়মিত পরিষ্কার করা না হলে এই ফুসফুস ক্যানসারে আক্রান্ত হবে। সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের উচিত কুমিল্লার ঐতিহ্য ধর্মসাগর দিঘিসহ অন্যান্য দিঘি রক্ষায় এবং সৌন্দর্য বর্ধনে কাজ করা ।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের সচিব ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামুন বলেন, আমি নিজেই ঘুরতে গিয়ে দেখেছি কিছু ময়লা-আবর্জনা জমে আছে । বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছি পরিষ্কার করার জন্য। যাদের দিঘি লিজ দেওয়া হয়েছে, এ বিষয়ে তাদের সজাগ থাকা উচিত ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

