আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

রেললাইনের জমি অধিগ্রহণ

দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ, ৬ বছরেও প্রতিবেদন দেয়নি দুদক

আনছার হোসেন, কক্সবাজার

দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ, ৬ বছরেও প্রতিবেদন দেয়নি দুদক

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখায় রেললাইনের জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের প্রায় দুই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলার তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ছয় বছরেও আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেনি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তারা মামলার আসামি হওয়ায় ইচ্ছাকৃতভাবে তদন্তে বিলম্ব করা হচ্ছে।

২০২০ সালে রামু উপজেলার ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের লম্বরীপাড়া এলাকার ২০টি হতদরিদ্র পরিবারের ক্ষতিপূরণের টাকা জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে উত্তোলনের অভিযোগে মামলা করেন জাহানারা বেগম নামে এক ভুক্তভোগী। মামলায় কক্সবাজারের তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আশরাফুল আফছার, ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা আবু হাসনাত, অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা দেবতোষ চক্রবর্তী, কানুনগো মোখলেছুর রহমান, সার্ভেয়ার মাসুদ রানা, দালাল শাহজাহান ও শামসুল আলমসহ ১৮ জনকে আসামি করা হয়। বাদীপক্ষের দাবি, জমির মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকায় ক্ষতিপূরণের টাকা বিতরণে নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু সেই আদেশ অমান্য করে এলএ অফিসের কিছু কর্মকর্তা ও দালালচক্রের যোগসাজশে জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে চেক ইস্যু করে টাকা তুলে নেয়।

বিজ্ঞাপন

তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা

আলোচিত এই মামলার পর তদন্তে নামলে একের পর এক দুর্নীতির খবর বের হয়ে আসে। মামলার পর তদন্তে বিপুল পরিমাণ নথিপত্র ও জাল কাগজপত্র জব্দ করা হয় এবং কয়েকজনকে আটকও করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, তদন্তে সরকারি কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিললেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি; বরং কেবল বদলি করা হয়েছে।

দুদক সূত্র জানায়, এ মামলায় ইতোমধ্যে তিনজন তদন্ত কর্মকর্তা বদলি হয়েছেন। কিন্তু ছয় বছরেও কোনো তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে প্রতিবেদন জমা দেননি।

২০ পরিবারের টাকা এক পরিবারের হাতে

আরএস ৯৮ খতিয়ান অনুযায়ী জমির মূল মালিক ছিলেন মৃত জীবন আলী। তার তিন ছেলে—আন্নর আলী, মনির উদ্দিন ও ওয়াজ উদ্দিন। ওয়াজ উদ্দিন নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যাওয়ায় সম্পত্তি বাকি দুই ভাইয়ের মধ্যে ভাগ হয়। পরবর্তী সময়ে তাদের বংশধর মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ২০টি পরিবার জমির ওয়ারিশ।তবে অভিযোগ রয়েছে, জমি অধিগ্রহণের প্রায় দুই কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ উত্তোলন করেছেন শুধু মনির উদ্দিনের ছেলে মোহাম্মদ কালুর ওয়ারিশরা। নুরুল হক, ইব্রাহিম খলিল, রাশেদা বেগম ও আনোয়ারা বেগমের নামে চারটি পৃথক চেকে এই টাকা তোলা হয়।

অভিযোগ উঠেছে, আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও জাল আম-মোক্তারনামা তৈরি করে এলএ শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালালচক্রের সহায়তায় এই টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।

প্রতারণার অভিযোগ

ক্ষতিপূরণের টাকা পাওয়ার তালিকায় নাম থাকলেও নুরুল হক নিজেই জালিয়াতির অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, দালালচক্র আশ্বাস দিয়েছিল জীবন আলীর সব ওয়ারিশই ক্ষতিপূরণের টাকা পাবেন। কিন্তু বাস্তবে কেবল মনির উদ্দিনের বংশধররাই টাকা পেয়েছেন।

তিনি আরো অভিযোগ করেন, চেক ইস্যুর আগেই দালাল শাহজাহানসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রায় এক কোটি ১০ লাখ টাকা ‘অগ্রিম’ হিসেবে চলে যায়। ফলে দুই কোটি টাকার মধ্যে মোহাম্মদ কালুর ওয়ারিশদের হাতে এসেছে মাত্র ৯০ লাখ টাকা।

দুদকের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন

মামলার আম-মোক্তার বাদী ফতেখাঁরকুলের ওসমান গণির (জাহানারা বেগমের স্বামী) অভিযোগ, আদালত এবং দুদকের দপ্তরে সাক্ষী ও ভুক্তভোগীদের একাধিকবার লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। সে সময়ে পেনড্রাইভ ও মেমোরি কার্ডের মাধ্যমে দুদক কর্মকর্তা তাফছির বিল্লাহকে জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা উত্তোলন ও ঘুষ-বাণিজ্যে জড়িত থাকা কর্মকর্তাদের অডিও রেকর্ড দেওয়ার পর এখন পর্যন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি দুদক। একে একে কয়েকজন তদন্ত কর্মকর্তা বদলি হয়েছে, কিন্তু ৬ বছর পরও কোনো প্রতিবেদন আদালতে জমা দেননি দুদকের তদন্ত কর্মকর্তারা।

এদিকে দুদকে এই মামলার প্রতিবেদন নিয়ে কালক্ষেপণ করায় মামলার বাদী আদালতে লিখিতভাবে জানালে গত ২৫ জানুয়ারির মধ্যে বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা অনিক বড়ুয়াকে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেন সিনিয়র স্পেশাল জজ এবং জেলা ও দায়রা জজ আবদুর রহিম। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও প্রতিবেদন জমা হয়নি। ওসমান গণির অভিযোগ, সরকারি কর্মকর্তাদের রক্ষা করতেই তদন্তে বিলম্ব করা হচ্ছে।

অসহায় ও সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে কোটি টাকা আত্মসাতকারী সরকারি আমলাদের বাঁচাতে দুদকের তদন্ত কর্মকর্তারা মরিয়া হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ করেছেন ওসমান গণি। তার অভিযোগ, সম্প্রতি দুদকের ওই তদন্তকারী কর্মকর্তা ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন পরিষদে লম্বরীপাড়া এলাকার আনর আলীর ওয়ারিশ সনদপত্র ও আবু বক্করের ওয়ারিশদের নাম-সংশ্লিষ্ট রেকর্ড চেয়ে একটি নোটিস পাঠান। ইউনিয়ন পরিষদও তাদের রেকর্ড অনুযায়ী প্রতিবেদন পাঠায় দুদকের কক্সবাজার জেলা সমন্বিত কার্যালয়ে।

তদন্ত কর্মকর্তা অনিক বড়ুয়া ইউনিয়ন পরিষদের সেই প্রতিবেদন গ্রহণ না করে নিজের ক্ষমতাবলে উল্টো পরিষদকে মিথ্যা তথ্য দিতে চাপ প্রয়োগ করেন। ভুক্তভোগীদের মধ্যে আবু বক্করের ওয়ারিশ ‘আবুল কালাম গংদের সনদে ভুল আছে’ বলে পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন, সচিব নিরোধ বরণ পাল ও ৩নং ওয়ার্ডের সদস্য (ইউপি মেম্বার) দিদারুল আলমকে তিনি হুমকি-ধমকি দেন!

বিষয়টি স্বীকার করেছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন। তিনি বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা অনিক বড়ুয়া পরিষদে এসেছিলেন। তদন্ত করেছেন। শুরুর দিকে তিনি ধমকি দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আমরা বলেছি আগের চেয়ারম্যান যেভাবে দিয়েছেন সেভাবেই দিতে হবে। অন্যভাবে দেওয়ার সুযোগ নেই।

যা বলছে দুদক ও বাদীর আইনজীবী

বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা অনিক বড়ুয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তিনি ছুটিতে রয়েছেন। বিষয়টি জানতে হলে অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।

দুদকের আগের তদন্ত কর্মকর্তা তাপছির বিল্লাহর কাছে জানতে চাইলে তিনিও অফিসের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট টুটুল পাল বলেন, ছয় বছর ধরে দুদক মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দিচ্ছে না। আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তদন্তে এমন বিলম্ব অস্বাভাবিক। তিনি বলেন, মামলার আগামী ধার্য তারিখে বুঝা যাবে মামলা কোন দিকে যাচ্ছে। তবে বাদী আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে ঘুরতে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।

দুদকের কক্সবাজার সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি কক্সবাজারেই নেই।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন