লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে মূর্তিমান এক আতঙ্কের নাম ‘জামাই শাহজান’। সরকারি আশ্রায়ণকে ঘিরে চলছে তার বাহিনীর অপরাধ জগতের নানা তৎপরতা। উপজেলার হাজিরহাট ইউনিয়নের চরজাঙ্গালীয়া সোনার বাংলা আশ্রায়ন প্রকল্পের একটি কক্ষকে ব্যবহার করে নিরাপদ আস্তানা তৈরি করছেন তিনি।
আস্তানায় বসে নিরাপদে রাতভর মাদক সেবন, ইয়াবা কারবার, জুয়ার আসর, অপহরণসহ নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড করে গড়ে তুলেছেন এক অপরাধ সাম্রাজ্য। তার ভয়ে তটস্থ আশ্রয়নের বাসিন্দারা। তার ভয়ে মুখ খোলার সাহস পাচ্ছে না কেউ।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগের ১৬ বছর ধরে ওই এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে কথিত এই জামাই শাহজান। আসল নাম শাহাজান হলেও ওই এলাকায় জামাই শাহজাহান হিসেবে পরিচিত। কারণ সে যেখানে যায় সুন্দরী নারী দেখলেই অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ওই মেয়েকে বিয়ে করেন। যার কারণে সবাই তাকে জামাই শাহজাহান বলে ডাকেন।
শাহজান আন্ডারওয়ার্ল্ডের লোক হওয়ায় তার সাথে গভীর আড্ডায় মেতে উঠতো উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারাও। আওয়ামী লীগ আমলে কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায়নি। আওয়ামী লীগের পতনের পরও রয়েছে গেছে তার সাম্রাজ্য। তার একাধিক বউ থাকার কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে ‘সোনার বাংলা’ আশ্রয়নে ঠাঁই নেওয়া এক হতদরিদ্র পরিবারেরর কিশোরী কন্যাকে জোরপূর্বক বিয়ে করেন। ওই কিশারীর মা জানিয়েছেন, জামাই শাহজানের অপরাধ সম্পর্কে জেনেও প্রাণ রক্ষা পেতে নিজের কিশোরী মেয়েকে তার কাছে বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।
এদিকে নোয়াখালী সদর উপজলার ঈমান আলী মার্কেট এলাকার বাসিন্দা দুই যুবককে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে আশ্রয়ণের নিকটবর্তী একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে রাতভর নির্যাতন চালিয়ে পরিবারের নিকট মোবাইল ফোনে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। পরে উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক এক ইউপি চেয়ারম্যানের মধ্যস্ততায় পরিবার তাদের ছাড়িয়ে নেয়। বিষয়টি নিয়ে তখন একাধিক সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয়।
উপজলার আনন্দবাজার এলাকার এক অটারিকশা চালককে অপহরণ করে তার আস্তানায় নিয়ে যান জামাই শাহজান। পরে মোবাইলে পরিবারের নিকট ৫০ হাজার টাকা দাবি করলে বিকাশে নগদ ১০ হাজার টাকা পাঠালে মুক্তি মিলে তার। অপহরণের পাশাপাশি আশ্রয়ণের নিরাপদ আস্তানায় সমানতালে চলে তার ইয়াবা কারবার। এমনকি রাতে বিভিন্ন এলাকা হতে নারীদের এনে আড্ডায় মেতে ওঠে তার বাহিনী। একই সাথে সন্ধ্যা হলেই তার বাহিনীর অন্যতম সদস্য কালামের ছেলে ওসমান, মুন্না ও মিজানসহ অন্য সদস্যরাও আশ্রয়ণের আস্তানায় এসে ভীড় জমান। আড্ডা চলে গভীররাত পর্যন্ত। আশ্রয়ণের এক বাসিন্দা তার এমন কর্মকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশকে জানালে ওই ব্যক্তির উপর প্রকাশ্যে হামলা চালান তিনি। এ ধরনের একাধিক ঘটনায় স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেপ্তারের পর ‘পাপের সাম্রাজ্য’ সামনে আসে তার।
স্থানীয়রা বলছেন, শাহজানের অনৈতিক কর্মকান্ডের খবর আমাদের আগে জানা ছিল না। তবে এরই মধ্যে বের হতে শুরু করছে তার নানা অপরাধ কর্মকান্ডের খবর। সোনার বাংলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের কয়েকজন বাসিন্দা ও স্থানীয় সাবেক এক ইউপি সদস্য জানান, ওই আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৪৭টি ঘর গৃহহীন ৪৭ পরিবারকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। প্রথমে সবাই আশ্রয়ণ প্রকল্পে বাস করলেও এখন জামাই শাহজানের অতংকে ৮০ ভাগ ঘরে তালা ঝুলিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। তার কথার বাহিরে সেখানে কেউ কোনো কাজ করার সাহস পায় না। সব সময় তার সাথে অস্ত্র থাকায় কেউ ভয়ে কথাই বলতে পারে না। এমনকী ওই সাবেক ইউপি সদস্য নিজেও জামাই শাহজানের আতংকে দিন পার করছেন বলে জানান।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কমলনগর উপজলার আনন্দবাজার এলাকার শাহ আলমের ছেলে শাহজাহান এক সময় রাজমিস্ত্রীর সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন। ২০০৪ সালে লক্ষ্মীপুরের চদ্রগঞ্জ থানার মান্দারী ইউনিয়নের একটি ইটভাটার শ্রমিক হিসেবে কাজ করার সুবাদ সেখানকার মিয়াপুর চকিদার বাড়ির আব্দুল মোতালেবের মেয়ে বকুল বেগমকে বিয়ে করে সেখানে জামাই শাহজান হিসেবে পরিচিতি পান।
২০০৮ সালের দিকে মান্দারী এলাকার এক আওয়ামী লীগ নেতার হাত ধরে ইটভাটার শ্রমিক থেকে রাজনীতিতে আসেন শাহাজান। কয়েক দিনের মধ্যে ওই রাজনৈতিক নেতার ছত্রছায়ায় হাতে অস্র তুল নিয়ে নানা অপরাধ কর্মকাণ্ড করে এলাকায় হয়ে ওঠে দুর্ধর্ষ ক্যাডার।
জেলার চন্দ্রগঞ্জ থানার আলোচিত দস্যু বাহিনী প্রধান জিসানের সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন শাহজাহান।
এলাকাবাসী জানায়, জেলার আলোচিত বশিকপুরের একাধিক হত্যাকাণ্ডের সাথেও সম্পৃক্ততা ছিল তার।
সূত্র জানায়, চন্দ্রগঞ্জ, বশিকপুর, মান্দারী ছাড়াও ঢাকা-চট্টগ্রাম কুমিল্লা-নোয়াখালী-ফেনী ও লক্ষ্মীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের অপরাধ জগতের নানা বাহিনীর সাথে সখ্যতার ফলে এক সময় আন্তঃজেলা ডাকাত দলের প্রধান বনে যান শাহজান।
সূত্র বলছে, লক্ষ্মীপুরের আলোচিত জিসান মারা যাওয়ার পর শাহজান দীর্ঘ সময় গা-ঢাকা দিয়ে চট্টগ্রাম অবস্থান করলেও ২০১৫ সালের শেষের দিকে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার তেয়ারীগঞ্জ এলাকার একটি বাড়িতে ডাকাতি করতে গিয়ে অস্ত্রসহ আটক হন। পরে জনগণ গণধোলাই দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয় তাকে। দীর্ঘদিন জেল খেটে জামিনে বের হয়ে ফের অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়েন তিনি।
নাম পরিচয় গোপণ রাখার শর্তে মিয়াপুরের দুই ব্যক্তি জানান, আওয়ামী লীগ নেতা ইসমাইলের হাত ধরে রাজনীতিতে আসেন শাহজান। ইসমাইল হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে নিজের স্বার্থে কাজে লাগান তাকে। এমনকি তার মাধ্যমে মাদক ব্যবসাও চালিয়ে নিতেন। ওই নেতার আশ্রয়ে থেখে অস্ত্রবাজি থেকে শুরু করে এহেন অপরাধ নেই যা সে করতো না।
তারা আরও বলে, ইয়াবাসহ পাঁচবার তাকে পুলিশে ধরলেও অজানা কারণে বার বার জেল থেকে ছাড়া পেয়ে যায়।
এদিকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করার দায়ে অস্ত্র, মাদক, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও হত্যাসহ দেশর বিভিন্ন জেলায় জামাই শাহজানের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকলেও লক্ষ্মীপুরের ছয়টি মামলার তথ্য এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত জামাই শাহজান জানান, তিনি আগে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও এখন নেই। আশ্রয়ণের বাসিন্দাদের তিনি কোনা নির্যাতন করছেন না। আশ্রয়ণের এক কিশারী মেয়েকে জোরপূর্বক বিয়ের ব্যাপারে তিনি বলেন, আগের স্ত্রীদের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকায় আমি এ বিয়ে করছি।
কমলনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম জানান, জামাই শাহজান নামের ব্যক্তিটি বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে। বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে বেশ কয়কটি মামলাও আছে। তার বর্তমান অপরাধ সম্পর্কে খাঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। পুলিশ তাকে খোঁজার চেষ্টা করছে।
উপজলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুচিত্র রঞ্জন দাস জানান, আশ্রয়ণ প্রকল্প কেন্দ্রিক জামাই শাহজান নামে এক ব্যক্তির বিভিন্ন অপরাধের কথা উপজলার মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় উত্থাপিত হয়েছে। বিষয়টি আমলে নিয়ে প্রশাসন কাজ করছে।
এমএস
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

