চারদিকে শুধু পানি, যোগাযোগে পিছিয়ে দেউলবাড়ী দোবড়া ইউনিয়ন

নাজিরপুর (পিরোজপুর) প্রতিনিধি

চারদিকে শুধু পানি, যোগাযোগে পিছিয়ে দেউলবাড়ী দোবড়া ইউনিয়ন

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও যেন সময় থমকে আছে পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার ৩ নম্বর দেউলবাড়ী দোবড়া ইউনিয়নে। বাংলাদেশের মানচিত্রে এটি এক বিচ্ছিন্ন জলবন্দী জনপদ, যেখানে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা এখনো স্বপ্নের মতো দূরবর্তী। চারদিকে শুধু বিল, খাল আর জলাভূমি। বর্ষা এলেই বিস্তীর্ণ এলাকা পরিণত হয় অথৈ জলরাশির দ্বীপে। এখানে মানুষের জীবন চলে নৌকার ওপর ভর করে। ঘর থেকে বেরিয়ে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বাজার কিংবা হাসপাতালে যেতে হলেও ধরতে হয় বৈঠা।

শুধু দেউলবাড়ী দোবড়া নয়, মালিখালী ও কলারদোয়া ইউনিয়নের কিছু অংশের নিম্নাঞ্চলের হাজারো মানুষও একই দুর্ভোগের শিকার। যুগের পর যুগ তারা অপেক্ষা করছে একটি টেকসই সড়কের জন্য। কিন্তু সেই অপেক্ষার প্রহর যেন আর শেষ হচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

ভোরের আলো ফুটতেই শুরু হয় এখানকার শিশু-কিশোরদের সংগ্রাম। বুকভরা স্বপ্ন আর হাতে বইখাতা নিয়ে তারা নৌকায় চড়ে স্কুলের পথে রওনা হয়। কেউ যায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, কেউ মাদ্রাসায়, কেউবা কলেজে। কিন্তু প্রতিটি যাত্রাই যেন জীবনের সঙ্গে এক কঠিন লড়াই। ঝড়ো হাওয়া, প্রবল বৃষ্টি, ঘন কুয়াশা সবকিছুকে উপেক্ষা করেই এগিয়ে যেতে হয় তাদের।

প্রতিদিন সন্তানকে নৌকায় তুলে দেওয়ার সময় বুক কেঁপে ওঠে মায়ের। বাবার চোখে ভেসে ওঠে অজানা আতঙ্ক। যদি মাঝপথে নৌকা ডুবে যায়? যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে? তবুও শিক্ষা অর্জনের আশায় শিশুরা মৃত্যুঝুঁকি নিয়েই পাড়ি দেয় জলপথ।

কৃষিই এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান জীবিকা। বিলের উর্বর জমিতে ধান, পাট, শাকসবজি ও বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করেন কৃষকেরা। কিন্তু সেই ফসল বাজারে পৌঁছানোই তাদের জন্য আরেক যুদ্ধ। নৌকায় করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাড়ি দিয়ে বাজারে যেতে হয়। এতে যেমন সময় নষ্ট হয়, তেমনি বেড়ে যায় পরিবহন ব্যয়। অনেক সময় বৈরী আবহাওয়ার কারণে কৃষকের ঘামঝরা ফসল ঘরেই নষ্ট হয়ে যায়। ন্যায্যমূল্য না পেয়ে হতাশায় ভেঙে পড়েন তারা। অথচ তাদের শ্রমেই দেশের খাদ্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়।

এই জলবন্দী জনপদের আরেকটি অনন্য পরিচয় হলো ভাসমান বাজার। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা বৈঠাকাটা ভাসমান বাজার আজও বহন করছে প্রায় দুইশ বছরের ঐতিহ্য। নৌকার ওপর বসেই চলে কেনাবেচা, এই বাজার শুধু ব্যবসার কেন্দ্র নয়, এটি এ অঞ্চলের মানুষের অস্তিত্বের প্রতীক।

তবে ঐতিহ্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে নির্মম বাস্তবতা। আধুনিকতার ছোঁয়া আজও পৌঁছায়নি এই জনপদে। একটি টেকসই সড়কের অভাবে শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ এবং রোগীরা প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে অসুস্থ রোগীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। গভীর রাতে কেউ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে পৌঁছানোর একমাত্র উপায় নৌকা। অনেক সময় চিকিৎসা পাওয়ার আগেই নিভে যায় জীবনপ্রদীপ। স্বজনদের বুকফাটা কান্না ছাড়া তখন আর কিছুই করার থাকে না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর জনপ্রতিনিধিদের আশ্বাস মিললেও বাস্তবে কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই দুর্ভোগ বয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের প্রশ্ন স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও কেন এখনো মৌলিক যোগাযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকতে হবে?

স্থানীয়দের দাবি, দেউলবাড়ী দোবড়া ইউনিয়নসহ আশপাশের জলবেষ্টিত এলাকায় দ্রুত টেকসই সড়ক নির্মাণ করা হোক। একটি সড়কই বদলে দিতে পারে হাজারো মানুষের জীবন। নিরাপদে স্কুলে যেতে পারবে শিশুরা, কৃষক পাবেন উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য, সহজ হবে চিকিৎসাসেবা এবং সৃষ্টি হবে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।

বিলের বুক চিরে প্রতিদিন জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে এই জনপদের মানুষ। রাষ্ট্রের উন্নয়নের মহাসড়ক যখন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলছে, তখন নাজিরপুরের এই জলবন্দী মানুষগুলো এখনো বৈঠা হাতে অপেক্ষা করছে উন্নয়নের ছোঁয়ার জন্য। তাদের একটাই আকুতি আমরাও মানুষ, আমরাও বাঁচতে চাই নিরাপদ যোগাযোগের অধিকার নিয়ে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন