অর্ধশত কিশোর গ্যাংয়ের ‘রাজত্ব’ বরিশালে

নিকুঞ্জ বালা পলাশ, বরিশাল

অর্ধশত কিশোর গ্যাংয়ের ‘রাজত্ব’ বরিশালে
প্রতীকী ছবি

বরিশাল নগরী ও উপকণ্ঠসহ জেলাজুড়ে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা দিনদিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। মোটরসাইকেলে ১০ থেকে ১৫ জনের বহর, কারো হাতে দেশীয় অস্ত্র, কারো মুখে হুংকার—এভাবেই প্রকাশ্যে মহড়া দিচ্ছে কিশোর-তরুণদের বিভিন্ন গ্রুপ। নগরীর পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে উপজেলায় ছড়িয়ে পড়া এসব গ্যাংয়ের তৎপরতায় আতঙ্ক বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। বিশেষ করে নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডেই চোখে পড়ে এদের সরব উপস্থিতি।

অভিযোগ রয়েছে, এসব গ্রুপের একটি অংশ মাদক, ছিনতাই, চুরি, ইভটিজিং, মারামারি, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রবাজির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, অপরাধের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মহড়া ও নানা কর্মকাণ্ডের ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে নিজেদের আধিপত্য জানান দিচ্ছে তারা।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি নগরীর পলাশপুর এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় বাবু সিকদার নামের এক মাছ ব্যবসায়ী নিহত হওয়ার পর নড়েচড়ে বসে মেট্রোপলিটন পুলিশ প্রশাসন। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্যাং লিডার টোকাই মধু, শহীদ ওরফে কালা শহীদ ও মন্টু সায়েমকে আটক করেছে কাউনিয়া থানা পুলিশ। তবে এতে তাদের তৎপরতা বন্ধ হয়নি। নগরীসহ জেলার প্রায় প্রতিটি উপজেলায় এদের সরব উপস্থিতি সাধারণ মানুষের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।

এসব গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িতদের পাকড়াও করতে ইতোমধ্যে বরিশাল মহানগর পুলিশ বিশেষ অভিযান শুরু করেছে। গত শনিবার দুপুরে স্টেলিন গ্রুপের প্রধান স্টেলিনকে নগরীর বটতলা থেকে গ্রেপ্তার করে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। সে একই এলাকার সোহেল মিঞার ছেলে।

মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকার স্থানীয়দের অভিযোগ, নগরীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় এলাকাভিত্তিক অসংখ্য কিশোর ও তরুণ গ্রুপ সক্রিয়। তাদের একটি অংশ মাদক, ছিনতাই, চুরি, ইভটিজিং, মারামারি, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রবাজির মতো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়—এই গ্রুপগুলোর একটি অংশ এখন আর অপরাধ আড়াল করছে না, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রচার করে নিজেদের আধিপত্য জানান দিচ্ছে।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের দাবি, বরিশাল মহানগরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ৫০টির মতো কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। সব মিলিয়ে এ চক্রের সদস্য সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছেছে বলেও অনেকে দাবি করেছেন।

এদিকে কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবহতার সর্বশেষ নজির হিসেবে সামনে এসেছে বরিশাল নগরীর পলাশপুর এলাকার মাছ ব্যবসায়ী বাবু শিকদার হত্যাকাণ্ড। ওই এলাকার বাসিন্দা কালাম শিকদারের ছেলে বাবু কিশোর গ্যাংয়ের হামলার শিকার হয়ে নিহত হন। ঘটনার পর কাউনিয়া থানা পুলিশ হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে টোকাই মধু, শহীদ ওরফে কালা শহীদ এবং মন্টু সিয়ামকে গ্রেপ্তার করে। তবে এ ঘটনায় আলোচিত ‘ডেঞ্জার বয়েজ’ চক্রের নেতা হিসেবে পরিচিত রিদওয়ান এখনো পলাতক রয়েছে। গ্যাং লিডার রিদওয়ান গ্রেপ্তার না হওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জের ধরে কিছুদিন আগে রিদওয়ানের একটি হাত কেটে ফেলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার সঙ্গে নগরীর বেলতলা এলাকার মামুন ওরফে বাবা মামুন জড়িত বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনায় এসেছে।

অন্যদিকে পলাশপুরের ‘ফকির গ্রুপ’ নামে পরিচিত একটি কিশোর চক্রের নেতৃত্বে ফকির রাজু রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে কাউনিয়া থানায় একাধিক মামলা থাকার কথাও জানা গেছে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ভিডিওতে কয়েকজনকে মোটরসাইকেলে করে ধারালো অস্ত্র নিয়ে চলাচল করতে দেখা যায়। পরে নদীর পাড়ে গিয়ে তাদের মধ্যে অস্ত্র হস্তান্তরের দৃশ্যও রয়েছে বলে জানা গেছে।

ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর নগরবাসীর মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—এতটা প্রকাশ্যে অস্ত্রের প্রদর্শন কীভাবে সম্ভব হচ্ছে?

স্থানীয়দের অভিযোগ, বেলস পার্ক ও আশপাশের সড়ক, কালিজিরা নদীর পাড় থেকে চরবাড়িয়া পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় কিশোর ও তরুণদের মোটরসাইকেল শোডাউন ও অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা ঘটছে।

কখনো ১০-১২ জনের দল, কখনো আরো বড় বহর নিয়ে সড়কে ঘুরছে তারা। পথচারী কিংবা স্থানীয়রা প্রতিবাদ করলে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।

বরিশাল নগরীর বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয়ভাবে একাধিক গ্রুপের নাম আলোচনায় রয়েছে। এলাকাগুলো হলো—গরিয়ারপাড়, চৌমাথা, নিউ সার্কুলার রোড, বাংলাবাজার, কালুশাহ সড়ক, বটতলা, পলিটেকনিক রোড, আমিরকুটির, কেডিসি, চাঁদমারী, মতাসার, কাকাশুরা, সাধুর বটতলা, কাউনিয়া হাউজিং, জানুকিসিংহ রোড, বিসিক, বাগানবাড়ি, হাওলাদার সড়ক, কাশিপুর, সাগরদি, রূপাতলী, কালীবাড়ী রোড, বিএম স্কুল, নতুন বাজার ও বিএম কলেজ এলাকায় বিভিন্ন কিশোর গ্রুপের তৎপরতা রয়েছে। স্থানীয়ভাবে রিফাদ-রিয়াদ, সাগর-শাহরুখ, জিহাদ, মুন্না-সামির, হিরা, স্টেলিনসহ বিভিন্ন গ্রুপ রয়েছে। পলাশপুরেও একাধিক গ্রুপের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত এখন পাড়া-মহল্লা ছাড়িয়ে নগরীর বিনোদন কেন্দ্রগুলোতেও পৌঁছেছে। মুক্তিযোদ্ধা পার্ক, ত্রিশ গোডাউন, বেলস পার্ক ও জিলা স্কুল এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে কিশোর-তরুণদের আড্ডা ও দলবদ্ধ অবস্থানের অভিযোগ রয়েছে।

নারীদের উত্ত্যক্ত করা, মোটরসাইকেলে বিকট শব্দ সৃষ্টি, পথচারীদের বিরক্ত করা, চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করলে মারধর করে মোবাইল ফোন কিংবা টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।

শুধু ছিনতাই কিংবা অস্ত্র প্রদর্শন নয়, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক ও জুয়া বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেও গ্রুপগুলোর মধ্যে বিরোধের অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, অনলাইন ও অফলাইন—দুই মাধ্যমেই জুয়ার কারবার পরিচালিত হচ্ছে। জুয়ার টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে মারামারি, গুরুতর আহত এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সদর রোডে প্রকাশ্যে কোপানোর ঘটনায়ও জুয়া-সংক্রান্ত বিরোধের কথা স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গাটি হচ্ছে কিশোর বয়সিদের একটি অংশের এই অপরাধী বলয়ে ঢুকে পড়া। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রথমে বন্ধুত্ব, আড্ডা কিংবা মোটরসাইকেল শোডাউনের মাধ্যমে গ্রুপে যুক্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে কেউ কেউ মাদক, মারামারি, ছিনতাই কিংবা অস্ত্র প্রদর্শনের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।

এসব গ্রুপের পেছনে মাদক কারবারি, অপরাধী চক্র কিংবা প্রভাবশালী কোনো মহলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে কি না, বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা ।

এ বিষয়ে বরিশাল নগর পুলিশের পুলিশ কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ আমার দেশকে বলেন, আমাদের কাছে কিশোর গ্যাংয়ের তালিকা আছে। তালিকায় থাকা নাম ধরে ধরে তাদের গ্রেপ্তার অভিযান চলছে। গত শনিবার বিকালে দেশি অস্ত্রসহ এক কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি বলেন, যারা নতুন নতুন গ্রুপ করার চেষ্টা করছে তাদেরও তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। বরিশালে নতুন করে কোনো গ্যাং তৈরি করতে দেওয়া হবে না।

তিনি বলেন, কেউ যদি রাজনৈতিক দলের পরিচয় দিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করে তাকেও বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। কিশোর গ্যাংয়ের ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় কাজে আসবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন