আ.লীগ নেতা মিজানের ২৫ প্লট এখনো বহাল

আ.লীগ নেতা মিজানের ২৫ প্লট এখনো বহাল

ঝালকাঠি বিসিক শিল্পনগরীতে বরাদ্দ পাওয়া জমির কিস্তির প্রায় দেড় কোটি টাকা পরিশোধ না করলেও ফরচুন গ্রুপের নামে বরাদ্দ হওয়া ২৫টি প্লট এখনো বাতিল করেনি বিসিক কর্তৃপক্ষ। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, সৈনিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও বরিশাল মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, ফরচুন সুজ কোম্পানির চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর প্রভাব খাটিয়ে সরাসরি মন্ত্রণালয় থেকে এসব প্লটের বরাদ্দ নিয়েছিলেন। শিল্পনগরীতে ফরচুন গ্রুপের বকেয়া থাকা, লেআউট দাখিল না করা এবং বিসিক একাধিকবার এ টাকা পরিশোধের নোটিস দিলেও দেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেই মালিকপক্ষের।

এর আগে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ফরচুন সুজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে লভ্যাংশ বিতরণ না করা এবং তালিকাভুক্তি ফি পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান, পরিচালক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের জরিমানা আরোপ করে। বকেয়া ফি পরিশোধের নির্দেশ দেয়।

বিজ্ঞাপন

বিসিক প্রভাবশালী এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বরাদ্দ বাতিলসহ দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির জবাবদিহি ও ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অথচ পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের শিল্পায়নের যে স্বপ্ন নিয়ে গড়ে উঠেছিল ঝালকাঠি বিসিক শিল্পনগরী; প্রভাবশালীদের দখল, বকেয়া আদায়ে ব্যর্থতা ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তায় সে সম্ভাবনা এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিসিক সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালে ৭৯ প্লটের মধ্যে ফরচুন গ্রুপের নামে ২৫টি বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা মোট প্লটের এক-তৃতীয়াংশ। বরাদ্দ প্লটে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের লেআউট দাখিল ও জমির কিস্তির টাকা বাবদ বকেয়া এক কোটি ৪৪ লাখ টাকা এখনো বকেয়া পড়ে আছে। জানা গেছে, এখানে কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠায় বর্তমানে ফাঁকা পড়ে আছে।

এছাড়া শিল্পনগরীর অপর ৫৪ প্লটের মধ্যে মাত্র ২৮টি প্লটে ১১টি শিল্প ইউনিট উৎপাদন শুরু করেছে। বাকি ২৬টি প্লট বরাদ্দ দেখানো হলেও বর্তমানে ফাঁকা। এর মধ্যে উদ্যোক্তারা নিতে আগ্রহী না হওয়ায় আরো পাঁচটি প্লটের বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে । এ হিসাবে ৭৯ প্লটের মধ্যে ফরচুনের ২৫টি এবং বাকি ২৬টিসহ মোট ৫১টি প্লটই ফাঁকা পড়ে আছে। বাকিগুলোর মধ্যে দুই-তিনটি ছাড়া অধিকাংশ চলছে কোনোমতে।

বিসিক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শিল্পনগরীর মোট জমির পরিমাণ ১১ দশমিক ৮ একর। মোট ৮২টি প্লট হলেও শিল্প প্লট ৭৯টি। এর মধ্যে শিল্প ইউনিটের সংখ্যা ৩৪টি। এতে মাত্র ১৫৪ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। চালু শিল্প ইউনিটগুলোর কাছে বিসিকের বকেয়ার পরিমাণ প্রায় এক কোটি টাকা।

সূত্র জানায়, ফরচুন ইনভেনশন অ্যান্ড টেকনোলজি লিমিটেডের নামে ঝালকাঠি বিসিক শিল্পনগরীতে এক লাখ ১৭ হাজার বর্গফুটের ২৫টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয় । যদিও নিয়মানুযায়ী বিসিক সর্বোচ্চ ১৫ হাজার বর্গফুট প্লট বরাদ্দ দিতে পারে। এজন্য তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা মিজানুর রহমান সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর প্রভাব খাটান। তিনি বিসিকের কাছে আবেদন না করেই সরাসরি শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে উল্লিখিত প্লট বরাদ্দ নেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত প্লটের কিস্তির টাকা পরিশোধ না করলেও বিসিক প্লটের বরাদ্দ বাতিল করেনি।

ঝালকাঠি বিসিক শিল্পনগরীকে জমজমাট করতে না পারার কী কারণ হতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে শিল্পনগরী কর্মকর্তা আল আমিন জানান, আমাদের এলাকা নদীমাতৃক হলেও এ নগরীর সঙ্গে নদীর কোনো সংযোগ নেই। তাই ভারী শিল্প উদ্যোক্তারা আসছেন না। এত ছোট জায়গায় শিল্পনগরী হয় না। পশ্চিম পাশের ইটভাটার জমি অধিগ্রহণ করে সুতালরী ব্রিজ পর্যন্ত এ শিল্পনগরী বর্ধিত করা হলে বড় উদ্যোক্তারা আসতে আগ্রহী হবেন।

তিনি বলেন, পায়রা বন্দর চালু হলে অনেক উদ্যোক্তার এখানে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আশানুরূপ ছোট উদ্যোক্তাদের আনতে পারিনি, এটা ঠিক। ফরচুন কোম্পানির প্লট বরাদ্দ বাতিলের বিষয়ে আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছি।

প্লটের টাকা পরিশোধ না করলেও বিসিকে ফরচুনের প্লট বাতিল করা হচ্ছে না এবং ঝালকাঠিতে বিসিক শিল্পনগরী কেন আলোর মুখ দেখতে পারছে না—এ প্রশ্নের উত্তরে বিসিকের উপব্যবস্থাপক আল আমিন বলেন, আসলে এখানে উদ্যোক্তার অভাব। বেশিরভাগ ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তার উৎপাদনমুখী ব্যবসায় আগ্রহ কম। এছাড়া দক্ষ শ্রমিকের পাশাপাশি শিল্পকারখানা করলে এখানে শ্রমিক আনতে হয় অন্য জেলা থেকে।

ফরচুনের প্লট বরাদ্দ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাদের বকেয়া টাকা আদায়ে অফিসে গিয়ে বা ফোনে—কোনোভাবেই পাচ্ছি না। বকেয়া আদায়ে তাগাদাপত্রের পাশাপাশি ফরচুনকে চূড়ান্ত পত্র দেওয়া হয়েছে। আগামী সভায় তাদের বিষয়ে আলোচনা করে প্লট বরাদ্দ বাতিল করার সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

এ বিষয়ে ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক মোমিন উদ্দিন জানান, বিসিক এখানে ঝালকাঠির উদ্যোক্তাদের তেমন একটা আগ্রহী করে নিয়ে আসতে পারেনি। তাই এখানে সরকার ক্ষুদ্র থেকে মাঝারি শিল্প গড়তে প্লট বরাদ্দের পাশাপাশি সুযোগ দিলেও উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্লট নিতে আগ্রহী হতে দেখা যাচ্ছে না। এছাড়া একজন উদ্যোক্তা ফরচুন মালিকপক্ষ একাই ২৫টি প্লট নিলেও কিছু না করায় প্লটগুলো ফাঁকা পড়ে আছে।

তিনি জানান, প্লটের কিস্তির টাকা বকেয়া পড়ে থাকায় পরিশোধে চূড়ান্ত নোটিস দেওয়া হয়েছে। সামনের সভায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য ফরচুন গ্রুপের কারো মোবাইল নম্বর পাওয়া যায়নি। বিসিকের ঝালকাঠি শিল্পনগরী কর্মকর্তা আল আমিন গতকাল বৃহস্পতিবার আমার দেশকে বলেন, কোনো নম্বর না থাকায় আমরা তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করতে পারি না। বরিশাল বিসিকে তাদের প্লট যে আছে, ওই ঠিকানায় চিঠি দিই। ফরচুনের মালিক মিজান কখনো ঝালকাঠি বিসিকে আসেননি। তার কোনো ফোন নম্বরও আমাদের দেননি। একজন ম্যানেজার আসতেন, তাকেও এখন পাওয়া যাচ্ছে না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন