মেঘনার পাড়ে এখন এক অন্য রকম ব্যস্ততা। নদীতে যাওয়ার পরিবর্তে তীরে উঠে আসছে মাছ ধরার নৌকাগুলো। গুটিয়ে সাবধানে রেখে দেওয়া হচ্ছে জাল। কেউ নৌকার ছোটখাটো মেরামত সারছেন, কেউ জাল শুকিয়ে নিরাপদে তুলে রাখছেন। কারণ, আর মাত্র দুই দিন পরই টানা ২২ দিনের জন্য নদীতে সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ হয়ে যাবে।
মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে আগামী ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত চাঁদপুরের মেঘনা নদীর প্রায় ৭০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সব ধরনের মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধ থাকবে। সরকারি এই নিষেধাজ্ঞা সামনে রেখে নদীর ওপর নির্ভরশীল জেলে পরিবারগুলো এখন যার যার মতো আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সদর উপজেলার হানারচর এলাকার জেলে মো. বাচ্চু বলেন, নদীতে মাছ ধরা বন্ধ থাকলে আমাদের মূল আয়ই বন্ধ হয়ে যায়। এই সময়ে সংসারের খরচ চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। সরকার যে খাদ্য সহায়তা দেয়, তা কিছুটা উপকার করে ঠিকই, কিন্তু শুধু খাদ্য দিয়ে তো আর ২২ দিন সংসার চালানো সম্ভব হয় না।
একই এলাকার জেলে মো. আলমগীর বলেন, নৌকা ও জাল নিয়ে নদীতে যেতে না পারলেও সংসারের দৈনন্দিন খরচ তো আর থেমে থাকে না। সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা, নৌকা ও জাল মেরামতসহ নানা আনুষঙ্গিক খরচ রয়ে গেছে। এই সময়ে খাদ্যসহায়তার পাশাপাশি যদি কিছু নগদ আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হতো, তাহলে জেলেদের জন্য অনেক বড় উপকার হতো।
জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন চাঁদপুরের ৪১ হাজার নিবন্ধিত জেলে পরিবারকে ২৫ কেজি করে খাদ্যসহায়তা প্রদান করা হবে।
তবে জেলেদের দাবি, এই ২২ দিনে তাদের বিকল্প কোনো উপার্জনের সুযোগ থাকে না। ফলে খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি তাদের জন্য সরাসরি আর্থিক সহায়তার সুব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে নদীতে মাছ ধরার ওপর এই কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এ সময়ে মা ইলিশ নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার জন্য নদীর নির্দিষ্ট এলাকায় ছুটে আসে। তারা যদি নিরাপদে ডিম ছাড়তে পারে, তাহলে পরবর্তী সময়ে ইলিশের উৎপাদন ও প্রাচুর্য অনেকাংশে বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন নদীতে মাছ ধরা বন্ধ রাখতে প্রশাসনের পাশাপাশি মৎস্য বিভাগ, কোস্ট গার্ড, নৌ পুলিশ ও নৌবাহিনী যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করবে। পুরো চাঁদপুর সীমান্তজুড়ে নদীতে কঠোর নজরদারি বাড়ানো হবে এবং নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেউ মাছ ধরলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চাঁদপুর নৌ থানার ওসি মো. আজমগীর হোসাইন জানান, নিষেধাজ্ঞার সময়ে নদীতে মাছ ধরা বন্ধ রাখতে নৌ পুলিশের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নদীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকবে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেউ নদীতে নামলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, ইলিশ প্রজননের জন্য এই ২২ দিন অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় ইলিশকে নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ দিতে পারলে সার্বিকভাবে জাতীয় ইলিশের উৎপাদন বাড়বে। নিষেধাজ্ঞা সফল করতে জেলেসহ সংশ্লিষ্ট সবার সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি আরো জানান, নিবন্ধিত জেলেদের খাদ্যসহায়তা প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি তাদের সচেতন করতে মৎস্য বিভাগের প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে।
জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান জানান, মা ইলিশ রক্ষায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা সফলভাবে কার্যকর করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। মৎস্য বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ সমন্বয়ে নদীতে নিয়মিত অভিযান চালানো হবে এবং পুরো সময় তদারকি বজায় থাকবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

