শিক্ষার্থীদের সাফল্যের মধ্যেই খুঁজে পান নিজের প্রাপ্তি। তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলাই তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের বিপদ-আপদে পাশে দাঁড়ানো, জীবন গঠন ও স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে যেতে জোগান সাহস।
শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের ভালোভাবে পাঠদানই তার ব্রত। বিদ্যালয়ে পাঠদান শেষ হলেও তার শেখানোর উদ্যম থেমে থাকে না। কোনো শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে পড়া আয়ত্ত করতে না পারলে বাইরে ডেকে নিয়ে বিষয়টি বুঝিয়ে দেন। সেই শিক্ষার্থীকে বিষয়টি বোঝাতে সক্ষম হলেই তার চোখেমুখে দেখা যায় খুশির ঝিলিক।
গুণী এই শিক্ষকের নাম মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন। তিনি চাঁদপুরের কচুয়ার ঐতিহ্যবাহী সাচার বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের ইংরেজির সিনিয়র শিক্ষক। শিক্ষায় দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে মাধ্যমিক পর্যায় (সাধারণ) ক্যাটাগরিতে এবার ‘গুণী শিক্ষক’ সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। গত ৫ অক্টোবর রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তার হাতে ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
১৯৯৪ সালে এসএসসিতে এবং ১৯৯৬ সালে এইচএসসিতে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন জসীম উদ্দিন। এরপর ১৯৯৮ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে স্নাতক (বিএসএস) এবং ২০০১ সালে এমএসএস ডিগ্রি অর্জন করেন। তার বাবার নাম আক্কাছ আলী, বাড়ি কচুয়ার সাচার গ্রামে।
পারিবারিক দারিদ্র্যের কারণে ছাত্রজীবনে টিউশনি করে লেখাপড়ার খরচ জুগিয়েছেন। শিক্ষাজীবন শেষ করে যোগ দেন শিক্ষকতা পেশায়। নিজের জীবনের অসহায়ত্ব, অনিশ্চয়তা ও সংগ্রামের অভিজ্ঞতা তাকে শিক্ষার্থীদের সমস্যাকে ভিন্নভাবে দেখতে শিখিয়েছে। কোনো শিক্ষার্থী বিপদে পড়লে তার অসহায়ত্বের সঙ্গে নিজের জীবনের স্মৃতির মিল খুঁজে পান তিনি। তাই শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ানো তার কাছে আলাদা কোনো দায়িত্ব নয়, বরং শিক্ষকতারই স্বাভাবিক অংশ মনে করেন এই গুণী শিক্ষক।
জসীম শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের শুরুতে হাস্যোজ্জ্বলভাবে কয়েক মিনিট পাঠ্যবইয়ের বাইরের বিষয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। সময়ের মূল্য, শৃঙ্খলা, বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব, ধর্মীয় বিষয়, বড়দের শ্রদ্ধা, ছোটদের স্নেহ এবং বিদ্যালয়ের প্রতি দায়বদ্ধতার মতো বিষয়গুলো উঠে আসে সে আলোচনায়। এরপর মূল পাঠে গিয়ে নিজের প্রস্তুতি ও অভিজ্ঞতা দিয়ে বিষয়গুলো সহজ করে বোঝানোর চেষ্টা করেন। ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেন ফিডব্যাকও।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সাবেক প্রধান শিক্ষক বটুকৃষ্ণ বসু বলেন, জসীম উদ্দিন সাচার বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়েই লেখাপড়া করেছেন। এখন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিক্ষকতা করছেন। তিনি শুধু মেধাবীই ছিলেন না, আদব-কায়দা ও শৃঙ্খলাও ছিল তার মধ্যে। তিনি ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের খুব সাবলীলভাবে পাঠদান করেন। কোনো শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে না বুঝতে পারলে, বাইরে ডেকে নিয়ে তাকে বুঝিয়ে দেন।
নবম ও দশম শ্রেণির একাধিক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, জসীম উদ্দিন প্রকৃতই একজন গুণী শিক্ষক। খুব সহজ-সাবলীলভাবে আমাদের সন্তানদের পাঠদান করেন। সেজন্য এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শুধু ভালো ফলাফলই করে না, ইংরেজির ওপর ভালো দখলও রয়েছে তাদের।
বিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র আব্দুল খালেক বলেন, জসীম ভদ্র ও মেধাবী ছাত্র ছিলেন। শিক্ষাজীবনের মেধাকে শিক্ষকতা পেশায় কাজে লাগিয়েছেন। তার গুণী শিক্ষক সম্মাননায় আমরা গর্বিত।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেন মোল্লা বলেন, জসীম উদ্দিন নবম ও দশম শ্রেণিতে ইংরেজি বিষয়ে পাঠদান করেন। তার পাঠদানের পদ্ধতি আধুনিক ও ভিন্নধারার। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের ভাগ ভাগ করে পাঠদান করেন। ‘গুণী শিক্ষক’ সম্মাননা পেয়ে শতাধিক বছরের পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যাপিঠের ভাবমূর্তি দেশ-বিদেশে উজ্জ্বল করেছে।
সম্মাননা পাওয়ার অনুভূতি জানিয়ে জসীম উদ্দিন বলেন, সরকার গুণী শিক্ষক নির্বাচিত করায় অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। একই সঙ্গে শিক্ষক হিসেবে আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য বোধ আরো বেড়ে গেছে। আশা করি, এ সম্মানের মাধ্যমে বাংলাদেশের সব শিক্ষক সম্মানিত হবেন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম আরো সুন্দরভাবে এগিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, ছাত্র-শিক্ষকের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা এবং সরকারের নিরবচ্ছিন্ন সমর্থনে আমরা দেশের বিদ্যালয়গুলোকে আরো এগিয়ে নিতে চাই। এর মাধ্যমে দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক মেধাবী শিক্ষার্থী তৈরি হবে, যারা আগামীর বাংলাদেশ গড়তে ভূমিকা রাখবে।
শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের বিষয়ে তিনি বলেন, মানুষ কর্মের মাঝেই বেঁচে থাকে। পাঠদানের সময় আমার মূল লক্ষ্য থাকে প্রতিটি শিক্ষার্থী যাতে বিষয়টা আয়ত্তে নিতে পারে। সেজন্য ক্লাসে ঢোকার আগেই প্রস্তুতি নিই কোন শিক্ষার্থীকে কীভাবে পাঠদান করব। দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদা সময় দিয়ে বিশেষভাবে নজর দেওয়া হয়। পাঠ্যবইয়ের বাইরেও তাদের জীবন-জীবিকা, বাবা-মা, ভাই-বোন, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা ও ছোটদের প্রতি স্নেহসহ নৈতিক বিষয়েও আলোচনা করা হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

