অস্থিসন্ধির ব্যথাকে অবহেলা নয়

অস্থিসন্ধির ব্যথাকে অবহেলা নয়

গত সোমবার (১২ অক্টোবর) ছিল বিশ্ব আর্থ্রাইটিস দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘চলুন সুস্থ ও সচল জীবনের পথে এগিয়ে যাই’। মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরা, কর্মক্ষমতা ও স্বাধীন জীবনযাপনের জন্য অস্থিসন্ধির সুস্থতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাঁটা, বসা, দাঁড়ানো, সিঁড়ি ভাঙা কিংবা দৈনন্দিন কাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অস্থিসন্ধি ভূমিকা রাখে। কিন্তু বয়স বৃদ্ধি, অতিরিক্ত ওজন, আঘাত, বংশগত প্রবণতা কিংবা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্বাভাবিকতার কারণে অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, ফোলাভাব ও শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

বিজ্ঞাপন

আর্থ্রাইটিস কী

আর্থ্রাইটিস বলতে অস্থিসন্ধিতে প্রদাহ বা ক্ষয়জনিত বিভিন্ন রোগকে বোঝায়। এটি একক কোনো রোগ নয়; বরং বিভিন্ন রোগের একটি সমষ্টিগত নাম। এর কোনো কোনো ধরনে অস্থিসন্ধির তরুণাস্থি ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়। আবার কোনো কোনো ধরনে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত নিজের শরীরের সুস্থ কোষ ও টিস্যুকে আক্রমণ করে প্রদাহ সৃষ্টি করে। অস্টিওআর্থ্রাইটিস ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বহুল পরিচিত দুটি ধরন। তবে গাউট, সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস ও শিশুদের আর্থ্রাইটিসও গুরুত্বপূর্ণ। রোগের ধরন অনুযায়ী লক্ষণ, জটিলতা ও চিকিৎসাপদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে।

কারণ ও ঝুঁকির উপাদান

আর্থ্রাইটিসের ধরনভেদে কারণ আলাদা। অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে বয়স বৃদ্ধি, অতিরিক্ত ওজন, অস্থিসন্ধিতে পুরোনো আঘাত, দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত চাপ এবং বংশগত প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হাঁটু, কোমর, হাতের আঙুল ও মেরুদণ্ডের অস্থিসন্ধিতে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়।

রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস একটি প্রদাহজনিত স্বয়ংক্রিয় রোগ। এতে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা অস্থিসন্ধির আবরণে আক্রমণ করে। এর সুনির্দিষ্ট কারণ পুরোপুরি জানা না গেলেও জিনগত প্রবণতা, ধূমপান ও কিছু পরিবেশগত উপাদান এ রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।

গাউটের ক্ষেত্রে রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে অস্থিসন্ধিতে স্ফটিক জমতে পারে। অন্যদিকে, সোরিয়াসিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কারো কারো সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস হতে পারে। কিছু সংক্রমণও অস্থিসন্ধিতে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। তাই সব ধরনের বাতের কারণ এক নয় এবং সব রোগীর চিকিৎসাও একই রকম নয়।

কখন সতর্ক হবেন

আর্থ্রাইটিসের সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—

* অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, ফোলাভাব ও স্পর্শে ব্যথা অনুভব করা।

* সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর বা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার পর অস্থিসন্ধি শক্ত হয়ে থাকা।

* হাঁটাচলা, সিঁড়ি ওঠা কিংবা হাত দিয়ে কাজ করার সময় অসুবিধা হওয়া।

* অস্থিসন্ধির স্বাভাবিক নড়াচড়া কমে যাওয়া।

* আক্রান্ত স্থানে উষ্ণতা অনুভব করা।

* দীর্ঘদিনের রোগে অস্থিসন্ধির আকৃতি বদলে যাওয়া। অস্টিওআর্থ্রাইটিসে সাধারণত কাজকর্মের সঙ্গে ব্যথা বাড়ে এবং বিশ্রামে কিছুটা কমতে পারে। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে একাধিক অস্থিসন্ধিতে ব্যথা ও ফোলাভাব দেখা দিতে পারে। সকালে অস্থিসন্ধি শক্ত হয়ে থাকার সমস্যাও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তবে শুধু লক্ষণ দেখে নিশ্চিতভাবে রোগ নির্ণয় করা যায় না।

হঠাৎ কোনো অস্থিসন্ধি লাল, গরম ও প্রচণ্ড ফুলে গেলে, বিশেষ করে এর সঙ্গে জ্বর থাকলে, দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। এটি অস্থিসন্ধির সংক্রমণসহ জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, এমন কোনো সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।

জটিলতা

আর্থ্রাইটিসের ধরন অনুযায়ী জটিলতা ভিন্ন হতে পারে। দীর্ঘদিন চিকিৎসা না পেলে অস্থিসন্ধির ক্ষয়, স্থায়ী বিকৃতি, চলাচলের সীমাবদ্ধতা এবং দৈনন্দিন কাজে অন্যের সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা ঘুমের ব্যাঘাত, মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্ণতার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।

রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো কিছু প্রদাহজনিত রোগে অস্থিসন্ধির বাইরেও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ আক্রান্ত হতে পারে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিনের অচলতা পেশির শক্তি কমিয়ে দিতে পারে এবং শারীরিক সক্ষমতা হ্রাস করতে পারে। তাই ব্যথা সহ্য করে দীর্ঘদিন অপেক্ষা না করে রোগের কারণ নির্ণয় করা জরুরি।

রোগ নির্ণয় কীভাবে হয়

আর্থ্রাইটিস নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক রোগীর বয়স, উপসর্গ, ব্যথার স্থায়িত্ব, আক্রান্ত অস্থিসন্ধির সংখ্যা এবং পারিবারিক ইতিহাস জানতে চান। শারীরিক পরীক্ষায় অস্থিসন্ধির ফোলাভাব, উষ্ণতা, নড়াচড়া ও বিকৃতির লক্ষণ দেখা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম বা অন্যান্য চিত্রায়ণ পরীক্ষা করা হতে পারে। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে প্রদাহের মাত্রা, ইউরিক অ্যাসিড কিংবা নির্দিষ্ট রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু উপাদান যাচাই করা যায়। তবে কোনো একটি রক্ত পরীক্ষার ফল দিয়েই সব ধরনের আর্থ্রাইটিস নিশ্চিত করা যায় না। কিছু ক্ষেত্রে অস্থিসন্ধির তরল সংগ্রহ করে পরীক্ষা করতে হয়, বিশেষত সংক্রমণ বা গাউটের সন্দেহ থাকলে।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...