নানা সংকটে বান্দরবানের পর্যটন শিল্প, বাড়ছে ভোগান্তি

নানা সংকটে বান্দরবানের পর্যটন শিল্প, বাড়ছে ভোগান্তি
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলীভূমি বান্দরবানের পর্যটন কেন্দ্র

আজ ২৭ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব পর্যটন দিবস। দিবসটি ঘিরে বান্দরবানে নেওয়া হয়েছে নানা প্রস্তুতি । পর্যটন বিকাশের স্লোগান সামনে এলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বান্দরবানের পর্যটনশিল্পে রয়েছে নানা সংকট। এতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন পর্যটকরা ।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, বান্দরবানের নীলাচল, মেঘলা, শৈলপ্রপাত, প্রান্তিক লেক, নীলগিরি, চিম্বুক, কেওক্রাডং, বগা লেক, রিঝুক ঝরনা, উপবন, আলীর সুড়ঙ্গ কিংবা দেবতাখুমসহ আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা রূপ লাবণ্য দেখতে প্রতিবছর ছুটে আসেন লাখো পর্যটক। তবে দিনের আলো নিভে অন্ধকার নামলেই এই পর্যটন শহরে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। সান্ধ্যকালীন বিনোদনের সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা না থাকায় পর্যটকরা কার্যত হোটেল কক্ষের চার দেয়ালে বন্দি থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।

বান্দরবানের দূরবর্তী স্পটগুলো শহর থেকে বেশ দূরে অবস্থিত। যারা দীর্ঘমেয়াদি ট্যুরে নীলগিরি, বগা লেক, রেমাক্রি, তিন্দু বা কেওক্রাডংয়ের মতো গহিন পাহাড়ে রাতযাপন করেন, তারা নির্জন প্রকৃতি আর তারার মেলা উপভোগ করার সুযোগ পান। তবে বিপত্তি ঘটে একদিন বা স্বল্প সময়ের সফরে আসা পর্যটকদের ক্ষেত্রে। এসব পর্যটক সাধারণত শহরের আশপাশের মেঘলা, নীলাচল বা শৈলপ্রপাত ঘুরে বিকাল শেষ করেন। কিন্তু সূর্যাস্তের পর শহরে তাদের সময় কাটানোর মতো পরিকল্পিত কোনো স্পট বা বিনোদন কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। পরিবার-পরিজন বা শিশুদের নিয়ে আসা ভ্রমণপিপাসুরা শহরের অলিগলিতে হেঁটে অথবা রেস্তোরাঁ ও হোটেলের চার দেয়ালের মধ্যে অলস সময় কাটিয়ে রাত পার করেন। এতে পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন পর্যটকরা।

উন্নত পর্যটন শহরগুলোর মতো সুযোগ-সুবিধা গড়ে না ওঠার পেছনে সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা। বান্দরবান হোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন বলেন, বান্দরবানে পর্যটক এবং স্থানীয় নাগরিকদের চিত্তবিনোদন ও শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য বর্তমানে কোনো অ্যামিউজমেন্ট পার্ক বা মানসম্মত ওয়াকওয়ে নেই। পৌরসভা পরিচালিত যে পার্কটি আছে, তাও খুব ছোট পরিসরে। পর্যটন খাতকে এগিয়ে নিতে জেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ ও পেরৗসভার যৌথ উদ্যোগে এখানে একটি আধুনিক পার্ক ও ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু প্রশাসন ও জেলা পরিষদের মধ্যকার সমন্বয়হীনতা ও টানাপোড়েনের কারণে মৌলিক উন্নয়নমূলক কাজগুলো আটকে আছে। দায়িত্ব কারÑএই দ্বন্দ্বের নিরসন না হলে পর্যটক এবং স্থানীয়দের কাঙ্ক্ষিত নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, উন্নত দেশের পর্যটন এলাকাগুলোয় দিনের ভ্রমণের পাশাপাশি সন্ধ্যার পর স্থানীয় লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে নানারকম বিনোদনের আয়োজন থাকে। বান্দরবানেও রয়েছে ১১টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, নৃত্য-গীত ও খাদ্যাভ্যাস। সান্ধ্যকালীন এই সংস্কৃতিকে কাজে লাগিয়ে উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক মঞ্চ, পাহাড়ি ঐতিহ্যবাহী খাবারের মেলা এবং হস্তশিল্পের বাজার গড়ে তোলা সম্ভব। এটি করা গেলে পর্যটকদের একঘেয়েমি কাটার পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি চাঙা হবে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর জোর দিয়ে মানবাধিকারকর্মী, ক্রীড়া সংগঠক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব অংচ মং মারমা বলেন, স্থানীয় প্রশাসনসহ আমাদের রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যদের চিন্তা ও মননে এ বিষয়গুলো আসা দরকার। ভবিষ্যতে বান্দরবান শহরকে ঘিরে যদি একটি মহাপরিকল্পনা বা মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করা হয় এবং তারা যদি এ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন, তবে বান্দরবান শহরের জন্য একটি অত্যন্ত সুন্দর পরিবেশ গড়ে উঠবে।

পৌর কর্তৃপক্ষের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি স্বীকার করে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও বান্দরবান পৌর প্রশাসক এসএম মনজুরুল হক বলেন, এ ধরনের বড় মাপের সুবিধা নিশ্চিত করা একা বান্দরবান পেরৗসভার পক্ষে সম্ভব নয়। এটি বৃহৎ পরিসরের একটি বিষয়। এখানে আমাদের পার্বত্যমন্ত্রী কিংবা পার্বত্য জেলা পরিষদ যদি যেথৗভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করে, তবে এ বিষয়ে আমরা কার্যকরভাবে এগিয়ে যেতে পারব।

বিশ্ব পর্যটন দিবসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে বান্দরবানের পর্যটন অর্থনীতিকে আরো সমৃদ্ধ করতে সান্ধ্যকালীন বিনোদন কেন্দ্র, আধুনিক পার্ক ও সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের যৌথ উদ্যোগ ও দ্রুত সমন্বয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটনপ্রেমীরা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন