ক্যাডেট কলেজে সাফল্যের ঝড়, সরকারি স্কুলে ফল বিপর্যয়

ক্যাডেট কলেজে সাফল্যের ঝড়, সরকারি স্কুলে ফল বিপর্যয়
সীতাকুণ্ড সরকারি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়। ছবি: আমার দেশ

একই উপজেলা, একই শিক্ষা বোর্ড ও একই এসএসসি পরীক্ষা। অথচ ফলাফলে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের ৪৭ পরীক্ষার্থীর সবাই পাস করেছে। এর মধ্যে ৪১ জন পেয়েছে জিপিএ-৫। বিপরীতে সীতাকুণ্ড সরকারি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৫১ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ফেল করেছে ৭৫ জন। পাস করেছে ৭৬ জন। পাসের হার মাত্র ৫০ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ঐতিহ্যবাহী এ সরকারি বিদ্যালয়ের এমন ফল বিপর্যয়ে শিক্ষক সংকট, লটারিভিত্তিক ভর্তি, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও একাডেমিক তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

উপজেলার অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ফলও সরকারি বিদ্যালয়ের সঙ্গে বড় ব্যবধান দেখিয়েছে। বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬৪ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬১ জন পাস করেছে, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৭ জন। ফৌজদারহাট কলেজিয়েট উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৬৬ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৩৭ জন পাস করেছে এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৩ জন। ফলে সরকারি বিদ্যালয়ের ১৫১ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭৫ জনের ফেল করার বিষয়টি অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিজ্ঞাপন

ফল বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে লটারিভিত্তিক ভর্তি ও শিক্ষক সংকটকে দায়ী করেছেন সীতাকুণ্ড সরকারি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সলিমুল্লাহ। তিনি আমার দেশকে বলেন, একটি সরকারি স্কুলের এমন ফলাফলে আমরাও হতাশ। লটারির মাধ্যমে বিভিন্ন মানের শিক্ষার্থী এখানে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে আসে না। অভিভাবক সমাবেশ করেও আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি। এর সঙ্গে শিক্ষক সংকটও রয়েছে। লটারিভিত্তিক ভর্তি ও পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকাই এবারের ফল বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ।

তবে অভিভাবকদের প্রশ্ন, লটারির মাধ্যমে বিভিন্ন মানের শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়া স্বাভাবিক হলেও দুর্বল শিক্ষার্থীদের আগেই চিহ্নিত করে বিশেষ ক্লাস, অতিরিক্ত অনুশীলন ও বিষয়ভিত্তিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিল কি না। তাদের মতে, শুধু লটারিভিত্তিক ভর্তি ও শিক্ষক সংকট দিয়ে ফল বিপর্যয়ের পূর্ণ ব্যাখ্যা হয় না, সারা বছরের পাঠদান, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি এবং একাডেমিক তদারকিও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

বিদ্যালয়ের এক পরীক্ষার্থীর অভিভাবক ও সাদেক মাস্তান উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. সোহেল আমার দেশকে বলেন, মনে হচ্ছে বিদ্যালয়টি অভিভাবকহীন। যার যার খুশিমতো চলছে। ছাত্ররা লেখাপড়া করছে কি না, ক্লাস হচ্ছে কি না, এসব দেখার যেন কেউ নেই। এখানে জবাবদিহিও নেই। এভাবে চলতে থাকলে এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়টি ধ্বংসের দিকে চলে যাবে।

ফল বিপর্যয়কে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম। তিনি আমার দেশকে বলেন, একটি ঐতিহ্যবাহী ও পূর্ণাঙ্গ সরকারি স্কুলের এমন ফল কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষার মান নিশ্চিত করা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিভাবকদের দাবি, তদন্তে শুধু এসএসসি ফল নয়, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষে প্রকৃত পাঠদান, শিক্ষক সংকট, অভ্যন্তরীণ ও নির্বাচনি পরীক্ষার ফলাফল, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য নেওয়া উদ্যোগ এবং বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাও খতিয়ে দেখা হোক।

একদিকে ক্যাডেট কলেজে ৪৭ পরীক্ষার্থীর সবাই পাস করে ৪১ জন জিপিএ-৫, অন্যদিকে সরকারি বিদ্যালয়ে ১৫১ জনের মধ্যে ৭৫ জন ফেল, একই উপজেলার দুই প্রতিষ্ঠানের এমন ফলের ব্যবধান এখন বড় প্রশ্ন। শিক্ষক সংকট ও লটারিভিত্তিক ভর্তি কতটা দায়ী, আর একাডেমিক তদারকি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় কোনো ঘাটতি ছিল কিনা, তা নিরপেক্ষ তদন্তে বেরিয়ে আসার অপেক্ষায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন