তিন যুগেও মেলেনি স্থায়ী বাঁধ, মেঘনায় বিলীন পানিশ্বর

শামসুল আরেফিন, সরাইল (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)

শামসুল আরেফিন, সরাইল (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)

তিন যুগেও মেলেনি স্থায়ী বাঁধ, মেঘনায় বিলীন পানিশ্বর

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার পানিশ্বর ইউনিয়নে বর্ষা এলেই ফিরে আসে মেঘনা নদী ভাঙনের আতঙ্ক। তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে ভাঙনে একের পর এক বসতভিটা, চাতালকল, মসজিদ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ফসলি জমি বিলীন হলেও নির্মিত হয়নি নদীর তীর রক্ষা বাঁধ। ফলে প্রতি বর্ষায় নতুন করে সর্বস্ব হারাচ্ছেন শত শত মানুষ।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিনে দেখা যায়, পালপাড়া, সাখাইতি, দেওবাড়িয়া ও লায়ারহাটি এলাকায় প্রায় তিন কিলোমিটারজুড়ে নদীভাঙন চলছে। প্রতিদিনই নদীতে বিলীন হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। প্রায় ২০টি চাতালকল এবং শতাধিক বসতঘর নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে।

স্থানীয় কাউছার মিয়া, আবদুল কুদ্দুস মেম্বার, ওসমান মিয়া, সুমন মুন্সী মেম্বার ও মোবারক মেম্বার জানান, ছোটবেলা থেকেই তারা একই দৃশ্য দেখে আসছেন। প্রতি বর্ষায় নদী কিছু না কিছু কেড়ে নেয়। তাদের ভাষায়, স্থায়ী নদীতীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ না হলে অচিরেই অবশিষ্ট গ্রামও নদীগর্ভে বিলীন হবে।

পানিশ্বর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. তৌহিদ মিয়া বলেন, পালপাড়া, সাখাইতি, শোলাবাড়ি ও দেওবাড়িয়া গ্রামের কয়েকশ পরিবার সরাসরি নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। একসময় এ এলাকায় অর্ধশতাধিক চাতালকল ছিল। ইতোমধ্যে প্রায় ২০টি চাতালকল ও শতাধিক ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। ইউনিয়নবাসীর দীর্ঘদিনের একমাত্র দাবি—স্থায়ী নদীতীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ।

বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ মোহাম্মদ শামীম আমার দেশকে বলেন, পানিশ্বরের নদীভাঙন এখন মানুষের প্রতিদিনের কান্নায় পরিণত হয়েছে। বাজারের দুই পাশে স্কুল-কলেজ, অসংখ্য বাড়িঘর ও চাতালকল হুমকির মুখে। তার দাবি, ৫০টিরও বেশি চাতালকল ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে এবং কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়েছে। তিনি জনপ্রশাসন সচিবের মাধ্যমে জেলা প্রশাসকের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেছেন বলেও জানান।

তিনি আরো অভিযোগ করেন, প্রতি রাতে ভৈরব থেকে ২০-২৫টি ড্রেজার এসে, কখনো দিনের বেলাতেও, নদী থেকে বালু উত্তোলন করছে। তার ভাষ্য, অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণেই পানিশ্বর এলাকায় কয়েক কিলোমিটারজুড়ে ভয়াবহ ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত বালু উত্তোলন বন্ধ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে পানিশ্বর বাজারও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শেখ মোহাম্মদ শামীম বলেন, তিন যুগ আগে পানিশ্বর ছিল সরাইলের অন্যতম সমৃদ্ধ শিল্পাঞ্চল। শতাধিক চাতালকল ও অটো রাইস মিলকে কেন্দ্র করে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছিল। কিন্তু অব্যাহত নদীভাঙনে প্রায় ৮০ শতাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিলীন কিংবা বন্ধ হয়ে গেছে। তাই এখন আর আশ্বাস নয়, স্থায়ী ও টেকসই নদীভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্প বাস্তবায়নই সময়ের দাবি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের সরাইল শাখার উপ-সহকারী প্রকৌশলী মহসিন কবির শিহাব জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প (পার্ট-১)-এর আওতায় পানিশ্বর এলাকায় ১ হাজার ৩৫০ মিটার নদীতীর সংরক্ষণ কাজের প্রস্তাব পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আপাতত জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি স্থানে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, পানিশ্বরের নদীভাঙনের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। উপজেলা পরিষদের সীমিত বরাদ্দ দিয়ে এ ধরনের ভয়াবহ ভাঙন প্রতিরোধ সম্ভব নয়। দ্রুত পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যকর উদ্যোগ এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার কাছে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ আসেনি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেডএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন