ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই অংশ এখন যেন নীরব মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। এই অর্থনৈতিক করিডরে প্রতিদিনই ঘটছে ছোট-বড় সড়ক দুর্ঘটনা। কোনো দিন বাসের সঙ্গে ট্রাকের সংঘর্ষ, কোনো দিন কনটেইনারবাহী কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কা, আবার কোনো দিন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ।
দুর্ঘটনাপ্রবণ এই মহাসড়কের পাশে আজও গড়ে ওঠেনি আধুনিক ট্রমা সেন্টার। এ কারণে দুর্ঘটনায় আহতদের অনেকেই সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছে।
জানা যায়, সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মূল ভবনটি নির্মিত হয়েছিল ১৯৬২ সালে। দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্যবহৃত ভবনটির বিভিন্ন অংশে অবকাঠামোগত দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেই চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। জনবল সংকটের পাশাপাশি অবকাঠামোগত দুর্বলতাও হাসপাতালটির অন্যতম বড় সমস্যা। হাসপাতালটিতে মোট ৩৩ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করছেন ছয়জন চিকিৎসক। দীর্ঘদিন ধরে তিনটি পদ শূন্য রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ১১টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন আটজন। দুজন চিকিৎসক প্রেষণে রয়েছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সার্জারি কনসালট্যান্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য আছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
বর্তমানে হাসপাতাল ৫০ শয্যার হলেও বাস্তবে রোগীর চাপ কয়েক গুণ বেশি। প্রতিদিন জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ ও ভর্তি রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। অতীতে হাসপাতালটিকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা দেওয়া হলেও তা এখনো বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।
দেশের বাণিজ্য, শিল্প ও আমদানি-রপ্তানির প্রধান প্রবেশপথ হিসেবে পরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের এই অংশ দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে। যাত্রীবাহী বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, কনটেইনারবাহী যান, মোটরসাইকেল ও ভারী শিল্পকারখানার পরিবহন একসঙ্গে চলাচল করায়, সড়কটি দিনে দিনে আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বেপরোয়া গতি, অসচেতন চালনা, ওভারটেকিং এবং যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রায়ই ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।
বিশেষজ্ঞ ডাক্তার জোবায়দুল হুদা জুয়েল বলেন, দুর্ঘটনার পর প্রথম এক ঘণ্টাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় গোল্ডেন আওয়ার বলা হয়। এই সময়ের মধ্যে আহত ব্যক্তিকে বিশেষায়িত চিকিৎসা দেওয়া গেলে মৃত্যুহার অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
কিন্তু সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই এলাকায় আধুনিক ট্রমা সেন্টার না থাকায়, গুরুতর আহতদের দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা নগরীর অন্যান্য হাসপাতালে পাঠাতে হয়। দীর্ঘপথ, যানজট ও সময়ক্ষেপণের কারণে অনেক রোগী চিকিৎসার আগেই মারা যাচ্ছে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলতাফ হোসেন বলেন, গত বছরের মে মাস থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র এক বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ১ হাজার ১৭৩ জন রোগী সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর বাইরে আরো বহু গুরুতর রোগী সরাসরি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
স্বাস্থ্যসেবার এই সীমাবদ্ধতা আরো প্রকট হয়েছে জনবল সংকটের কারণে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. সোনিয়া আখতার আমার দেশকে বলেন, হাসপাতালে জেনারেটর না থাকায়, বিদ্যুৎ চলে গেলে অনেক সময় অপারেশন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। জরুরি চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে এটি বড় ধরনের সমস্যা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১০ বছরে বেড়েছে দ্বিগুণ