কাস্টমসের সিপাহী আবু রায়হানের দাফন সম্পন্ন, বাকরুদ্ধ মা

কাস্টমসের সিপাহী আবু রায়হানের দাফন সম্পন্ন, বাকরুদ্ধ মা

ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ায় নিখোঁজের ১০ দিন পর খণ্ডিত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া কাস্টমসের সিপাহী আবু রায়হান তালুকদারের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। সোমবার ময়নাতদন্ত শেষে তার লাশ বাড়িতে আনা হলে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন তার মা রাহেলা খাতুন। স্বজনদের আহাজারি আর শোকে পুরো গ্রামে নেমে আসে শোকের ছায়া। পরে জানাজার নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন করা হয়।

পুলিশের ধারণা কাস্টমসের সিপাহী আবু রায়হান তালুকদারকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে একাধিক ঘাতক ছিল। সোমবার নিজ বাড়ি থেকে তার ব্যবহৃত সাদা রঙের একটি পাঞ্জাবি, বালিশের কভার ও লাল সদৃশ কিছু আলামত হিসেবে জব্দ করেছে পুলিশ। উদ্ধারকৃত আলামত ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন জিডির তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শুভ্র।

বিজ্ঞাপন

ফুলবাড়িয়া উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়নের সোয়াইতপুর গ্রামের মৃত আবু সিদ্দিকের কনিষ্ঠ ছেলে আবু রায়হান তালুকদার। বাংলাদেশ কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট দপ্তরে সিপাহী পদে কর্মরত ছিলেন। নিখোঁজের ১০ দিন পর তার বাড়ির পাশের পুকুর থেকে তিনটি ট্রাভেল ব্যাগ উদ্ধার করে পুলিশ। ব্যাগের ভেতরে অর্ধগলিত টুকরো টুকরো অবস্থায় ছিল তার লাশ। ঘাতকরা আবু রায়হানকে হত্যার পর দুই হাত ও দুই পা ১২ টুকরো, মস্তক এবং বুক ও পেট তিন টুকরো করে। নিখোঁজের পর তার বাড়ির কেয়ারটেকার পাশ্ববর্তী অনন্তপুর গ্রামের রাজু ও তার বন্ধু জিতুল গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কেয়ারটেকার রাজু জড়িত। তাকে গ্রেপ্তার করতে পারলেই লোমহর্ষক হত্যার রহস্য উন্মোচন হবে। সন্ধ্যা ৬টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা হয়নি।

সোমবার দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ময়নাতদন্ত শেষে আবু রায়হানের লাশ নিয়ে আসা হয় নিজ বাড়িতে। এতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন মা রাহেলা খাতুন। স্বজনদের কান্নায় গ্রামে শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজন ও প্রতিবেশীদের দাবি, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। বাদ আসর সোয়াইতপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জানাজার নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, রাজু ও জিতুল দু’জনেই মাদকাসক্ত এবং অনলাইন জুয়ায় আসক্ত। গ্রামে তাদের চলাফেরা ছিল উশৃঙ্খল। তারা কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত। হত্যার ঘটনার সঙ্গে রাজুসহ একাধিক খুনি জড়িত রয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয়দের সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১০ বছর আগে উপজেলার আছিম পাটুলী ইউনিয়নের পাটুলী গ্রামের সুরাইয়া আক্তার সাথীকে বিয়ে করেন আবু রায়হান। এক কন্যাসন্তান থাকা অবস্থায় গত ৫ বছর আগে তাদের সংসার ভেঙে যায়। ৮ বছরের কন্যা রিয়া মায়ের সঙ্গে নানার বাড়িতে বসবাস করে। ঢাকার কমলাপুরে চাকরির সুবাদে আবু রায়হান সেখানে ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। সোয়াইতপুর উত্তরপাড়া গ্রামে আবু রায়হানের আধুনিক ডুপ্লেক্স বাড়ি, জমিজমা, কৃষিবাগান ও তার মায়ের দেখাশোনা করার জন্য রাজু নামের এক কিশোরকে কেয়ারটেকার হিসেবে রাখেন। প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে তিনি বাড়িতে আসতেন। রোববার ভোরে বাড়ি থেকে গিয়ে অফিস করতেন। মোটরসাইকেলে করে পথিমধ্যে থেকে বাড়িতে নিয়ে আসা, আবার বাড়ি থেকে কর্মস্থলে ফেরার সময় কাহাওলগাঁও অথবা ভরাডোবা নামক স্থানে পৌঁছে দিত রাজু।

গত বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) রাতে কমলাপুরে নিজ কর্মস্থল থেকে বাড়িতে আসেন। ওই রাতে নিজ ঘরে অবস্থান করছিলেন আবু রায়হান ও রাজু। উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের অনন্তপুর গ্রামের ফজলু মির্জার ছেলে রাজু। সোয়াইতপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র। তাকে অগাধ বিশ্বাস করতেন রায়হান। লাশ উদ্ধারের পর থেকে রাজুর পরিবারের সদস্যরাও ঘরে তালা দিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। এর আগে পালিয়েছে রাজু ও তার বন্ধু জিতুল। কেয়ারটেকার রাজু গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে প্রথমে কক্সবাজারে অবস্থান নেয়। সেখানে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ঢাকায় ফিরে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে বারবার তার অবস্থান পরিবর্তন করছে। একটি বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে, রাজুর ছোট ভাই রাজাকে আছিম পাটুলী ইউনিয়নের একটি গ্রাম থেকে পুলিশ আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।

ফুলবাড়িয়া থানার ওসি রাশেদুল হাসান জানিয়েছেন, নিজ এলাকার আশপাশে কোথাও আবু রায়হানকে হত্যা করে টুকরো টুকরো করা হয়েছে। কিছু আলামত জব্দ করা হয়েছে। কেয়ারটেকার রাজু খুবই ধূর্ত। সে বারবার তার অবস্থান পরিবর্তন করছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে তাকে গ্রেপ্তার করতে পারব বলে আশা করছি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন