দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম অর্থনীতি, বন্দর ও শিল্প-কারখানার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলেও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের সংকটের মুখে রয়েছে। বিশেষ করে উন্নত ও বিশেষায়িত হাসপাতালের অভাবে চট্টগ্রাম বিভাগের কয়েক কোটি মানুষকে প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত উদ্যোগের অভাব, চিকিৎসক ও আধুনিক সরঞ্জাম সংকট এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতায় উন্নত চিকিৎসাসেবা এ এলাকার মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।
স্বাস্থ্য-সংশ্লিষ্টদের মতে, চট্টগ্রাম বিভাগের ১১ জেলা ও নগর এলাকার জনসংখ্যা সাড়ে তিন কোটির বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি হাজার মানুষের জন্য অন্তত তিন দশমিক পাঁচটি শয্যা থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে চট্টগ্রামে সে তুলনায় হাসপাতাল ও শয্যাসংখ্যা অনেক কম।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগর এলাকায় সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে মাত্র ১৫৩টি, যা এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য অত্যন্ত অপ্রতুল।
চট্টগ্রামের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রধান ভরসা হলো চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল। বর্তমানে অনুমোদিতভাবে দুই হাজার ২০০ শয্যায় উন্নীত হলেও প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই হাজার ৮০০ রোগী এখানে ভর্তি থাকেন। বহির্বিভাগে প্রতিদিন কয়েক হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি রোগীর চাপ সামাল দিতে গিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হয়। অনেক সময় রোগীদের ফ্লোর, বারান্দা, এমনকি সিঁড়িতেও চিকিৎসা নিতে দেখা যায়। অথচ এত বড় হাসপাতালটিতে আইসিইউ শয্যা রয়েছে মাত্র ৫০টি, যা গুরুতর রোগীদের জন্য অত্যন্ত অপ্রতুল। জরুরি ভিত্তিতে চাহিদার তুলনায় এ হাসপাতালে সেবা বিশেষায়িত না হওয়ায় ঢাকায় ছুটতে হয় মুমূর্ষু রোগীদের।
আগুনে পোড়া রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। পোড়া রোগীদের প্রধান ভরসা চমেক হাসপাতালের ৬০ শয্যার বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট। তিন কোটিরও বেশি মানুষের জন্য এই ইউনিটটিই একমাত্র সরকারি ভরসা। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় ইউনিটটির আকার ছোট এবং আধুনিক সরঞ্জাম ও আইসিইউ সুবিধা সীমিত। ফলে বড় ধরনের অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটলে চিকিৎসাব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। তাছাড়া ইউনিটটির নিজস্ব আইসিইউ না থাকায় গুরুতর রোগীদের অন্য বিভাগের ওপর নির্ভর করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠাতে হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রামে কার্ডিওলজি, কিডনি, অর্থোপেডিক, ক্যানসার, মা ও শিশু স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য এবং বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারির মতো বিশেষায়িত হাসপাতাল খুবই প্রয়োজন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই এসব বিষয়ে কার্যকর সরকারি উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ঢাকার বাইরে উন্নত চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণের কথা বারবার বলা হলেও বাস্তবে তা বাস্তবায়নের গতি খুবই ধীর।
সরকারি হাসপাতালগুলোর বড় সমস্যা হলো দক্ষ জনবল ও আধুনিক সরঞ্জামের ঘাটতি। অনেক হাসপাতালে পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স ও ল্যাবরেটরি সুবিধা নেই। ফলে অনেক রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যেতে হয়। আর যাদের সামর্থ্য আছে, তারা বিদেশে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন। স্বাস্থ্য খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রতি বছর চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে।
অন্যদিকে বেসরকারি খাতেও মানসম্মত বিশেষায়িত হাসপাতালের সংখ্যা সীমিত। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কিছু আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ দেখা গেছে, তবু সামগ্রিক চাহিদার তুলনায় তা খুবই কম। অনেক বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বিরুদ্ধে নিম্নমানের সেবা, পর্যাপ্ত সরঞ্জামের অভাব এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার অভিযোগ রয়েছে। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে নেই সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা বা পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধা। অনেক ক্ষেত্রে উন্নত যন্ত্রপাতির অভাব এবং মেয়াদোত্তীর্ণ রি-এজেন্ট ব্যবহারের কারণে ভুল ডায়াগনসিসের অভিযোগও উঠে আসে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্বাস্থ্যসেবায় বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সরকারি তদারকি জোরদার করা জরুরি। বর্তমানে দেশের মোট স্বাস্থ্যসেবার প্রায় ৬৩ শতাংশ বেসরকারি খাত থেকে দেওয়া হলেও চট্টগ্রামে মানসম্মত ও বিশেষায়িত সেবার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ তুলনামূলক কম। অনেক ক্ষেত্রে সেবার চেয়ে মুনাফা অর্জনের প্রবণতা বেশি থাকায় উন্নত চিকিৎসা অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।
ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) চট্টগ্রামের সভাপতি অধ্যাপক ডা. আব্বাস বলেন, স্বাধীনতার এত বছর পরও চট্টগ্রামে পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতাল না থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। চমেক হাসপাতালে রোগীর চাপ কমাতে চার থেকে পাঁচটি বিশেষায়িত হাসপাতাল দ্রুত স্থাপন করা প্রয়োজন।
তিনি আরো বলেন, সবাই বলে চট্টগ্রাম নগরীতে জায়গা কম। সবার নজর সিআরবিতে বিশেষায়িত হাসপাতাল করার। সরকার চাইলে নগরীর বাইরে জায়গা অধিগ্রহণ করে বিশেষায়িত হাসপাতাল করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামে আধুনিক কার্ডিয়াক, ক্যানসার, বার্ন ও ট্রমা, কিডনি এবং মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা গেলে জনগণের চিকিৎসা সুবিধা যেমন বাড়বে, তেমনি বিদেশে চিকিৎসাও কমে আসবে। পাশাপাশি বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে শক্তিশালী অবকাঠামো গড়ে তোলাও সম্ভব হবে।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন জানান, চট্টগ্রামে ইতোমধ্যে কিডনি ফাউন্ডেশন ও হার্ট ফাউন্ডেশনের জন্য সরকার জায়গা বরাদ্দ দিয়েছে। এছাড়া চমেক হাসপাতাল এলাকায় ২৫০ শয্যার আরবান হাসপাতালের নির্মাণকাজ চলমান। চট্টগ্রামের মানুষের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি।
চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, রাজধানী ছাড়া দেশের কোনো বিভাগীয় শহরেই এখনো পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে ওঠেনি। চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ নগরে প্রয়োজনীয়সংখ্যক বিশেষায়িত হাসপাতালের অভাব এখন শুধু স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা নয়; এটি গুরুতর সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। তার মতে, এই সংকট থেকে উত্তরণে সুপরিকল্পিত উদ্যোগ এবং তা দ্রুত বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

