সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর ফেরদৌস শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের প্রাণহানির পর শিপইয়ার্ড মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সভাপতি মো. মহসিন চৌধুরীসহ সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভয়াবহ এ দুর্ঘটনার পর নিহত শ্রমিকদের স্বজন, আহত শ্রমিক ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লাশ উদ্ধারকারী কর্মীদের পাশে সংগঠনের নেতৃত্বকে দৃশ্যমানভাবে দেখা যায়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
কয়েকজন নেতার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে, বাসাবাড়িতে খোঁজ নিয়েও তাদের অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে। তবে তারা সত্যিই আত্মগোপনে রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সভাপতির বক্তব্য জানতে তার ব্যবহৃত একটি বিদেশি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
গত ১৪ আগস্ট ফেরদৌস শিপইয়ার্ডে ভাঙার জন্য আনা একটি পুরোনো জাহাজের ট্যাংকে কাজ করার সময় বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। আরও কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। এরপরই ট্যাংকে প্রবেশের আগে গ্যাস পরীক্ষা, গ্যাস ফ্রি সনদ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ফেরদৌস শিপইয়ার্ডের কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন বলেন, দুর্ঘটনার দিন বিএসবিআরএর সাবেক সভাপতি আমজাদ হোসেন চৌধুরী সারা দিন ঘটনাস্থলে থেকে সহযোগিতা করলেও বর্তমান সভাপতি মহসিন চৌধুরীসহ সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সেখানে দেখা যায়নি। রাতেও তারা আসেননি। দুর্ঘটনার পর ইয়ার্ডের কয়েকজন কর্মকর্তা মারধরের শিকার হন এবং বহিরাগতদের কেউ কেউ মালামাল নিয়ে যায়।
মাদার স্টিল শিপইয়ার্ডের মালিক মাস্টার আবুল কাশেম বলেন, জনরোষের আশঙ্কায় কমিটির সভাপতিসহ কেউ ঘটনাস্থলে আসেনি। এ কারণে তারা হয়তো গা-ঢাকা দিয়েছেন। বিএসবিআরএর সাবেক সহসভাপতি ও জনতা স্টিল শিপইয়ার্ডের মালিক কামাল উদ্দিন বলেন, এত বড় দুর্ঘটনার পরও সভাপতি ও নেতারা কেন এলেন না, তা বিস্ময়কর। আমার মনে হয়, হয়তো ভয়ে তারা আসেননি।
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাতটি লাশ উদ্ধার করা সাইফুল গনি বলেন, আমরা জীবন বাজি রেখে লাশগুলো বের করে এনে অসুস্থ হয়ে পড়েছি। কিন্তু আজ পর্যন্ত বিএসবিআরএর সভাপতি বা কোনো নেতা আমাদের কিংবা নিহতদের স্বজনদের খোঁজ নেননি।
এদিকে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে শিল্প মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও বিএসবিআরএর পৃথক তদন্ত কমিটি কাজ করছে। বিষাক্ত গ্যাসের উৎস ও মাত্রা, গ্যাস পরীক্ষার রেকর্ড, গ্যাস-ফ্রি সনদের বৈধতা, শ্রমিকদের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থার কার্যকারিতা তদন্তে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার আগে ও পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা খতিয়ে দেখারও দাবি জানিয়েছেন শ্রমিকদের স্বজন ও উদ্ধারকর্মীরা।
তাদের দাবি, কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের প্রভাবমুক্ত তদন্তের মাধ্যমে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের চিহ্নিত করতে হবে। নিহতদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ, আহত ও উদ্ধারকর্মীদের সুচিকিৎসা এবং শিপইয়ার্ডে কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ভয়াবহ এ প্রাণহানি দেশের শিপব্রেকিং শিল্পে শ্রমিক নিরাপত্তা ও মালিকপক্ষের দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে যে প্রশ্ন তুলেছে, তদন্তের মাধ্যমে তার জবাব এখনই নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


-e30930.jpg)