পরীক্ষায় দলীয় নেতাকর্মীরা গণহারে ফেল, স্থগিত হলো মৌখিক পরীক্ষা

সোহাগ কুমার বিশ্বাস, চট্টগ্রাম

পরীক্ষায় দলীয় নেতাকর্মীরা গণহারে ফেল, স্থগিত হলো মৌখিক পরীক্ষা

সিঅ্যান্ডএফ (ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং) এজেন্ট লাইসেন্স প্রদানের জন্য মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশ করেও তা স্থগিত করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এর আগে ঢাকঢোল পিটিয়ে চট্টগ্রামের একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লাইসেন্স প্রদানের জন্য প্রথমবারের মতো লিখিত পরীক্ষার আয়োজন করে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট ট্রেনিং একাডেমি (সিইভিটিএ)।

২ হাজার ৫২১ লাইসেন্সপ্রত্যাশী এই পরীক্ষায় অংশ নেন। যাদের অধিকাংশই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীপন্থি ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিতরাও অংশ নেন পরীক্ষায়। কিন্তু ফলাফলে দেখা যায়, রাজনৈতিক পরিচয়ে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীদের এক-দুজন ছাড়া কেউ পাস করতে পারেননি লিখিত পরীক্ষায়। ফলে পরীক্ষার পর থেকেই অদৃশ্য চাপ তৈরি হয় এনবিআরের ওপর।

বিজ্ঞাপন

নিয়মানুযায়ী পরীক্ষার দিনই ফল প্রকাশের কথা থাকলেও সময় লাগে ১৫ দিন। ১ জুন প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, ২১০ জন পাস করেছেন। তবে তার মধ্যে দলীয় নেতাকর্মীরা নেই একেবারেই। এতেই তোলপাড় শুরু হয়। শাসক দলের একাধিক নেতাকর্মী প্রকাশিত ফলাফল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রকাশ্যে। সবশেষ গত ১৭ জুন লিখিত পরীক্ষায় পাস করা লাইসেন্স-প্রত্যাশীদের মৌখিক পরীক্ষার নোটিস ইস্যু করে এনবিআর। ২১ থেকে ২৪ জুন পর্যন্ত চারটি ধাপে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই নোটিস জারির এক দিন পর ১৮ জুন অনিবার্য কারণ দেখিয়ে সেই মৌখিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। পাস করা লাইসেন্সপ্রত্যাশীদের ধারণা, দলীয় নেতাকর্মীদের লাইসেন্স দিতেই নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি স্থগিত করা হয়েছে।

পরীক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আমদানি-রপ্তানি, পণ্য খালাস ও জাহাজীকরণ কার্যক্রমে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা আমদানিকারক কিংবা রপ্তানিকারকের অনুমোদিত প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের আমলে দলীয় বিবেচনায় ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপেই লোভনীয় এই কাজের লাইসেন্স দেওয়া হতো। কিন্তু সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট লাইসেন্সিং বিধিমালা-২০২৬ অনুযায়ী, লাইসেন্স দেওয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, আবেদন যাচাই-বাছাই, পরীক্ষা গ্রহণ ও লাইসেন্স দেওয়ার দায়িত্ব কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট ট্রেনিং একাডেমির (সিইভিটিএ) ওপর ন্যস্ত করা হয়, যা এই খাতে জবাবদিহিতা ফিরিয়ে আনার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে গত জানুয়ারিতে নতুন করে সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্স প্রদানের জন্য আবেদন আহ্বান করে এনবিআর। লাইসেন্স পেতে আবেদন করেন প্রায় সাড়ে তিন হাজার লাইসেন্সপ্রত্যাশী। যাচাই-বাছাই করে লিখিত পরীক্ষার জন্য ২৯৮৭ আবেদনকারীকে মনোনীত করা হয়। গত ১৬ মে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। মনোনীত প্রায় তিন হাজার লাইসেন্সপ্রত্যাশীর মধ্যে ২৫২১ জন সরাসরি পরীক্ষায় অংশ নেন। ৮০ নম্বরের পরীক্ষায় পাস মার্ক নির্ধারণ করা হয় ৪০, যা অর্জন করতে পেরেছেন মাত্র ২১০ লাইসেন্সপ্রত্যাশী।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরীক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন কাস্টমস কর্মকর্তা জানান, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও ঠিকাদাররা লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিলেও পাস করতে পারেননি কেউ। ফলে পরীক্ষার পর থেকে ফলাফলে অনৈতিক হস্তক্ষেপ শুরু হয় রাজনৈতিক মহল থেকে। একপর্যায়ে ১১০ জনের একটি তালিকাও ধরিয়ে দেওয়া হয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ঘোষণা করার জন্য। তালিকাটি এনবিআরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা সিইভিটিএ’র কাছে পৌঁছে দিয়ে বলেন, এই ১১০ জনকে পাস করাতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের চাপ আছে। কিন্তু এনবিআরের কোনো কর্মকর্তা তালিকা পৌঁছে দিয়েছেন কিংবা সরকারের উচ্চপর্যায় বলতে কী বোঝাতে চাচ্ছেন— এমন প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দেননি ওই কাস্টমস কর্মকর্তা।

তিনি জানান, পরীক্ষার ফলাফলে অনৈতিক হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না এমন সিদ্ধান্তে অটল থাকেন তারা। পরীক্ষার দিন ১৬ মে মধ্যরাতেই ফলাফল চূড়ান্ত হয়ে যায়। ২১০ জনের তালিকাসহ প্রতিবেদন তৈরি করে কমিটির ছয় সদস্য সই করেন।

বিধি অনুযায়ী, পরদিনই ফল প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে টানাপোড়েনের কারণে নির্ধারিত সময়ে ফলাফল প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। সবশেষ পরীক্ষা নেওয়ার ১৫ দিন পর ১ জুন বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাফল না দেওয়ার বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর ২১০ জন উত্তীর্ণ লাইসেন্স প্রত্যাশীর তালিকা প্রকাশ করা হয়।

এরপর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ জানান, লাইসেন্স প্রদান পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা। প্রকাশ্যে বিভিন্ন সভা সেমিনারেও ক্ষোভ জানান তারা। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আহমেদুল আলম চৌধুরী রাসেল তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘দীর্ঘ ১৭টা বছর মামলা, হামলা, জেল খেটে ব্যবসা বাণিজ্য ও চাকরি-বাকরি কিছুই জোটেনি দলের নেতাকর্মীদের। আজ সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্সে বঞ্চিত হলো অসংখ্য নেতাকর্মী। ১৭ বছর বিএনপি করার অপরাধে বঞ্চিত, এখনো বিধি ও আত্মীয়দের কারণে বঞ্চিত দলের নেতাকর্মীরা।’

চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি সৌরভ প্রিয় পাল লেখেন, ‘আওয়ামী দোসরদের লাইসেন্স দিচ্ছে অথচ আমরা রাস্তায়’। সৌরভ প্রিয় পাল জানান, পরীক্ষার পরদিন ফলাফল প্রকাশ করার কথা ছিল। কিন্তু ১৫ দিন পর ফলাফল দিয়েছে। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া বিএনপি নেতাকর্মীরা সবাই ফেল করেছেন, কিন্তু উত্তীর্ণদের মধ্যে অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও রয়েছেন। এটা রহস্যজনক বলেই ক্ষোভ জানিয়েছেন তিনি।

পরীক্ষাসংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, লিখিত পরীক্ষার ফলাফলে অনৈতিক হস্তক্ষেপের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে নতুন লাইসেন্স প্রদানের এই প্রক্রিয়া বন্ধ করতে উঠে পড়ে লাগে প্রভাবশালী একটি চক্র। গত বৃহস্পতিবার এনবিআরের কাস্টমস মামলা ও বিরোধ নিষ্পত্তি শাখা থেকে ‘অনিবার্য কারণ’ দেখিয়ে মৌখিক পরীক্ষা স্থগিতের নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে স্থগিতাদেশের সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি। তার দাবি, বিধিমালায় এনবিআরের পক্ষ থেকে পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তন করার এখতিয়ার থাকলেও স্থগিত করার কোনো বিধান নেই।

তিনি জানান, ‘বিধিমালা অনুযায়ী ২৪ জুনের মধ্যে মৌখিক পরীক্ষা সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশ না করার জন্যও বিভিন্ন পর্যায় থেকে চাপ দেওয়া হচ্ছিল। সেই চাপ উপেক্ষা করে সিইভিটিএ গত ১৭ জুন মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশ করে। কিন্তু পরদিনই এনবিআর থেকে পরীক্ষা স্থগিতের নির্দেশ আসে।’

সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট লাইসেন্সিং বিধিমালা অনুযায়ী, প্রথমবারের মতো এই পরীক্ষার আয়োজন করে এনবিআর-অধীনস্থ সংস্থা সিইভিটিএ। আবেদন যাচাই-বাছাই, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরীক্ষা পরিচালনা ও ফল প্রকাশের জন্য ছয় সদস্যের কমিটিও গঠন করা হয়। পরীক্ষা কমিটির সদস্যদের দাবি, এনবিআরের পক্ষ থেকে পাঠানো তালিকায় এমন পরীক্ষার্থীর নামও ছিল, যারা লিখিত পরীক্ষায় ১০ নম্বরও পাননি। তাদের অন্তর্ভুক্ত না করায় পরীক্ষা স্থগিত করা হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছেন তারা।

পরীক্ষার আয়োজক প্রতিষ্ঠান সিইভিটিএ মহাপরিচালক ম সফিউজ্জামান জানান, ‘বিধিমালা অনুযায়ী দুই মাসের মধ্যে পরীক্ষা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা। আমরা সে অনুযায়ী মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশ করেছিলাম। কিন্তু এনবিআরের পক্ষ থেকে পরীক্ষাটি আপাতত স্থগিত রাখতে বলা হয়েছে। সে অনুযায়ী স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে কী কারণে স্থগিত করা নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা তিনি জানেন না।

এনবিআরের এমন এখতিয়ার আছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সিনিয়র কর্মকর্তারা কোনো নির্দেশনা দিলে সেটার এখতিয়ার তার আছে কি না এমন প্রশ্ন করার অধিকার জুনিয়র কর্মকর্তাদের নেই। তবে এনবিআর যখন এমন নির্দেশনা দিয়েছে, সেটা বিচার বিবেচনা করেই দিয়েছে।

পরীক্ষার ফলাফলে কোনো রাজনৈতিক চাপ ছিল কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে সিইভিটিএ’র মহাপরিচালক জানান, তার ওপর এমন কোনো রাজনৈতিক চাপ ছিল না। এমনকি পরীক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তার অধীনস্ত কর্মকর্তারাও কেউ এমন অভিযোগ তার কাছে করেননি। ১১০ জনের যে তালিকার কথা বলা হচ্ছে, এই বিষয়েও তার কিছু জানা নেই বলে জানান।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বক্তব্য চেয়ে এসএমএস পাঠালেও সাড়া মেলেনি।

চট্টগ্রাম সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুল ইসলাম জানান, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের তালিকাভুক্ত প্রায় তিন হাজার সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্স আছে। এটাই অতিরিক্ত। সবাই কাজ পায় না। কাজ না থাকায় অনেকে লাইসেন্স বিক্রিও করে দিয়েছেন। এই বাস্তবতায় নতুন লাইসেন্স দেয়ার তেমন প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। তারপরও সরকার নতুন লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। আবার প্রক্রিয়া স্থগিতও করেছে। কেন উদ্যোগ নিল আর কেন তা স্থগিত করল- সেটা অবগত নই।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন