একটি ফেসবুক পোস্ট ঘিরে নতুন আলোচনা

ডেভিড ইমন গ্রেপ্তারের পর সন্ত্রাসী রায়হানের হুঙ্কার

ডেভিড ইমন গ্রেপ্তারের পর সন্ত্রাসী রায়হানের হুঙ্কার
ছবি: আমার দেশ

চট্টগ্রামে শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী মোহাম্মদ রায়হান আলমের একটি ফেসবুক পোস্ট ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ওই পোস্টে তিনি দাবি করেছেন, তার লোকজন কারাগারে থাকলেও তিনি একা হয়ে যাননি। বিদেশে থাকা ‘সাজ্জাদ ভাইয়ের’ আরও অনেক লোকজন রয়েছে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

মঙ্গলবার দেওয়া তার নিজের ওই ফেসবুক আইডিতে রায়হান লিখেছেন, ‘আমার খেলা শেষ আহারে বেকুবের দল’। এরপর তিনি দাবি করেন, সাজ্জাদের ‘সব অটো মাল’ একবার সামনে এলে তারা আগের লোকজনের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠবে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যে এর ‘আপডেট’ পাওয়া যাবে বলেও তিনি লিখেছেন।

বিজ্ঞাপন

এই বিষয়ে জেলা পুলিম সুপার মাসুদ আলম বলেন, একজন সন্ত্রাসী অনেক কথায় লিখবে। আমরা ডেভিড ইমন, ধামা ইলিয়াসের মতো সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনছি। তাকেও আনার চেষ্টা চলছে।

রায়হানের এই পোস্ট এমন সময়ে সামনে এল, যখন বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একের পর এক গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর বড় সাজ্জাদ বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠা মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনও সম্প্রতি গ্রেপ্তার হয়েছেন। এরপর বাহিনীর পরবর্তী নেতৃত্বে কারা আসছেন, তা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে আলোচনা চলছে।

রায়হানের পোস্টের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে তার দেওয়া ‘শত শত রায়হান’-এর বক্তব্যকে। তিনি লিখেছেন, ‘আমার মতো শত শত রায়হান সাজ্জাদ ভাইয়ের Store-এ পড়ে আছে।’

এর মাধ্যমে বড় সাজ্জাদের একটি বড় নেটওয়ার্ক এখনো সক্রিয় রয়েছে-এমন দাবি করেছেন রায়হান। তিনি আরও লিখেছেন, লোকজনের সংখ্যা বাড়ানোর মাধ্যমে নয়, কাজের মাধ্যমে নিজের পরিচয় দেবেন। রায়হানের ভাষায়, ‘সংখ্যায় লোক বাড়ানো পাবলিক আমি না, কাজে পরিচয় দেব।’

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, বড় সাজ্জাদের চক্রে একাধিক স্তরের সহযোগী রয়েছে। শীর্ষ কোনো সহযোগী গ্রেপ্তার হলে পরবর্তী সারির কেউ তার জায়গা নেওয়ার চেষ্টা করে। রায়হানের এই বক্তব্য সেই সাংগঠনিক কাঠামোর অস্তিত্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

পোস্টে রায়হান তার বিরুদ্ধে হামলার প্রস্তুতির অভিযোগও করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘রাউজানের সব ডাকাত বাহিনী এক হয়েছে এক সঙ্গে অ্যাটাক করবে আমাকে।’

তবে কারা তার বিরুদ্ধে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাদের পরিচয় বা এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য পোস্টে দেননি তিনি। একই সঙ্গে কোনো ঘটনার প্রমাণও দেননি। এর পরের অংশে তিনি লিখেছেন, ‘আমি ছোট একটা মানুষের জন্য যদি এত বড় আয়োজন করা লাগে তুরা কিসের গুন্ডা?’-এমন বক্তব্যের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন তিনি।

পোস্টের শেষ দিকে রায়হান দাবি করেছেন, তার কাছে প্রতিপক্ষের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য রয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘কে কোন জায়গা থেকে আসে যাই সব খবর আমার কাছে আছে।’

গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে এই বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হতে পারে। কারণ, এতে রায়হান তার প্রতিপক্ষের অবস্থান ও গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার দাবি করেছেন। তিনি কী ধরনের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এসব তথ্য পান, তা তদন্তের বিষয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।

রায়হানের পোস্টটি সামনে এসেছে ডেভিড ইমন গ্রেপ্তারের পর। বড় সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ইমনকে গত জুলাইয়ের শেষ দিকে যশোর থেকে গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছিল, ইমনের সঙ্গে কয়েকজন সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ইমনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে একাধিক হত্যা, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রের মামলা রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের পর বড় সাজ্জাদ বাহিনীর স্থানীয় নেটওয়ার্ক নিয়ে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর আগে ছোট সাজ্জাদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর ইমন ও রায়হানের নাম সামনে এসেছিল। নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় তাদের পৃথকভাবে প্রভাব বিস্তারের তথ্যও পুলিশের কাছে ছিল।

এখন ইমন গ্রেপ্তারের পর রায়হানের এই পোস্ট নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে—তাহলে বড় সাজ্জাদের হয়ে মাঠপর্যায়ের নেতৃত্বে কারা রয়েছেন?

বড় সাজ্জাদ বাহিনীর নেতৃত্বে সাম্প্রতিক হাতবদলের আলোচনায় মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিনের নামও এসেছে। বোরহান ছোট সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে জোড়া খুনসহ একাধিক মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

বোরহানের পর সম্ভাব্য নেতৃত্বে রায়হানের নামও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের আলোচনায় রয়েছে। এরই মধ্যে রায়হানের নিজের ফেসবুক পোস্টে ‘সাজ্জাদ ভাইয়ের’ আরও লোকজনের কথা উল্লেখ এবং নিজেকে একা নন বলে দাবি করায় বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।

তবে ফেসবুক পোস্টে রায়হান যে দাবি করেছেন, সেগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর অভিযোগও আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, বড় সাজ্জাদের চক্রের সঙ্গে যুক্তদের মধ্যে যারা এখনো বাইরে রয়েছেন, তাদের গতিবিধির ওপর নজরদারি রয়েছে। বিশেষ করে শীর্ষ সহযোগীদের গ্রেপ্তারের পর নতুন করে কেউ নেতৃত্বে আসার চেষ্টা করছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান এসপি মাসুদ আলম।

রায়হানের পোস্টের ‘অল্প কিছু দিনের মধ্যে আপডেট পাবে’ এবং ‘শত শত রায়হান সাজ্জাদ ভাইয়ের স্টোরে পড়ে আছে’-এই বক্তব্যকে তাই হালকাভাবে দেখছেন না বলে জানান পুলিশ সুপার।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন