চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সরকারি ওয়েবসাইট নকল করে ওয়ারিশ, মৃত্যু, চারিত্রিক, বিবাহিত-অবিবাহিত সনদসহ বিভিন্ন নাগরিক সনদ তৈরি করছে একটি প্রতারক চক্র। শুধু তাই নয়, এসব সনদ জালিয়াতি করে ভূমি অফিসে নামজারির মাধ্যমে কোটি টাকার জমিও নিজেদের নামে করে নিচ্ছে চক্রটি। এতে মামলার দীর্ঘসূত্রতায় পড়ছেন নিরীহ ভূমি মালিকরা। তবে এসব ঘটনায় উপজেলা প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা নেই। দীর্ঘদিন ধরে চক্রটি জালিয়াতি কারবার করে এলেও আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা। সবশেষ একটি জাল সনদকে চিহ্নিত করে প্রতারক চক্রের বিষয়ে সতর্ক করেছে সীতাকুণ্ড পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে তিন দপ্তরকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশও করা হয়েছে। তবে চিঠির তিন দিনেও কোনো মামলা করেনি উপজেলা প্রশাসন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারি অনুমোদন নেওয়া ওয়েবসাইট ‘সীতাকুণ্ড ডট প্রত্যয়ন ডটনেট’-এর পরিবর্তে ‘সীতাকুণ্ড ডট প্রত্যয়ন ডটকম-ওয়েব’ নামে আরেকটি ডোমেইন তৈরি করেছে প্রতারক চক্র। আর সেই সাইট থেকেই ইউএন, ওসি ও পৌর নির্বাহী কর্মকর্তার স্বাক্ষর জালিয়াতি করে মৃত্যুসনদ, ওয়ারিশ সনদসহ সব ধরনের নাগরিক সনদ তৈরি করা হচ্ছে। অবিকল নকল সনদে সিল ও স্বাক্ষর দেখে বোঝার উপায় নেই সনদটি জাল।
প্রশাসনের কোনো ব্যবস্থা বা নজরদারি না থাকায় প্রতারক চক্রটি উপজেলা ও পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদগুলোর আশপাশে অবস্থান করে মোটা অঙ্কের টাকার চুক্তির মাধ্যমে এসব কাজ করে যাচ্ছে। তবে বাস্তবে নকল ওয়েবসাইটটি ভিজিট করা যাচ্ছে না। শুধু জালিয়াতি করে তৈরি করা সনদগুলোতে কিউআর কোড স্ক্যান করলেই সাইটটির লিংক দেখা যাচ্ছে।
এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে সীতাকুণ্ড পৌরসভার আমিরাবাদে। যেখানে হাসিনা বেগম নামে একজন তার বোনকে বাদ দিয়ে নকল ওয়ারিশ সনদ তৈরি করে প্রায় ৫৮ শতাংশ জমি নিজের নামে নামজারি করে নিয়েছেন। পরে ভুক্তভোগীর অভিযোগে পৌরসভা নির্বাহী কর্মকর্তা সনদটি জাল হিসেবে চিহ্নিত করেন।
মামলা ও অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে তথ্য গোপন করে সীতাকুণ্ড পৌরসভায় ওয়ারিশ সনদের আবেদন করেন মৃত খাইরুল্লাহর মেয়ে হাসিনা বেগম। ওই আবেদনে নিজের বোন হাসিনা বানুকে বাদ দিয়ে নিজেকে একমাত্র ওয়ারিশ হিসেবে দাবি করেন তিনি। তবে পৌর কর্তৃপক্ষ তার নামে কোনো ওয়ারিশ সনদ ইস্যু করেনি। পরবর্তী সময়ে জাল ওয়ারিশ তৈরি করে ভূমি অফিসে প্রদর্শন করেন তিনি।
গত ১০ আগস্ট সীতাকুণ্ডের সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মামুন ৫৭.৪৫ শতাংশ জমি হাসিনা বেগমের নামে নামজারি অনুমোদনও দেন। অভিযোগ ওঠে, হাসিনা বেগম প্রতারক চক্রের মাধ্যমে জাল সনদ তৈরি করেন। একইভাবে তিনি ২০০১ সালে একবার ও ২০১০ সালে একবার জাল সনদ তৈরি করেছিলেন। সে সময় পৌর কাউন্সিলর তাকে সতর্ক করে ছেড়ে দেন।
মামলার বাদী অ্যাডভোকেট আলী আজম বলেন, কয়েক দফায় আবেদন করেও ওয়ারিশ সনদ না পেয়ে জাল সনদের আশ্রয় নেন হাসিনা বেগম। পরে আমি আদালতে মামলা করেছি। যা তদন্ত শেষে প্রতিবেদনও জমা হয়েছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর পৌরসভায় এ বিষয়ে অভিযোগ দিলে তারা সেটিকে জাল হিসেবে শনাক্ত করেছে। তিনি বলেন, সীতাকুণ্ডে এমন ঘটনা নতুন নয়। প্রায়শ সরকারি লোগোযুক্ত নকল ওয়েবসাইট থেকে সনদ বিক্রি করছে চক্রটি। আর ভূমিদস্যুরা এসব সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে।
সীতাকুণ্ডের একাধিক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, সীতাকুণ্ডে বর্তমানে সরকারি ওয়েবসাইট নকল করে জাল সনদ তৈরির ঘটনা অহরহ। উপজেলা ভূমি প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন তেমন কোনো নজরদারি না রাখায় চক্রটি তাদের প্রতারণার জাল ছড়িয়ে দিয়েছে পুরো এলাকায়।
মো. হাসান নামে স্থানীয় একজন ভুক্তভোগী বলেন, সীতাকুণ্ডের সাবেক একজন এসিল্যান্ড নিজ উদ্যোগে সীতাকুণ্ড ডট প্রত্যয়ন ডট নেট নামে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেন। মন্ত্রণালয় থেকে এটির অনুমোদন নেন এবং এর জন্য তিনি পুরস্কারও পান। কিন্তু ওয়েবসাইটটি ত্রুটিপূর্ণ। একই সাইট থেকে আবেদন করে পাওয়া সনদগুলো প্রায়শ স্ক্যান করলে প্রদর্শিত হয় না। প্রকৃত সনদ নিয়েও স্ক্যান করে ওই ওয়েবসাইটে পাওয়া না গেলে যে কেউ প্রতারক হিসেবে সাব্যস্ত হয়। তিনি বলেন, গোঁজামিল ওয়েবসাইট খুলে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতারকরা নকল সাইট খুলে জাল সনদ তৈরি করে ভূমির নামজারি করে নিচ্ছে।
এদিকে গত ১৭ সেপ্টেম্বর সীতাকুণ্ড পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম সীতাকুণ্ডের সহকারী কমিশনার (ভূমি), সীতাকুণ্ডের ওসি ও সাব-রেজিস্ট্রারকে চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছেÑগত ১৪ এপ্রিল তারিখ দিয়ে হাসিনা বেগম ইউএন, ওসি ও পৌর নির্বাহী কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল করে ১০৪৪৪৬ নম্বরের একটি ওয়ারিশ সনদ তৈরি করেন, যা সম্পূর্ণ জাল। ইস্যুর তারিখে পহেলা বৈশাখের সরকারি ছুটি ছিল। সেদিন কোনো সনদ ইস্যু করা হয়নি। চিঠিতে ওই নামে কোনো দলিল সৃজন, নামজারি না করার অনুরোধ করা হয়। একই সঙ্গে দ্রুত মামলা করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনার কথাও জানানো হয়।
এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড থানার ওসি মহিনুল ইসলাম বলেন, যারা জালিয়াতি করে সনদ বানাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হলে আমরা গ্রেপ্তার করব। বিষয়টি যেহেতু পৌরসভার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেখানে আমাদের কিছু নেই। কাউন্সিলর না থাকায় আমাদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষকে মামলা করতে হবে।
সীতাকুণ্ডের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফজলে রাব্বি বলেন, কেউ অভিযোগ দিলে আমরা সংশ্লিষ্ট নামজারি বাতিল করব। সরকারি ওয়েবসাইটে কোনো সনদ যাচাইয়ে অসুবিধা হলে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে যাচাই করা হয়। কারণ সবগুলো সনদের ডকুমেন্টস আমাদের কাছে থাকে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

