বিএনপির কেন্দ্রীয় নেত্রী শানুর আবেগঘন স্ট্যাটাস

‘আর কত ত্যাগ স্বীকার করলে সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন মিলবে?’

এস এম ইউসুফ আলী, ফেনী

‘আর কত ত্যাগ স্বীকার করলে সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন মিলবে?’
ছবি: আমার দেশ

বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট শাহানা আক্তার শানু সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন না পাওয়ায় মঙ্গলবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা ত্যাগ ও সংগ্রামের স্মৃতিচারণ করে তিনি দলের কাছে প্রশ্ন রেখেছেন- ‘আর কত ত্যাগ স্বীকার করলে সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন মিলবে?’

তিনি বলেন, ‘১৯৮৭ সালে সোনাগাজী কলেজ সংসদের নির্বাচিত সম্পাদক পদ নিয়ে পথচলা। এরশাদবিরোধী ’৯০-এর গণআন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। ১৯৯২ সালে বদরুন্নেসা সরকারি কলেজ, ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। বর্তমান যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদিকা অপু উকিলকে হারিয়ে তখন শিরোনামে ছিলাম। দু’বার বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য, জাতীয়তাবাদী মহিলা দল কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম ডিভিশনের কমিটি করার দায়িত্বপ্রাপ্ত টিম লিডার ছিলাম। তখন বারবার বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল।’

বিজ্ঞাপন

তিনি আরো বলেন, ‘৩৮ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এবং বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে একদিনের জন্যও অবসরে ছিলাম না, ছাত্রদল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত অসংখ্যবার হামলা-মামলার শিকার হয়েছি, পরিবারের সদস্যরাসহ।

তৎকালীন জয়নাল হাজারীর স্টিয়ারিং কমিটির দ্বারা নির্যাতিত হয়েছিলাম পরিবারসহ। প্রথমবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর অসংখ্যবার আমার বাড়িতে হামলা হয়েছিল। আমার বৃদ্ধ বাবাকে বারবার ধরে নিয়ে গিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেছিল। তার অপমান সহ্য করতে না পেরে অকালে উনি মারা যান, যা তৎকালীন এমপি মোশাররফ হোসেন জানতেন।

আমার স্বামীর ব্যবসায়িক অফিস পল্টনে হওয়ায় আন্দোলনে নেতাকর্মীরা তার অফিসে আশ্রয় নিয়েছে অনেকবার। যার ফলে তাকে পুলিশের রোষানলে পড়তে হয়েছে অসংখ্যবার। পল্টনে কোনো ঝামেলা হলেই তাকে মামলার ভয় দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা তৎকালীন পল্টন থানা নিয়েছিল। দলের মহাসচিবসহ সবাইকে বিষয়টি জানিয়েছিলাম। উনারা বলেছিলেন ধৈর্য ধরতে।’

এই নারী নেত্রী বলেন, ‘আমার মেয়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ফার্স্ট ক্লাস থাকার পরও তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ নেওয়া হয়নি। কারণ, সে একজন বিএনপি নেত্রীর মেয়ে। ’৯০-এর আন্দোলন, ১৭ বছরের আন্দোলন, জুলাইয়ের আন্দোলন, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হওয়ার কারণে ম্যাডামের মামলাসহ, অসংখ্য নেতাকর্মীকে বিনা পয়সায় আইনি-সহায়তা দিয়েছিলাম। করোনায়, বন্যায় ফেনীসহ সারা দেশে মহিলা দলের সভানেত্রী, সাধারণ সম্পাদকসহ শারীরিক ও আর্থিকভাবে সহায়তা দিয়েছিলাম দলের সঙ্গে থেকে।

যে নেতাকর্মীদের বছরের পর বছর আন্দোলনে এনেছিলাম, সাহস দিয়েছিলাম যে পরিবারের মা-বাবা, ছেলেমেয়ে ও স্বামীকে সময় না দিয়ে দলকে সময় দিয়েছি, আজ তাদের প্রশ্নের উত্তর কী দেব? তাদের কাছে কীভাবে মুখ দেখাব? দলের কাছে আমার বিনীত জিজ্ঞাসা।

আর কত ত্যাগ স্বীকার বা কীভাবে মাঠে থাকলে সংরক্ষিত আসনে মনোনীত করবেন? দলের কাছে আমার এই প্রশ্ন থাকল।

উল্লেখ্য যে, এইবারসহ চারবার মনোনয়ন চেয়েছিলাম।’

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘২০০৯ সালে দেশনেত্রী, গণতন্ত্রের মা, ম্যাডাম খালেদা জিয়া মনোনয়নের সময় আমার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে বলেছিলেন- ‘আমার কাছে তোমার মূল্য অনেক বেশি। সামনের বার বিএনপি ক্ষমতায় আসলে তোমাকে এমপি বানানো হবে।’ তখন সেখানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অনেক মাননীয় সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

১৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মনোনয়ন সাক্ষাৎকারে এক মিনিটের সময়ের মধ্যে বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সামনে এই কথাগুলো বলতে পারিনি। ম্যাডামের দেওয়া এই প্রতিশ্রুতির কথা মনে পড়লে আজ চোখ ঝাঁপসা হয়ে আসে। এক মিনিটের মধ্যে আমার ৩৮ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অজস্র অবদান, দলের জন্য আমার করা কাজ তুলে ধরা সম্ভব হয়নি। তবে আশা রাখব, আমার বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে ডেকে আমার না বলা অনেক কথাগুলো শুনবেন এবং মূল্যায়ন করবেন।’

ফেনীর এ কন্যা বলেন, ‘আমি মনে করি, সংরক্ষিত আসন দলের পক্ষ থেকে নারীদের জন্য একটি উপহার। উপহারের চেয়েও আমার কাছে বড় কথা হলো যে, আমাদের সমাজের পিছিয়ে পড়া এবং নির্যাতিত নারীদের জন্য কাজ করার সুযোগ পায় একজন সংরক্ষিত আসনে মনোনীত নারী। এই সেবার সুযোগটি একজন নারীকে বারবার না দিয়ে একাধিক নারীর মাঝে বণ্টন করলে এ রূপ বৈষম্য হবে না বলে মনে করি।

দলের তৃণমূল থেকে শুরু করে দলের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত সবাই আমার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার সম্পর্কে জানেন। তাই, এইবার আশা করেছিলাম, দল আমাকে মূল্যায়ন করবে এবং বড় পরিসরে জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দেবে। বর্তমানে যাদের এইবার সংরক্ষিত আসনে মনোনীত করা হয়েছে, তারা সবাই অবশ্যই যোগ্য এবং দলের জন্য নিবেদিত। তাদের সবাইকে সাধুবাদ জানাই। তবে তাদের বেশির ভাগই দলীয় পদে এবং বয়সে আমার চেয়ে অনেক ছোট।

এমতাবস্থায়, দলীয় কোনো প্রোগ্রামে আমার মতো যাদের মূল্যায়ন হয়নি, তাদের অবস্থান কোথায় হবে? এই ভেবে বিব্রত বোধ করছি। আবারো বলছি, যারা মনোনীত হয়েছেন, সবাই যোগ্য এবং সবার জন্য আমার অশেষ শুভকামনা।’

প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, মিছিলের শেষ ছেলেটিকেও আপনি মূল্যায়ন করবেন। আমি বর্তমান বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য, জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে আপনার মূল্যায়নের অপেক্ষায়।

সব সময় দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি ৩৮ বছর, কখনো দ্বিমত পোষণ করিনি। দলকে ভালোবাসি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অনেক শ্রদ্ধা করি, তাই এবারো দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি। তবে আশা করব, দল অতি শিগগিরই আমাকে মূল্যায়ন করে এই মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেবে। যেন নিজের কাছে নিজে হীনম্মন্যতায় ভুগতে না হয় আমাকে, দলকে নিঃস্বার্থভাবে নিজ জীবনের ৩৮ বছর দিয়ে দেওয়ার পর। সবার আগে বাংলাদেশ।”

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...