কুমিল্লায় বোরো ধান কাটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় সময় পার করছেন কৃষক। ক্ষেতের পর ক্ষেতজুড়ে সোনালি ধানে ভরে গেলেও শ্রমিক সংকটের কারণে সময়মতো ধান ঘরে তুলতে পারছেন না তারা। ন্যায্য মজুরির দ্বিগুণ দিয়েও মিলছে না ধান কাটার শ্রমিক। ফলে সময়মতো না কাটায় অনেক জমিতে পাকা ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জেলার চান্দিনা, দেবিদ্বার, মুরাদনগর, সদর দক্ষিণ, ব্রাহ্মণপাড়া, বুড়িচং, বরুড়া ও লাকসামসহ বিভিন্ন এলাকায় এ সংকট দেখা দিয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, অল্প কিছুদিন আগেও একজন শ্রমিক দিনপ্রতি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা মজুরিতে কাজ করতেন। কিন্তু এবার শ্রমিক সংকট এতটাই প্রকট যে, একজন শ্রমিককে একদিন কাজের জন্য দুই মণ ধান পর্যন্ত মজুরি দিতে হচ্ছে। কখনো কখনো তাতেও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।
কৃষকরা জানান, গ্রামের অনেক শ্রমিক এখন শহরমুখী হয়ে পড়েছেন। কেউ ইটভাটায়, কেউ নির্মাণকাজে, আবার কেউ গার্মেন্ট কারখানায় কাজ করছেন। এছাড়া ব্যাটারিচালিত রিকশা চালিয়ে কম পরিশ্রমে বেশি আয় হওয়ায় কৃষিকাজে আগ্রহ হারাচ্ছেন তারা। ফলে ধান কাটার মৌসুমে শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে একসঙ্গে ধান পাকায় হঠাৎ করেই শ্রমিকের চাহিদা বেড়ে গেছে।
মুরাদনগরের কৃষক আবদুল কাদের বলেন, ধান পুরোপুরি পেকে গেছে। এখন না কাটলে বৃষ্টি বা ঝড়ে ক্ষতি হবে। কিন্তু শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। যারা আসতে চায়, তারা দুই মণের বেশি ধান চাচ্ছে। গত সপ্তাহে দুজন শ্রমিক ঠিক করেও এখন তাদের পাওয়া যাচ্ছে না।
বুড়িচং উপজেলার হরিপুর গ্রামের কৃষক জুয়েল রানা বলেন, প্রায় ৮০ শতক জমিতে ধান চাষ করেছি। একজন শ্রমিকের মজুরি এখন এক হাজার ৭০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা। কাঁচা ধান বিক্রি হচ্ছে ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা মণ দরে। পাঁচজন শ্রমিক আনতে গেলে ১০ মণ ধান বিক্রি করতে হয়। তাহলে ধান চাষ করে লাভ কোথায়? তিনি আর ধান চাষ করবেন না বলে জানান।
দেবিদ্বারের কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, সার, বীজ, সেচ—সবকিছুর খরচ আগেই বেড়েছে। এখন ধান কাটার খরচও বেড়ে যাওয়ায় আমরা দিশাহারা হয়ে পড়েছি।
কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরর সূত্রে জানা গেছে, এবার জেলায় বোরো মৌসুমে এক লাখ ৬২ হাজার ২১৫ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। গত সপ্তাহের অতিবৃষ্টিতে প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমির ধান আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৬ হেক্টর জমির ধান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ লাখ টাকার ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
এদিকে প্রান্তিক কৃষকরা অভিযোগ করেন, সরকারি গুদামে ধান বিক্রির নিয়ম-কানুন জটিল হওয়ায় তারা সহজে সেখানে ধান বিক্রি করতে পারেন না। ফলে বাধ্য হয়ে কম দামে স্থানীয় বাজারে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।
সদর দক্ষিণ উপজেলার উনাইশার এলাকার কৃষক কানু মিয়া বলেন, ৮০ শতক জমিতে ধান চাষ করেছিলাম। গত সপ্তাহের বৃষ্টিতে ৪০ শতক জমির পাকা ধান পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। এক হাজার ৭০০ টাকা করে দিনমজুর দিয়ে ৩০ শতক ধান তুলেছি। ধান বিক্রি করতে গিয়ে মাত্র ৯০০ টাকা মণ দাম পেয়েছি। বাড়িতে শুকানোর জায়গা না থাকায় রাস্তার মধ্যেই ধান সিদ্ধ করছি এবং শুকাচ্ছি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, কৃষকদের কাছ থেকে সরকার ৩৬ টাকা কেজি দরে ধান কিনছে। তবে অতিবৃষ্টির কারণে ব্রাহ্মণপাড়া, সদর দক্ষিণ ও বুড়িচং উপজেলায় বেশি ক্ষতি হয়েছে।
কৃষিবিদরা মনে করছেন, কৃষক যদি ধারাবাহিকভাবে ধানের ন্যায্যমূল্য না পান, তাহলে ভবিষ্যতে অনেকেই ধান চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। এজন্য দ্রুত কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানো, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া সহজ করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

