বিএনপি সরকারের সময়ে ২০০৬ সালে চট্টগ্রামের কালুরঘাটে ১৬.১৬ একর জায়গাজুড়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’। দেশের অন্যতম বিনোদন কেন্দ্রের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের অন্যতম লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল এটি। এতে জাতীয় সংসদ থেকে স্মৃতিসৌধ, জাতীয় মসজিদ থেকে বিভিন্ন মসজিদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অবয়ব গড়ে তুলে এক জায়গায় দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য জানার সুযোগ রাখা হয়।
২০০৯ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের রোষানলে পড়ে কার্যত বন্ধ হয়ে যায় ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’। এমনকি ফ্যাসিস্ট সরকার এর নাম পাল্টে ‘মিনি বাংলাদেশ’ রাখে। এরপর থেকে জিয়া স্মৃতি জাদুঘরের মতোই পার্কটির প্রতি অযত্ন আর অবহেলার ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দীর্ঘ এ সময়ে কমপ্লেক্সটির বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিস্তীর্ণ এলাকা আগাছা ও ঘাসে ঢেকে যায়। তবে এটির হারানো প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনতে ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। তাই আবারও পুরোনো নামে ফিরছে কমপ্লেক্সটি।
জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স নগরীর অন্যতম দর্শনীয় স্থান। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ৬ জুন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান চট্টগ্রামে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শনে এসে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, নাম পরিবর্তনের সেই সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ প্রতিহিংসামূলক। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ১২ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন শাখা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কমপ্লেক্সটির পুরোনো নাম ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’ ফিরিয়ে আনে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, চট্টগ্রামের কালুরঘাটস্থ ১৬.৩৭ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত কমপ্লেক্সটি এখন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ নামেই পরিচিত হবে।
বিগত সময়ে অযত্ন-অবহেলায় মুখ থুবড়ে পড়া এই কমপ্লেক্সটিকে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও দর্শনার্থীবান্ধব করে তুলতে ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান উদ্বোধনকালে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনার প্রতিরূপ নিয়ে গড়ে ওঠা ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’কে এমনভাবে সাজানো হবে, যাতে দর্শনার্থীরা স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরতে পারেন এবং দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারেন।
জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো দ্রুত সংস্কারের জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে শিগগির টেন্ডারের মাধ্যমে সংস্কারকাজ শুরু হবে। এছাড়া উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ বলেন, শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের মনও পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। এক জায়গায় বাংলাদেশের ইতিহাসের নানা অধ্যায় জানতে এই পার্কে আসতে হবে।
পার্কটির উত্তর-পূর্ব পাশে রয়েছে কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। কমপ্লেক্সের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনার ক্ষুদ্রাকৃতির প্রতিরূপ। এখানে রয়েছে জাতীয় সংসদ ভবন, আহসান মঞ্জিল, সুপ্রিম কোর্ট, কার্জন হল, কান্তজীর মন্দির, বড়কুঠি-ছোটকুঠি, ছোট সোনামসজিদ, লালবাগ কেল্লা, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার ও সেন্ট নিকোলাস চার্চ।
এছাড়া কৃত্রিম জলরাশি, চিরন্তন পল্লি, ট্রেনের নিচে ব্রিজ, পানির ফোয়ারা এবং শিশুদের জন্য কিডস জোন রয়েছে। ফলে একই স্থানে বসে দর্শনার্থীরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের স্থাপত্য ও ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
৭১ মিটারের স্বাধীনতা টাওয়ার ও বিনোদন সম্ভাবনা
কমপ্লেক্সের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো ৭১ মিটার (প্রায় ২৩০ ফুট) উচ্চতার স্বাধীনতা টাওয়ার। এর ওপর রয়েছে ঘূর্ণায়মান রেস্তোরাঁ, যেখান থেকে চট্টগ্রাম নগর, কর্ণফুলী নদী এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বঙ্গোপসাগরের সৌন্দর্যও উপভোগ করা যায়। এক সময় এটি নগরবাসীর কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় বিনোদন কেন্দ্র ছিল।
স্থানীয়দের মতে, কেবল পরিচ্ছন্নতা নয়, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা, হাঁটার উপযোগী পরিবেশ, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা এবং মানসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে এটিকে ঢেলে সাজাতে হবে। কালুরঘাটের ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণেও এ স্থানের সঙ্গে মানুষের আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। শহীদ জিয়া ১৯৭১ সালে এ এলাকার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন।
সব মিলিয়ে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সংরক্ষণ এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধার সমন্বয়ে ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’ আবারও চট্টগ্রামের অন্যতম সেরা পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


