স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষ করে একদিন আইনজীবী হবেন। মেধাবী ছাত্র হিসেবে স্কুলেও ছিল সুনাম। কিন্তু পরিবারের নির্মম অভাব-অনটন সেই স্বপ্নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ২০২২ সালে এসএসসি পরীক্ষার পর আর এগোয়নি শিক্ষাজীবন। তবে প্রতিকূলতার কাছে হার না মেনে পরিবারের হাল ধরতে বেছে নেন কঠোর পরিশ্রমের পথ। শার্ট-প্যান্ট বিক্রির চাকরি ছেড়ে ধারদেনা করে ৬০ হাজার টাকা পুঁজিতে শুরু করেন ভ্যানগাড়িতে ভ্রাম্যমাণ পোশাকের ব্যবসা। অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে সেই ইমাম হাসান এখন প্রতিদিন দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকার পোশাক বিক্রি করছেন, যার মাধ্যমে মাসে আয় হচ্ছে লাখ টাকারও বেশি।
২৩ বছর বয়সি সফল এই তরুণ চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের খিল মুরারী এলাকার মোহাম্মদ ইউনুস মিয়া ও রোকসানা আক্তার দম্পতির বড় ছেলে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। তার বাবা পেশায় একজন রাজমিস্ত্রি।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবার সীমিত আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো। ছোটবেলা থেকেই বাবার এই কষ্ট ও হাড়ভাঙা খাটুনি দেখেছেন ইমাম। পড়াশোনায় প্রবল আগ্রহ ও ভালো ফলাফল সত্ত্বেও পরিবারের আর্থিক টানাপোড়েনে এসএসসি পরীক্ষার পর তার পড়ালেখার পাঠ চুকে যায়।
শিক্ষাজীবন থেমে যাওয়ার পর পরিবারের ওপর বোঝা না হয়ে কাজ নেন একটি কাপড়ের দোকানে। সেখানে দীর্ঘদিন কাজ করার সুবাদে কাপড় কেনাবেচা, ক্রেতাদের মনস্তত্ত্ব ও চাহিদা বোঝা এবং বিক্রির বিভিন্ন কৌশল দক্ষতা ও সাফল্যের সঙ্গে রপ্ত করেন। কিন্তু দোকানের সামান্য বেতনে পরিবারের চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছিল না। তাই একপর্যায়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর কঠোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
পরবর্তীতে পরিবার ও স্বজনদের কাছ থেকে ধারদেনা করে মাত্র ৬০ হাজার টাকা পুঁজি সংগ্রহ করেন ইমাম। সেই টাকা দিয়ে শার্ট, প্যান্ট, টি-শার্টসহ নানা রঙের পোশাক কিনে ভ্যানগাড়িতে করে বিক্রি শুরু করেন। প্রতিদিন বিকেলে ভ্যান সাজিয়ে বসেন ব্যস্ত বারইয়ারহাট পৌর বাজারে, যেখানে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে তার বিকিকিনি।
ব্যবসায় নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে ইমাম হাসান বলেন, প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকার পোশাক বিক্রি হয়। এতে মাসে লাখ টাকারও বেশি আয় হচ্ছে। দিনের বেলায় মা-বাবাকে সংসারের কাজে সাহায্য করি, আর বিকেলে ভ্যান নিয়ে বাজারে চলে যাই। এভাবেই ব্যবসার পাশাপাশি পরিবারের হাল ধরেছি।
অতীতের স্মৃতিকাতরতা প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ছোটবেলায় আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম। পড়াশোনাতেও ভালো ছিলাম। কিন্তু অভাবের কারণে পড়ালেখাটা চালাতে পারলাম না। তবে কাপড়ের দোকানে কাজ করার সময় শুধু তো বেতন পাইনি, ব্যবসার অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছি। সেই অভিজ্ঞতাই আজ আমার মূল পুঁজি। এখন নিজের উপার্জনে পরিবারকে সহযোগিতা করতে পারছি—একজন সন্তানের কাছে এটাই সবচেয়ে বড় তৃপ্তি।
সমাজ কী বলবে—সেই লোকলজ্জার চিন্তা না করে নিজের মেধা, অভিজ্ঞতা ও শ্রমকে পুঁজি করে স্বাবলম্বী হওয়ার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ইমাম হাসান। আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন বদলে গেলেও থেমে থাকেনি তার জীবনসংগ্রাম। অদম্য সাহসে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের নতুন ভবিষ্যৎ।
জেডএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


