চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড

২৫ লাখ টাকা মুক্তিপণের পরও বিএনপি নেতা জামাল ফিরেছিলেন কঙ্কাল হয়ে

২৫ লাখ টাকা মুক্তিপণের পরও বিএনপি নেতা জামাল ফিরেছিলেন কঙ্কাল হয়ে

চকবাজারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে বাসার দিকে রওনা দিয়েছিলেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির তৎকালীন সহসভাপতি জামাল উদ্দিন। তবে ২০০৩ সালের ২৪ জুলাই রাতে তার আর বাসায় ফেরা হয়নি। রাস্তা থেকে হঠাৎ উধাও হয়ে যান। এর দুই বছর পর তার কঙ্কাল পাওয়া যায়। তবে প্রায় দুই যুগ পার হলেও পাওয়া যায়নি এ হত্যাকাণ্ডের বিচার।

জানা গেছে, জামাল উদ্দিন নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথমে পুলিশ বিষয়টিকে সাজানো নাটক বলে মামলা নিতে গড়িমসি করে। অথচ একই সময়ে প্রশাসনের পরামর্শেই জামালের পরিবার অপহরণকারীদের সঙ্গে দরকষাকষি চালায়। অপহরণকারীরা প্রথমে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে, শেষ পর্যন্ত ২৫ লাখ টাকায় রফা হয় এবং পরিবার সে টাকা তুলে দেয়, কিন্তু টাকা পাওয়ার পরও মুক্তি পাননি জামাল উদ্দিন।

বিজ্ঞাপন

পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনার প্রায় দুই বছর পর অপহরণের অন্যতম হোতা আনোয়ারা সদরের সাবেক ইউপি সদস্য শহীদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরেই ২০০৫ সালের ২৪ আগস্ট ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকা থেকে একটি কঙ্কাল উদ্ধার করে র‍্যাব। সিঙ্গাপুরে ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে আসার পর নিশ্চিত হয়, কঙ্কালটি জামাল উদ্দিনেরই।

শহীদুল ইসলামসহ আরেক আসামি মাহবুবের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে অপহরণ-হত্যার পুরো ঘটনা উঠে আসে। জানা যায়, কীভাবে মুক্তিপণ দাবি ও আদায় হয়েছিল, কারা কারা এতে জড়িত, তার বিবরণ।

পুলিশের ৯ জন কর্মকর্তা প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে মামলাটি তদন্ত করেন। আসামিদের জবানবন্দি ও তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিএনপির কয়েকজন নেতার সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে এলেও ২০০৬ সালে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) আনোয়ারার সাবেক সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম, তার ছোট ভাই মারুফ নিজামসহ ২৪ জনকে অব্যাহতি দিয়ে মাত্র ১৬ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র জমা দেয়। এ অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে বাদীপক্ষ নারাজি আবেদন করে।

জবানবন্দিতে নাম আসা ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির বর্তমান সদস্য সচিব হেলাল উদ্দিনও, যার নাম মুক্তিপণসংক্রান্ত আলোচনায় উঠে এসেছিল বলে আসামি শহীদুলের জবানবন্দিতে উল্লেখ আছে।

মামলাটি সহজে এগোয়নি। ২০০৭ সালে রাজসাক্ষী করা নিয়ে আপত্তি তুলে আসামি মারুফ নিজাম উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নেন, যা বহাল থাকে ২০১১ সাল পর্যন্ত। এরপর আসামিরা লিভ টু আপিল করলে সে আবেদন খারিজের আদেশ চট্টগ্রাম আদালতে এসে পৌঁছতেই সময় লাগে ২০১৬ সাল পর্যন্ত। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত সিআইডির অভিযোগপত্র গ্রহণ করে বাদীর নারাজি আবেদন খারিজ করে দেয়। এর মধ্যেই দুজন আসামি মারা যান। পরের বছর ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১৪ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মামলার বিচার।

আসামিদের একজন আবুল কাশেম চৌধুরী ওরফে কাশেম চেয়ারম্যান দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পলাতক থাকার পর আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চান। আদালত সেটি নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠায়।

মামলার সর্বশেষ অবস্থা

আদালত সূত্রে জানা যায়, মামলার ৮৪ জন সাক্ষীর মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র তিনজন সাক্ষ্য দিয়েছেন। সাক্ষী হাজির না হওয়ায় শুনানি বারবার পিছিয়েছে। ১৪ আসামির মধ্যে শহীদুল ইসলাম, আবুল কাশেম চৌধুরী ও মাহবুবসহ ১০ জন বর্তমানে জামিনে আছেন, একজন আসামি কারাগারে। মনসুর, ওসমান ও ইছহাক এখনো পলাতক। মামলাটি এখনো বিচারাধীন হওয়ায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।

জামাল উদ্দিনের ছোট ছেলে চৌধুরী আরমান রেজা বাবার হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেননি। গত বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি মারা যান। মামলার বাদী, নিহতের বড় ছেলে চৌধুরী ফরমান রেজা লিটন এখন আর সাক্ষ্য দিতে আদালতে হাজির হন না। মূল অভিযুক্তরা অভিযোগপত্র থেকে বাদপড়ায় তিনি বিচারের ওপর আস্থা হারিয়েছেন বলে জানান। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিজেই তিনটি মামলার আসামি হওয়ায় ভয়ে সে সময় কিছু করতে পারেননি বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তবে আইনজীবীর পরামর্শে মামলাটি নতুন করে তদন্তে পাঠানোর আবেদন করার কথা ভাবছেন তিনি।

নিহত জামাল উদ্দিনের স্ত্রী নাজমা আক্তারও বিচার শেষ না হওয়ায় হতাশ। তার দাবি—আওয়ামী লীগ আমলে মূল আসামিরা আঁতাত করে পার পেয়ে গেছেন। বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়ে নতুন করে সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনা হোক। পরিবারের দাবি, সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন চাওয়ার কারণেই জামাল উদ্দিনকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম-১৩ আসনে এমপি ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব হেলাল উদ্দিনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে বলেন, তারা ষড়যন্ত্রের শিকার। সারা বছর জামাল উদ্দিন ভাইয়ের হত্যার বিচার চেয়ে আসছেন তারা। বরং আওয়ামী লীগই তাদের নাম এ হত্যা মামলায় আনে বলে দাবি করেন।

আইনজীবীদের ভাষ্যমতে, বাদীপক্ষ চাইলে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য আদালতে নতুন আবেদন করতে পারেন, যেমনটি অতীতে হয়েছিল ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা কিংবা চট্টগ্রাম বন্দরে কোকেন জব্দের মতো আলোচিত মামলাগুলোতে। জামাল উদ্দিনের পরিবার এখন সে পথেই হাঁটার কথা ভাবছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন