চট্টগ্রামে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণ করা আটজনের জীবন এক যুগ পরও স্বাভাবিক হয়নি। গুলিতে পা হারানোর পর দীর্ঘ চিকিৎসা, কর্মহীনতা ও শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি তাদের বহন করতে হচ্ছে একের পর এক মামলার বোঝা। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আটক বা হেফাজতে নির্যাতনের পর তাদের পায়ে গুলি করা হয় এবং পরে ঘটনাগুলো আড়াল করতে তাদের বিরুদ্ধেই একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। ফলে তারা রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের অভিযোগে ন্যায়বিচার চাওয়ার সুযোগ থেকেও কার্যত বঞ্চিত হয়েছেন।
২০১৩ সালে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন প্রণয়ন করা হয়। ভুক্তভোগীদের দাবি, আইনটির কার্যকর প্রয়োগ তারা দেখেননি। ভয়, নিরাপত্তাহীনতা ও পাল্টা মামলার আশঙ্কায় অধিকাংশই পুলিশের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার চাননি। কারো বিরুদ্ধে পাঁচটি, কারো ১৯টি আবার কারো বিরুদ্ধে ৬৫টি পর্যন্ত মামলা রয়েছে, যার অনেকগুলো এখনো বিচারাধীন। আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিতে গিয়ে তারা অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে আরো বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
ভুক্তভোগীদের আটজনের মধ্যে সাতকানিয়া উপজেলার এওচিয়া ইউনিয়নের একটি গ্রামেরই পাঁচজন পা হারিয়েছেন। রয়েছেন একজন নারীও। এছাড়া আবু তাহের, কামাল উদ্দিন, মো. রফিক, এনামুল হক, শহিদুল ইসলাম, সাজু আক্তার, আরাফাত ও সাইফুল ইসলাম পুলিশের গুলিতে স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
খামারবাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গুলি
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার এওচিয়া ইউনিয়নের আলীনগর এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ হোছেনের ছেলে আবু তাহের। ২০১৩ সালের ৯ অক্টোবর ইউনিয়নের আলীনগরে তার খামারবাড়ি থেকে তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাতকানিয়া সার্কেল) ইমরান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে বিশেষ শাখার এসআই কাজী শফিকসহ পুলিশের একটি দল তুলে নিয়ে যায় তাকে ।
আবু তাহের জানান, তাকে চোখ বেঁধে সাতকানিয়া থানায় নিয়ে তিনদিন আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। এ সময় স্বজনদের কাছ থেকে চার লাখ টাকা আদায় করা হয় । ১২ অক্টোবর রাতে অস্ত্র উদ্ধারের কথা বলে তাকে তার খামারবাড়ির পাশে পায়ে গুলি করা হয়। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও পরবর্তী সংক্রমণের কারণে চিকিৎসকদের পরামর্শে তার একটি পা কেটে ফেলতে হয় ।
হাসপাতালে এক মাসেরও বেশি সময় চিকিৎসাধীন থাকার পর অস্ত্র মামলাসহ মোট আটটি মামলায় তাকে আসামি দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। প্রায় দুই বছর কারাগারে থাকার পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। তবে মামলাগুলোর বিচার এখনো চলমান থাকায় প্রতি মাসে তাকে চট্টগ্রামের আদালতে হাজিরা দিতে হয়।
গুলিতে পা হারান কামাল
সাতকানিয়ার কাঞ্চনা ইউনিয়নের প্রবাস ফেরত মোহাম্মদ কামাল উদ্দিনের অভিযোগ, অসুস্থ মাকে চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম নগরীর দেওয়ানহাটে এক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে এওচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মানিকের লোকজন তাকে আটক করে। পরে তাদের সঙ্গে থাকা ডিবি পুলিশের সদস্যদের কাছে তাকে তুলে দেওয়া হয়। এরপর তার পরিবারের কাছে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
কামাল উদ্দিনের দাবি, মুক্তিপণের টাকা না পেয়ে তাকে নির্যাতন করা হয় এবং একপর্যায়ে পায়ে গুলি করা হয়। চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হলে পরে তার ডান পা কেটে ফেলতে হয়। ওই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে আটটি মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
তিনি জানান, ঘটনার বিচার চেয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ডিবি এখনো তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয়নি।
পা হারিয়েও ৫০ মামলার আসামি রফিক
সাতকানিয়ার ছদাহা ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. রফিকের দাবি, ২০১৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সকালে বন্ধু জসিম উদ্দীনকে নিয়ে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে পুলিশ তাদের আটক করে গুলি করে। তিনি জানান, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় প্রথমে তাদের সাতকানিয়া সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। তখন দুজনই জীবিত ছিলেন। পরে হাসপাতাল থেকে থানার পাশের দস্তিরহাট এলাকায় নিয়ে আবার তাদের লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। এরপর আহতাবস্থায় পুলিশ পিকআপে করে চট্টগ্রাম শহরের দিকে নেওয়ার সময় পুলিশ সদস্যরা দেখতে পান তারা তখনো বেঁচে আছেন।
রফিকের অভিযোগ, বিকালে পটিয়ার শান্তিরহাট এলাকায় তাদের নামিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করতে আবার গুলি করা হয়। ঘটনাস্থলেই জসিম উদ্দীনের মৃত্যু হয় বলে তিনি দাবি করেন। পরে তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক জসিমকে মৃত ঘোষণা করেন এবং রফিককে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভর্তি করা হয়।
রফিক বলেন, তার শরীরে একাধিক অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছে। এখনো তার শরীরে দুটি গুলি রয়ে গেছে—একটি ফুসফুসের পাশে, অন্যটি হাড়ে আটকে আছে। একটি পা হারানো রফিকের বিরুদ্ধে মোট ৬৫টি মামলা দেওয়া হয়, যার মধ্যে প্রায় ৫০টির বিচার কার্যক্রম এখনো চলমান। আদালতে হাজিরা দিতেই তার মাসের অধিকাংশ সময় কেটে যায়।
নির্যাতন-মুক্তিপণ দাবি, তারপর গুলি
২০১৫ সালের ২৯ আগস্ট সাতকানিয়ার বাসিন্দা এনামুল হককে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে চোখ বেঁধে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ। পরিবারের কাছে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণও দাবি করা হয়। পরে তার ডান হাঁটুতে গুলি করা হয়। চট্টগ্রাম মেড়িকেল কলেজ হাসপাতালে পুলিশ পাহারায় যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ায় তার ডান পা কেটে ফেলতে হয়। গুলিবিদ্ধ হওয়ার এক মাস ২১ দিন হাসপাতালে থাকার পর পা কাটা অবস্থায়ই দুটি অস্ত্র মামলার গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে তাকে আরো ১৭টি মামলায় আসামি দেখানো হয়। মোট ১৯ মামলায় দীর্ঘ ২৩ মাস কারাবন্দি থাকার পর জামিনে মুক্তি পান তিনি।
আটকের ১৯ দিন পর গুলি
সাতকানিয়ার শহিদুল ইসলামকে ২০১৪ সালের ২২ জুলাই ডলু ব্রিজের পশ্চিম পাশ থেকে বাসায় ফেরার পথে প্রশাসনের পরিচয়ে কয়েক ব্যক্তি অপহরণ করে। এরপর ১৯ দিন একটি গোপন স্থানে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। তার দাবি, ওই ঘটনার পেছনে তৎকালীন চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক ড. আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভীর নির্দেশ ছিল। জামায়াতের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণেই তাকে টার্গেট করা হয়।
শহিদুল ইসলাম জানান, ১০ আগস্ট রাতে সাতকানিয়া উপজেলার মাদার্শা ইউনিয়নের আদর্শ গ্রাম এলাকার একটি কবরস্থানে নিয়ে তার পায়ে ছয়টি গুলি করা হয়। পরে গুরুতর আহতাবস্থায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১১ দিন পর তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা রয়েছে।
গুলিতে পা হারান নারী সাজু আক্তার
২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর রাতে ছোট ভাই ওসমানকে আটক করতে গেলে সাজু আক্তার বাধা দেন। তার অভিযোগ, তিনি শ্বশুরবাড়ি থেকে সাতকানিয়ার এওচিয়া ইউনিয়নে বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। এ সময় পুলিশ গুলি চালালে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার বাম পা কেটে ফেলতে হয়।
সাজু আক্তার জানান, তার নিজের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো নিষ্পত্তি হলেও ভাই ওসমানের বিরুদ্ধে দায়ের করা কয়েকটি মামলা এখনো বিচারাধীন।
গুলির পর চার মাস আদালতের বাইরে
চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়তলী এলাকার যুবদলকর্মী ছিলেন মো. আরাফাত। তিনি জানান, ২০১৪ সালের ৭ জানুয়ারি আটক করে নির্যাতনের পর পুলিশ তার বাম পায়ে গুলি করে। পরে চিকিৎসার একপর্যায়ে তার পা কেটে ফেলতে হয়। একই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে দুটি অস্ত্র মামলা দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, গ্রেপ্তারের পর প্রায় চার মাস তাকে আদালতে হাজির না করে নগরীর পাহাড়তলী থানার ওসি ও তার পুলিশ নিজেদের হেফাজতে রেখে চিকিৎসা দেয়। ১২ বছর পর এক মাস আগে বর্তমান সরকার মামলা দুটি প্রত্যাহার করে।
২০২১ সালের ১৬ জুন নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার ছাত্রদল নেতা সাইফুল ইসলামের পায়ে গুলি করে পুলিশ। পরে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পা কেটে ফেলতে হয়।
সাইফুলের মা ২০২২ সালে তৎকালীন বায়েজিদ থানার ওসি কামরুজ্জামানসহ কয়েক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। পরিবারের দাবি, পা কেটে ফেলার পর দীর্ঘ সময় জেলে ছিলেন সাইফুল। জামিনে বের হলেই মামলা দেয় পুলিশ। সাইফুলের বিরুদ্ধে বর্তমানে ৩৩টি মামলা রয়েছে।
পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইন, ২০১৩-এর বিষয়ে জানতে চাইলে মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের পরিচালক এসএস নাসিরউদ্দিন এলান জানান, অধিকার পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন বন্ধের জন্য দীর্ঘদিন আন্দোলন করে আসছিল। সঙ্গে আন্তজাতিক চাপও ছিল। শেখ হাসিনা সরকার বাধ্য হয়ে আইনটি পাস করলেও কোনো প্রয়োগ ছিল না।
তিনি বলেন, কর্তৃত্ববাদী হাসিনা সরকারের এ আইন পাস করা ছিল আইওয়াশ, আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়কে খুশি করা। বরং আইনে যারা মামলা করেছে, তাদের হয়রানি করেছে, এমনকি মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য করেছে। হাসিনা সরকারের পতনের পর যারা এ আইনে মামলা করেছেন, মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব মামলার অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। ভুক্তভোগীরা যেন ন্যায়বিচার পান, সে বিষয়ে সোচ্চার থাকবে তারা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

