বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি জনপদ রূপসীপাড়া ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নে নিভৃতে দ্বীনি আলো ছড়াচ্ছে রূপসীপাড়া ইসলামিয়া এতিমখানা নামের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় এক জান্নাতি টুকরো, যেখান থেকে ভেসে আসে পবিত্র কুরআনের সুর।
কিন্তু ভেতরের গল্পটা অনেক কষ্টের, বুক ফাটানো কান্না আর চরম অবহেলার। নিয়তির নির্মম পরিহাসে এখানে অসহায় ও নিরাশ্রয় শিশুরা সার্বক্ষণিক পড়ালেখা করছে। যাদের মাথার ওপর ছাদ বলতে এই জরাজীর্ণ টিনের ঘর।
প্রতিদিন কেমলমতি ৪৫ জন চির-এতিম দরিদ্র শিশু শিক্ষার্থী লড়াই করছে বেঁচে থাকার ও মানুষ হওয়ার ন্যূনতম অধিকারের জন্য। এছাড়া সীমানাপ্রাচীর না থাকায় নিরাপত্তাহীন পড়ে আছে এসব কোমলমতি শিশু।
গত ১৮ বছর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের শরণাপন্ন হয়েও সংকটের কোনো সমাধান পায়নি মাদরাসা কর্তৃপক্ষ।
এ অবস্থায় এতিমদের শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে দ্রুত পাকা ভবনসহ অন্যান্য সংকট নিরসনে সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন অভিভাবক ও এলাকাবাসী।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রূপসীপাড়া ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষের দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস। এ ইউনিয়নে দ্বীনি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে উদ্যোগ নেন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল জলিল, স্থানীয় মুরুব্বী আবু বক্কর ছিদ্দিক ও আব্দুস ছত্তার ফরাজী।
তারা ১৯৯১ সালের দিকে টিনের ছাউনি ও বেড়ার দুই কক্ষবিশিষ্ট এই এতিমখানা স্থাপন করেন। ১৯৯৩ সালে এতিমখানা সমাজসেবা অধিদপ্তর কর্তৃক নিবন্ধনের পর ক্যাপিটেশন অ্যান্ড গ্র্যান্ড প্রাপ্ত হয়।
শুরুতে এতিমের সংখ্যা কম থাকলেও বর্তমানে ৪৫ জন শিশু অধ্যয়ন করছে। এদের মধ্যে কারো মা নেই, কারো বাবা নেই, আবার কারো কারো মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই। এই এতিমখানায় ক্যাপিটেশন অ্যান্ড গ্র্যান্ডের সুযোগ-সুবিধা পায় মাত্র ১৮ জন, অন্যরা পাচ্ছে না এখনো কোন সরকারি সুবিধা। মাত্র দুজন শিক্ষক নিয়ে চলছে হেফজ ও নূরানি শিক্ষা কার্যক্রম।
সীমানাপ্রাচীর না থাকায় এতিমখানাটির জায়গা বেদখলের পাশাপাশি নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে এতিমখানায় অধ্যয়নরত শিশুরা।

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, এতিমখানাটির কিছু অংশে বেড়া ভেঙে গেছে, আবার কিছু অংশে হয়ে গেছে ছিদ্র। খুঁটিগুলো নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। দরজা-জানালাও ভেঙে পড়েছে। এতে যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে পুরো ঘরটি।
কোনো মতে জোড়াতালি দিয়ে দুই কক্ষবিশিষ্ট ঘরে গাদাগাদি করে মেঝেতে বসেই কুরআন পড়ছে কোমলমতি এতিম শিশুরা। এ সময় শিক্ষার্থী হানজেলা, আলী হাছান ও সাইফুল এক সূরে বলেন, আমাদের এতিমখানাটির অবস্থা খুবই জরাজীর্ণ। টিনের বেড়া ছিদ্র হয়ে গেছে।
রাতে ঘুমাতে ভয় লাগে, কারণ ছিদ্র দিয়ে সাপ ব্যাঙ ঢুকে পড়ে। আর বৃষ্টি হলে তো ঘুমাইতে পারি না। কখন সাপ ব্যাঙ বেশি ঢোকে আর ছাউনির টিন ছিদ্র হওয়ায় পানিও পড়ে। তাই আমরা সরকারের কাছে পাকা ভবন চাই, একটু নিশ্চিন্তে ঘুমাতে চাই।
স্থানীয় সমাজসেবক গুলজার হোসেন, পিন্টু মিয়া ও আবুল হোসেন জানান, রূপসীপাড়া ইসলামিয়া এতিমখানাটি বর্তমানে নিরাপদ নয় শিশু শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য। শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন মৃত্যুঝুঁকি মাথায় নিয়ে ক্লাস করছে, এতে অভিভাবকেরা থাকছেন উদ্বেগে। যেকোনো মুহূর্তে মাদরাসা ভেঙে পড়তে পারে। তারা আরও জানান, এই অবুঝ শিশুদের ভাগ্যের ডায়েরিটা বড় বেশি মলিন। এতগুলো শিশুর একটু শান্তিতে ঘুমানো, বসা কিংবা দুই মুঠো অন্ন মুখে তোলার মতো ন্যূনতম কোনো মানবিক পরিবেশ নেই এখানে।
৪৫ জনের মধ্যে মাত্র ১৮ জন ক্যাপিটেশন অ্যান্ড গ্র্যান্ড সুবিধায় পেলেও বাকি ২৭ জনের দুমুঠো অন্ন জোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে মাদরাসা পরিচালনা কমিটির। তাই পাঠদান স্বাভাবিক রাখতে একটি একাডেমিক ভবন ও বাকি ২৭ জন শিক্ষার্থীর ক্যাপিটেশন অ্যান্ড গ্র্যান্ড খুবই প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
এতিমখানা পরিচালনা কমিটির আলী হোসেনসহ শিক্ষকেরা জানান, আমরা বুকে চাপা কষ্ট নিয়ে এই জরাজীর্ণ ঘরেই বাচ্চাদের দ্বীনি শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছি। সরকারি বা বেসরকারি বড় কোনো অনুদান ছাড়া এই অসহায় শিশুদের মুখে একটু হাসি ফোটানো আমাদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।
একজন শিক্ষক, একটি পাকা ভবন খুবই প্রয়োজন, প্রয়োজন ২৭ অবুঝ শিশুর ক্যাপিটেশন অ্যান্ড গ্র্যান্ড। এছাড়া সীমানাপ্রাচীর না থাকায় আশপাশের লোকজন আস্তে আস্তে এতিমখানার জায়গাও দখলে নিচ্ছে।
নানা সংকটের সত্যতা নিশ্চিত করে এতিমখানা পরিচালনা কমিটির সভাপতি শাখাওয়াতুল ইসলাম বলেন, ‘১৯৯১ সালের দিকে ইউনিয়ন সদরের তিন কিলোমিটারের মধ্যে কোনো মাদরাসা ছিল না। এ কারণে এলাকার স্বার্থে আমার বাবা আব্দুল জলিলসহ অন্য মুরুব্বিরা এই এতিমখানা গড়ে তুলেছিলেন।
মাত্র দুই কক্ষের একটি টিনশেড ঘর দিয়ে যাত্রা শুরু হয়। প্রথম দিকে সমস্যা না হলেও মাদরাসায় উন্নীত হওয়ার পর থেকে শিক্ষার্থী বৃদ্ধি পাওয়ায় আসনের চাহিদা বেড়েছে। গত ১৮ বছর ধরে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের দ্বারে দ্বারে গিয়েও এতিমখানার জন্য একটি পাকা ভবন বরাদ্দ পাইনি। তাই এতিমখানার ভবন, সীমানাপ্রাচীর ও ২৭ শিশুর জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর কর্তৃক ক্যাপিটেশন অ্যান্ড গ্র্যান্ড লাভে এমপি রাজপুত্র সাচিংপ্রু জেরী, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলাসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি।
এ বিষয়ে রূপসীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহা আলম জানান, এতিমখানায় দিনে দিনে শিক্ষার্থী বাড়লেও সুযোগ-সুবিধা বাড়ছে না। বরং নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে এটি। বিশেষ করে স্বল্প জায়গায় গাদাগাদি করে বসে ক্লাস করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। টিনের ছাউনি ও বেড়া জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।
যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই জরুরিভাবে এতিমখানাটির সীমানাপ্রাচীরসহ একটি পাকা ভবন দরকার।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

