নেই স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

দূষিত পানি দিয়েই চলছে রান্নাবান্নার কাজ, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

জহিরুল ইসলাম, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)

দূষিত পানি দিয়েই চলছে রান্নাবান্নার কাজ, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

পাহাড়, সমুদ্র ও শিল্পকারখানাবেষ্টিত চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড পৌরসভায় দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে সুপেয় পানির সংকট। প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হলেও এখনো সেখানে গড়ে ওঠেনি আধুনিক ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, কার্যকর স্যানিটেশন ট্রিটমেন্ট ব্যবস্থা কিংবা পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। ফলে পৌর এলাকার হাজারো মানুষ বাধ্য হয়ে আর্সেনিক ও আয়রনযুক্ত ভূগর্ভস্থ পানি এবং দূষিত পুকুরের পানি ব্যবহার করছেন। এতে বাড়ছে চর্মরোগ, পানিবাহিত রোগ, আর্সেনিকোসিস ও ক্যান্সারসহ নানা জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সীতাকুণ্ড পৌরসভার নাগরিক ব্যবস্থাপনা এখন চরম অব্যবস্থাপনায় পরিণত হয়েছে। নিরাপদ পানির অভাবে বহু পরিবার বাধ্য হয়ে আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছে। অনেকে সেই পানি দিয়েই রান্নাবান্না ও দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে পৌর এলাকায় কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় বাসাবাড়ি, হোটেল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য সরাসরি পুকুর, দিঘি ও জলাধারে গিয়ে পড়ছে। এতে প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী জলাধারগুলো।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিনে পৌর সদরের লালদীঘি, কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ সংলগ্ন দিঘি ও বিভিন্ন পুকুরে দূষণের ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, অনেক স্থানে সেপটিক ট্যাংকের পাইপ সরাসরি জলাধারের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। কোথাও পানির রং পরিবর্তন হয়েছে, কোথাও সৃষ্টি হয়েছে তীব্র দুর্গন্ধ। একসময় যেসব দিঘির পানি রান্নাবান্না ও দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করা হতো, এখন সেগুলোর অনেকগুলোই প্রায় ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

পৌর এলাকার বহু পরিবার এখনো রান্না ও গৃহস্থালি কাজে পুকুরের পানির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে রেলওয়ের ঢেভার বড় পুকুরটি এখন অনেকের শেষ ভরসা। প্রতিদিন ভোর থেকে নারী-পুরুষকে কলসি, বালতি ও ড্রাম নিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে পানি সংগ্রহ করতে দেখা যায়। সদরের অনেকগুলো হোটেল ও খাবারের দোকানও ওই পুকুরের পানি রান্নার কাজে ব্যবহার করছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, একদিকে ভূগর্ভস্থ পানিতে অতিরিক্ত আর্সেনিক ও আয়রনের উপস্থিতি, অন্যদিকে উন্মুক্ত জলাধার দূষিত হয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষ চরম বিপাকে পড়েছেন। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে।

সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন আমার দেশকে বলেন, টানা পাঁচ থেকে ছয় মাস বেশি আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করলে আরসেনিকোসিস রোগ হতে পারে। এতে ত্বকের মারাত্মক ক্ষতির পাশাপাশি স্কিন ক্যান্সারের ঝুঁকিও থাকে।

তিনি জানান, দীর্ঘদিন আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করলে শরীরে কালো দাগ, ত্বক মোটা হয়ে যাওয়া, হাত-পায়ে জ্বালাপোড়া, চর্মরোগ, নিউরোপ্যাথি, ফুসফুস ক্যান্সার, ব্লাডার ক্যান্সার ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। এছাড়া দূষিত পানি পান করলে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, কলেরা, হেপাটাইটিস-এ ও হেপাটাইটিস-ই এর মতো পানিবাহিত রোগ দেখা দিতে পারে। প্রতি মাসে গড়ে ২০ থেকে ৩০ জন রোগী এসব সমস্যায় হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করে দোয়াগাজী এলাকা থেকে দুইজন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সীতাকুণ্ড কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী প্রনবেশ মহাজন আমার দেশকে বলেন, বর্তমানে উপজেলায় ইলেকট্রিক রিগ বোরিংয়ের মাধ্যমে গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ চলছে। তবে পৌর এলাকায় ভূতাত্ত্বিক জটিলতার কারণে অনেক স্থানে ডিপ টিউবওয়েল বসানো সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন পৌরসভায় ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও ফিক্যাল স্লাজ ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনের মাধ্যমে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে। সীতাকুণ্ড পৌরসভা যথাযথভাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আবেদন করলে এখানেও এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সীতাকুণ্ডে দীর্ঘমেয়াদি পানি সংকট নিরসনে পাহাড়ি ছড়া ও বর্ষার পানি সংরক্ষণের বিকল্প নেই। বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢলে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ পানি পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ ও পরিশোধনের মাধ্যমে পৌর এলাকায় সরবরাহ করা গেলে স্থায়ী সমাধান মিলতে পারে।

তাদের দাবি, অবিলম্বে দূষিত দিঘি ও পুকুর পুনঃখনন ও পরিষ্কার, অবৈধ ড্রেন সংযোগ বিচ্ছিন্ন, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত, আধুনিক ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন এবং নিরাপদ সুপেয় পানির স্থায়ী সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী জলাধারগুলোকে দখল ও দূষণমুক্ত রেখে আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনার আওতায় আনারও দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে পৌরসভার মেয়রের দায়িত্বে থাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

তবে পৌরসভার পিএনও নজরুল ইসলাম ও নির্বাহী প্রকৌশলী নুর নবী আমার দেশকে বলেন, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য কমপক্ষে এক একর জায়গা প্রয়োজন। উপযুক্ত জায়গা না পাওয়ায় এখনো পৌরসভায় ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণ সম্ভব হয়নি।

তারা আরও বলেন, বাসাবাড়ি ও হোটেলের ময়লা পুকুরে ফেলার বিষয়টি নজরে এসেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নোটিশ দেওয়া হবে যাতে কোনোভাবেই সেপটিক ট্যাংকের ময়লা বা আবর্জনা পুকুরে ফেলতে না পারে। যারা পুকুরের পানি দূষিত করছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন