কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ঐতিহাসিক সমৃদ্ধ জনপদ ময়নামতির সমেষপুর গ্রাম। সারা দেশে চারা উৎপাদনের শীর্ষে থাকা এই গ্রামের শ্রমনির্ভর কৃষকদের পরিশ্রমের পথচলা প্রায় ৪ দশকেরও বেশি সময় ধরে। আগাম শীতকালীন চারার পাশাপাশি বারো মাসই এখানে উৎপাদন হচ্ছে বিভিন্ন তরিতরকারির চারা'।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে গ্রিন হাউসের আদলে পলি নেট পদ্ধতিতে কোকোপিট ব্যবহার করে প্লাস্টিকের ট্রেতে সফলভাবে লাখ লাখ চারা উৎপাদনেএবং বিক্রিও করা হচ্ছে। তবে কৃষকদের আক্ষেপ, অনেক ব্যয়বহুল হওয়ায় খুব একটা লাভের মুখ দেখছেন না তারা।
বিগত উনিশ শতকের ৮০-র দশকের শুরুতে অনেকটা বড় পরিসরে বুড়িচংয়ের ময়নামতির সমেষপুর গ্রামে চারা উৎপাদনের সূচনা। অনেকটা উঁচু জমিতে শীতকালীন আগাম শাক-সবজি, তরিতরকারির চারা উৎপাদন শুরু হয়। যাতায়াত ও যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত না হওয়ায় প্রথম দিকে বুড়িচং, আদর্শ সদর দক্ষিণ, চান্দিনা, দেবিদ্বার, মুরাদনগর, বরুড়াসহ পুরো জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকেরা চারা সংগ্রহে এখানে আসতেন।
-9fd51c.jpg)
পরবর্তীকালে জেলা পেরিয়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত ছাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বিভিন্ন জনপদেও এখানকার চারা বিক্রি হতো এবং এখনো হচ্ছে। মূলত জুলাইয়ের শেষ থেকেই ময়নামতির সমেষপুরে বিশেষ করে ফুল ও বাঁধাকপির চারা বিক্রি শুরু হয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সমেষপুর এলাকাসহ আশপাশের কমপক্ষে ৪০ একরেরও বেশি জমিতে কপি চারা উৎপাদন হচ্ছে। ১২ ফুট লম্বা ও ৪ ফুট গ্রস্থ একেকটা বিটে আড়াই থেকে ৩ হাজার চারা উৎপাদন হচ্ছে। এ রকম কয়েক হাজার বিট রয়েছে গ্রামটিতে। বিক্রি শেষ হলেই আবারও শুরু হয় বীজ রোপণের প্রতিযোগিতা।
সমেষপুর এলাকার শতাধিক পরিবার বর্তমানে চারা উৎপাদন করছে। এখান থেকে প্রতি মৌসুমে কমপক্ষে ১০-১২ কোটি চারা বিক্রয় হচ্ছে । জমিতে চারা উৎপাদন অপেক্ষাকৃত কম হলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিশেষ করে অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা অনেক সময় কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়েও দাঁড়ায়।
আর এসব চিন্তা করে অতি সম্প্রতি সমেষপুর এলাকায় প্রবাসফেরত যুবক হোসাইন রাব্বি অনেকটা চ্যালেঞ্জ নিয়ে পলিনেট পদ্ধতিতে প্লাস্টিকের ট্রেতে কোকোপিট ব্যবহার করে চারা উৎপাদন করছেন । ঝুঁকি নিয়ে সফলতার মুখ দেখছেন।
মাঠেই কথা হয় রাব্বি ও তার বাবা আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তারা জানান, ঝড়, টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতায় অনেক সময় জমিতে থাকা চারা নষ্ট হয়ে যায়। কখনো রোগাক্রান্ত হচ্ছে, কীটনাশকের ব্যবহার করতে হচ্ছে। কিন্তু পলিনেট এ কোকোপিট পদ্ধতির চারা উৎপাদন একেবারেই ঝুঁকিমুক্ত।
আনোয়ার হোসেন জানান, প্রথম অবস্থায় অভিজ্ঞতা না থাকায় থাইল্যান্ড থেকে অনলাইনে কোকোপিট আমদানি করলেও এখন স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করছে। এই পদ্ধতির চাষাবাদের সুবিধা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বারো মাস একইভাবে চারা উৎপাদন ও বিক্রয় করতে পারছেন। তবে তাদের আক্ষেপ গ্রিন হাউসের আদলে গড়া পলিনেট এ কোকোপিট দ্বারা চারা উৎপাদনের খরচে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তারা ছুটে আসেন তাদের মাঠে। এ সময় সরকারিভাবে সহযোগিতার আশ্বাসসহ নানা স্বপ্ন দেখান সরকারি কর্মকর্তারা। তবে সেই আশা আর বাস্তবে প্রতিফলন ঘটে না।
আনোয়ার হোসেন ও রাব্বি আরো জানান, এই পদ্ধতিতে উৎপাদন বেশ ব্যয়বহুল। বাঁশ, পলিথিনসহ কাঠের ব্যবহারে প্রতিটি শেড নির্মাণে কমপক্ষে ১৪ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। তারা আরো জানান, একটি ট্রেতে ১২৮-১৩০টি চারা উৎপাদন হচ্ছে। বর্তমানে সমেষপুর, সিন্দুরিয়াপাড়া এলাকায় পুলিনেট পদ্ধতিতে কোকোপিট ব্যবহার করে চারা উৎপাদন করছে এমন প্রায় ৬০টি পলিনেট রয়েছে, যেখানে এ বছর কমপক্ষে ১২ লক্ষাধিক চারা বিক্রির আশা করছেন তারা।
উল্লেখ্য, মাটিতে উৎপাদিত চারার তুলনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোকোপিট চারার বাজারমূল্য একটু বেশি। বর্তমানে কোকোপিট প্রতিটি ফুলকপি জাতভেদে দেড় থেকে ৩ টাকা, বাঁধাকপি দেড় থেকে ২ টাকা, মরিচ আড়াই থেকে ৩ টাকা, টমেটো আড়াই থেকে ৩ টাকা, লাউ প্রতিটি ১৫ টাকা, বেগুন আড়াই থেকে ৩ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ময়নামতি এলাকায় কোকোপিট ব্যবহার করে চারা উৎপাদনে সরকারি সাহায্য বা সহযোগিতা দিচ্ছে কি না জানতে চাইলে কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ডিডি মিজানুর রহমান বলেন, কৃষকদের পরামর্শও প্রশিক্ষণ দেওয়া ছাড়া আপাতত কিছু করার নেই।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

