জ্বালানি সংকটে লাইটার জাহাজ চলছে না বললেই চলে। এই লাইটার জাহাজের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থান করা বিদেশি মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস করে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কেন্দ্র করে এক হাজার ২০০ লাইটার জাহাজ চলাচল করলেও জ্বালানি সংকটে এ সংখ্যা নেমে এসেছে অর্ধেকে। হাতেগোনা যে কয়েকটি লাইটার চলছে, তাও চট্টগ্রাম থেকে বড়জোর ঢাকা পর্যন্ত যাতায়াত করছে। দূরের নৌরুটগুলোতে জাহাজ নেই বললেই চলে।
বড় কোম্পানি কিংবা প্রভাবশালী মালিকের জাহাজগুলো সামান্য তেল জোগাড় করতে পারলেও গত দেড় মাসের বেশি সময় ধরে অধিকাংশ লাইটারই চলছে না। ফলে বহির্নোঙরে অবস্থান করা মাদার ভেসেলগুলো থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন বাজারে নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে ঠিক সময়ে পণ্য আনলোড করে জাহাজ ছাড়তে না পারায় প্রতিদিন হাজার হাজার ডলার জরিমানা গুনতে হচ্ছে আমদানিকারকদের।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, ভরা জোয়ারে চট্টগ্রাম বন্দরে জেটির সামনে ড্রাফট থাকে সাড়ে ৯-১০ মিটার। এর থেকে বেশি বড় জাহাজ বন্দর চ্যানেলে প্রবেশ করতে পারে না। কিন্তু খোলাপণ্য বহনকারী বিদেশি মাদার ভেসেলগুলোর বেশির ভাগই নির্ধারিত ড্রাফট মিটারের চেয়ে বড়। এ কারণে গভীর সাগর বা বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থান করে জাহাজগুলো। সেখান থেকে নির্ধারিত শিডিউল ধরে ছোট আকারের লাইটার জাহাজে পণ্য খালাস করে নিয়ে যাওয়া হয় বিভিন্ন গন্তব্যে।
সাধারণত বাল্কপণ্য হিসেবে পরিচিত গম-ভুট্টা-চালসহ খাদ্যপণ্য-কয়লা-সার-সিমেন্ট ক্লিংকার-চিনি-লোহার স্ক্র্যাপ খালাস হয় চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে। এক হাজার ২০০ লাইটার জাহাজ ঘুরেফিরে বহির্নোঙর থেকে বছরে ১২ কোটি টন বাল্কপণ্য হ্যান্ডলিং করে। এর মধ্যে শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আমদানি করা কয়লা পরিবহনের প্রতি মাসে প্রয়োজন হয় ৪০০-৪২০ লাইটার জাহাজ।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধপরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য আনা কয়লা খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে প্রায় দেড় লাখ টন কয়লাভর্তি তিনটি মাদার ভেসেল অলস ভাসছে। লাইটার জাহাজ সংকটে খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না। মাদার ভেসেলগুলো অলস দাঁড়িয়ে থাকায় প্রতিদিন জাহাজভেদে ১৫-২৫ হাজার ডলার ডেমারেজ চার্জ পরিশোধ
করতে হচ্ছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে। এতে উদ্বেগ জানিয়ে বিপিসি ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে চিঠিও পাঠিয়েছে বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড কর্তৃপক্ষ।
প্রতিষ্ঠানটি জানায়, পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় অবস্থিত ১৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য আমদানি করা কয়লা গন্তব্যে নেওয়ার জন্য প্রতি মাসে ১৭০টি লাইটার জাহাজের ট্রিপ প্রয়োজন। প্রতি ট্রিপে সাড়ে পাঁচ হাজার লিটার করে ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। সে হিসাবে প্রতি মাসে শুধু এই একটি প্রতিষ্ঠানের কাঁচামালের জোগান ঠিক রাখতে হলে ৯ লাখ ৩৫ হাজার লিটার ডিজেলের প্রয়োজন। ডিজেল সংকটে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাঁচামাল সরবরাহে নিয়োজিত তিনটি প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো সার্ভিস দিতে পারছে না। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সচল রাখতে হলে চাহিদামতো ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এমন একাধিক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন ও সেবার মান ঠিক রাখতে লাইটার জাহাজের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে একাধিক চিঠি দিয়েছে বিপিসিকে।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য বলছে, গত শনিবার বন্দরের জলসীমায় ১০০ মাদার ভেসেল ছিল। স্বাভাবিক সময়ে থাকে ৫০-এর আশপাশে। জেটিতে ১৫টি আর বহির্নোঙরে আছে ৮১ মাদার ভেসেল। এর মধ্যে ৫৪টি জাহাজ থেকে পণ্য খালাস চলছে। অপেক্ষায় আছে ২৭টি। যে ৫৪টি জাহাজে খালাস চলছে, সেখানেও রয়েছে ধীরগতি। কারণ একটি মাদার ভেসেলে পুরোদমে পণ্য খালাস করতে হলে একসঙ্গে চারটি করে লাইটারের প্রয়োজন পড়ে। সেখানে কোনোটিতে একটি, আবার কোনোটিতে সর্বোচ্চ দুটি করে লাইটার সরবরাহ করা হয়েছে। এতে পণ্য খালাসের গতি কমছে আশঙ্কাজনকভাবে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন জানান, লাইটার জাহাজের সংকটের কারণে বহির্নোঙরে জটের অবস্থা তৈরি হতে চলেছে। ভেঙে পড়েছে অভ্যন্তরীণ নৌরুটে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাপনা। চট্টগ্রাম বন্দরে যে পরিমাণ পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয় তার ৮০ শতাংশই পরিচালিত হয় বহির্নোঙরে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে। বর্তমানে এই সংকটে অনেক প্রতিষ্ঠান তেল সরবরাহের জন্য মন্ত্রণালয়ে পর্যন্ত তদবির করছে। নিজেদের আনা পণ্যকে গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি করা হচ্ছে। মূলত আমদানি করা প্রতিটি পণ্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি জাহাজ কম গুরুত্বপূর্ণ বলে খালাস না করলে জাহাজের আকারভেদে দৈনিক ১৫-৪০ হাজার ডলার পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হয়। তারপরও খাদ্যপণ্য ও কয়লা পরিবহনে নিয়োজিত লাইটারগুলোকে তুলনামূলক বেশি তেল সরবরাহ করা যেতে পারে। কিন্তু অন্যান্য পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত লাইটারগুলোতেও রেশনিং করে চালিয়ে নিতে হবে। আর এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হলে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট টিম করতে হবে। ওই টিমই প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ করে সমুদ্র বাণিজ্য টিকিয়ে রাখবে। নাহলে জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারেও দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে।
লাইটার জাহাজ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআইডব্লিউটিসির মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ জানান, প্রতিটি লাইটার জাহাজে যে পরিমাণ জ্বালানির প্রয়োজন, তার অর্ধেকও মিলছে না। এ কারণে আমাদের হাতে পর্যাপ্ত লাইটার থাকার পরও সেগুলো কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এতে লাইটার জাহাজ কর্তৃপক্ষ ও আমদানিকারক উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগে ২০ হাজার টনের একটি জাহাজ খালাস করে নোঙর তুলতে যে পরিমাণ সময় লাগত, এখন তার থেকে ৪-৫ দিন করে বেশি লাগছে। এতে প্রতিটি জাহাজে অতিরিক্ত জরিমানা গুনতে হচ্ছে।
তিনি আরো জানান, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অস্থিরতার কারণে অনেক আমদানিকারক তাদের প্রয়োজনীয় এলসি করেনি। তাই স্বাভাবিক সময়ে যে পরিমাণ জাহাজের আনাগোনা ছিল, এখন তা নেই। আগের মতো জাহাজের আনাগোনা থাকলে অনেক আগেই ভয়াবহ জটের কবলে পড়ত চট্টগ্রাম বন্দর। এই ঝুঁকি এড়াতে চাইলে দ্রুত সময়ের মধ্যে জ্বালানির সংকট কমাতে হবে।
লাইটার জাহাজে জ্বালানি সরবরাহের ব্যাপারে বক্তব্য জানতে বিপিসির একাধিক কর্মকর্তাকে ফোন করলেও কেউ বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে জিএম পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পর্যাপ্ত তেলের জোগান আসলেই নেই। যা আছে তাই দিয়ে ভূ-উপরিভাগের দৃশ্যমান সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করা হচ্ছে। যুদ্ধের প্রভাব না কমলে এক কথায় পর্যাপ্ত তেলের চালান না আসা পর্যন্ত সমুদ্রের সংকট কমানো সম্ভব হবে না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

