গ্রাহকের ছয় কোটি টাকা নিয়ে উধাও সমবায় সমিতি

মধ্যনগর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি

গ্রাহকের ছয় কোটি টাকা নিয়ে উধাও সমবায় সমিতি

বেশি মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে সুনামগঞ্জের মধ্যনগরে গ্রাহকদের প্রায় ছয় কোটি টাকা আত্মসাৎ করে আত্মগোপনে চলে গেছে ‘মধ্যনগর রূপসী বাংলা সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শিক্ষক, শ্রমজীবীসহ নানা পেশার মানুষ পড়েছেন চরম বিপাকে।

জানা গেছে, ২০২২ সালে জেলা সমবায় অফিস থেকে নিবন্ধন নিয়ে মধ্যনগর বাজারে কার্যক্রম শুরু করে সমিতিটি। স্থানীয়ভাবে কর্মী নিয়োগ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালনা করতেন নেত্রকোনার সদর উপজেলার ১০ নম্বর রৌহা ইউনিয়ের কুমরী গ্রামের হাফেজ এরশাদুর রহমানের ছেলে রফিকুল ইসলাম ও মধ্যনগরের স্থানীয় বাসিন্দা ডাক্তার স্মৃতিভূষণ করের ছেলে অমিয় ভূষণ কর মন্টু। শুরু থেকেই তারা গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে অস্বাভাবিক উচ্চ মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডিপিএস ও সঞ্চয় সংগ্রহ করতেন।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ রয়েছে, নানা কৌশলে সাধারণ মানুষকে প্রলুব্ধ করে বিপুল অঙ্কের টাকা সংগ্রহের পর প্রায় দুই মাস আগে হঠাৎ করেই গা ঢাকা দেন সমিতির দুই মালিক। এরপর থেকে তাদের কোনো খোঁজ মিলছে না। টাকা ফেরতের আশায় গত ১৯ এপ্রিল বিকালে প্রতারিত গ্রাহকেরা মানববন্ধন করে দ্রুত অর্থ উদ্ধারে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

মানববন্ধনে বক্তারা জানান, সমিতির মালিকরা বিভিন্ন স্থানে আরো তিনটি শাখা খুলে বিপুল অর্থ লেনদেন করতেন। একপর্যায়ে গ্রাহকদের ডেকে একটি বৈঠকে তারা স্বীকার করেন, এ শাখায় গ্রাহকদের কাছে তাদের পাওনা প্রায় ৮০ লাখ টাকা হলেও গ্রাহকদের দেনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ছয় কোটি টাকা। সম্পদ বিক্রি করে দ্রুত টাকা পরিশোধের আশ্বাস দেওয়ার পরপরই তারা উধাও হয়ে যান।

প্রতারিতদের মধ্যে মধ্যনগর বাজারের সেলুনকর্মী শক্তি ঋষি জানান, জীবনের সব সঞ্চয় ৯ লাখ টাকা জমা রেখে এখন তিনি নিঃস্ব। টাকা ফেরত না পেলে তার বাঁচার পথও থাকবে না বলে জানান।

লাকী তালুকদার বলেন, বাবার মৃত্যুর পরে বোনের বিয়ের জন্য জমানো দুই লাখ টাকা এ সমিতিতে জমা রেখেছিলেন। ছয় মাস আগে টাকা আনতে কয়েকবার গেলেও টাকা ফেরত না পেয়ে উল্টো রফিকের হুমকির শিকার হয়েছেন তিনি। এখন বোনকে নিয়ে চরম বেকায়দায় পড়েছেন।

ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন জানান, তার মাকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ১০ লাখ টাকা জমা করতে আকৃষ্ট করেন প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মন্টুভূষণ কর। তিনিও এ সমিতিতে প্রতিদিন পাঁচশ করে জমিয়ে দুই লাখ টাকা সঞ্চয় করেছিলেন। তার পরিবারের জমানো মোট ১২ লাখ টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেছে এনজিওটি। এখন ব্যবসা চালিয়ে যেতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি।

মধ্যনগর বাজারে ভ্যানে করে শিঙাড়া-পুরি বিক্রি করেন অঞ্জন তালুকদার। তিনিও লাভের আশায় তার জীবনের সব জমানো চার লাখ টাকা রেখেছিলেন এ সমিতিতে। সেই টাকা ফেরত না পাওয়ায় পরিবার নিয়ে চলা মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে তার।

এছাড়া ব্যবসায়ী জুয়েল রায় ২৭ লাখ, কবি আকিকুর রহমান ১০ লাখ, শিক্ষক সমীরণ তালুকদার আট লাখ, ব্যবসায়ী চয়ন সরকার আট লাখ, প্রবীর তালুকদার ছয় লাখ, সাগর রায় আট লাখ, বিধুভূষণ রায় দুই লাখ, বুলু রায় ছয় লাখ, মৃদুল সরকার চার লাখ, সুজিত রায় দুই লাখ, অমল সরকার পাঁচ লাখ, জীবন চক্রবর্তী তিন লাখ, দুলু দত্ত ১০ লাখসহ পাঁচশতাধিক গ্রাহক তাদের সঞ্চিত অর্থ হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।

মধ্যনগর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি মো. আবুল বলেন, ‘এলাকার বহু মানুষ এ প্রতারণার শিকার হয়েছেন। আমরা প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মন্টুভূষণ করকে না পেয়ে তার ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। তিনি আমাদের কোনো সদুত্তর দেননি। আমরা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেব।’ তিনি আরো জানান, একই এলাকায় ‘পল্লীবন্ধু’ নামে আরেকটি এনজিও গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেই-দিচ্ছি বলে ঘুরাচ্ছেÑ এমন অভিযোগও আছে। এসব এনজিওকে কঠোর নজরদারির আওতায় নিতে আমি প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

এ বিষয়ে মধ্যনগর সমবায় কর্মকর্তা শামছুল ইসলাম বলেন, ‘সমিতিটি সঠিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে তাদের নিবন্ধন বাতিল করা হয়। এরপর তারা গোপনে কার্যক্রম চালালেও সে বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য ছিল না।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...