স্বর্ণযুগের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও দার্শনিক আলফারাবি

মোশাররফ হোসাইন

স্বর্ণযুগের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও দার্শনিক আলফারাবি

তুর্কিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সির দরিয়া নদী ও আরিস নদীর মিলনস্থলের কাছেই অবস্থিত ফারাব শহর। এই শান্ত ও মনোরম শহরে ৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে বিখ্যাত দার্শনিক, যুক্তিবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও কবি আবু নসর মুহাম্মদ আলফারাবি জন্মগ্রহণ করেন । তার বাল্যকাল এবং পারিবারিক জীবন সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য জানা যায় না।

আলফারাবি একাধারে ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, চিকিৎসা, রসায়ন, কবিতা ও সংগীতে অগাধ পাণ্ডিত্য ও পারদর্শিতা রাখতেন। বাল্যকালে ফারাব শহরেই তিনি প্রথামিক শিক্ষাজীবন শুরু করেন। সেখান থেকে বিদ্যার্জন শেষ করে কিছুদিন সামানী সালতানাতের শাসনাধীন বোখারায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু অদম্য জ্ঞানস্পৃহার কারণে বোখারা ছেড়ে তিনি তৎকালীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্রভূমি বাগদাদে চলে আসেন।

বিজ্ঞাপন

বাগদাদের বিখ্যাত ভাষাতাত্ত্বিক ও ব্যাকরণবিদ আবু বকর ইবনে সাররাজের কাছ থেকে আরবি ভাষার ব্যাকরণ শেখেন। তৎকালীন শিক্ষার ধারা অনুযায়ী বিখ্যাত উস্তাদদের থেকে গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, দর্শন, যুক্তিশাস্ত্র ও চিকিৎসাশাস্ত্রের ওপর গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। সংগীতশাস্ত্রে তার অত্যন্ত অনুরাগ ছিল। তবে বহুবিদ্যা-বিশারদ হলেও ফারাবি মূলত শ্রেষ্ঠ দার্শনিক হিসেবেই পৃথিবীর ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

বাগদাদে অবস্থানকালে আলফারাবি অ্যারিস্টটলের তর্কশাস্ত্র ও দর্শনের ওপর বিস্তৃত ভাষ্য রচনা করেন এবং একই সঙ্গে নিজের দর্শনচিন্তার ওপর মৌলিক গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের দর্শনের ব্যাখ্যায় তার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ কারণেই পরবর্তী যুগের দার্শনিকদের ওপর তার প্রভাব গভীর ও সুদূরপ্রসারী।

রাষ্ট্রনীতিতেও আল ফারাবির অসাধারণ দক্ষতা ছিল। অনেক বোদ্ধা তাকে মুসলিম রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক মনে করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে তার মৌলিক নীতিমালা সংক্ষেপে তুলে ধরা কঠিন হলেও এ বিষয়ে তার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ আজও পরিচিত, যেমন আস সিয়াসাতুল মাদানিয়া (السّياسة المدنيّة ), আরাউ আহলিল মাদিনাতিল ফাজিলাহ (آراء أهل المدينة الفاضلة ) প্রভৃতি।

তুর্কিস্তানে অবস্থানকালে আলফারাবি স্থানীয় শাসক আলি সামানি (শাসনকাল : ৮৯২ খ্রি. - ৯০৭ খ্রি.)-এর অনুরোধে ‘আততালিমুস সানি’ গ্রন্থ রচনা করেন। তার সর্ববৃহৎ দর্শনগ্রন্থ ‘ইহসাউল উলুম’ আজও দার্শনিক জগতে প্রভাব বিস্তার করে আছে।

আলফারাবি বেশিদিন তুর্কিস্তানে থাকতে পারেননি; জন্মভূমি ছেড়ে তিনি সিরিয়ার দামেশকে আসেন। কিছুদিন পর তিনি মিসরে গিয়ে কয়েক বছর অবস্থান করেন, তারপর আবার দামেশকে ফিরে আসেন এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন।

৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে হামদানি শাসনবংমের প্রখ্যাত শাসক আলেপ্পোর আমির সাইফুদদৌলা হামদানি (শাসনকাল : ৯৪৪ খ্রি.-৯৬৭ খ্রি.) সিরিয়া দখল করেন এবং আলেপ্পোকে রাজধানী করেন। অল্প সময়েই শহরটি জ্ঞান-বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়।

এই সময়ে একদিন আলফারাবি মুসাফিরের বেশে আমির সাইফুদদৌলার দরবারে গিয়ে উপস্থিত হন। পূর্বপরিচিতির ফলে আমির হামদানি আলফারাবিকে অত্যন্ত সমাদর করেন। তিনি দরবারের উচ্চপদ ও অধিক বেতন তাকে দিতে চাইলেন। কিন্তু ফারাবি আমিরের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এর বদলে তিনি আমিরের কাছে দৈনিক চারটি দিরহাম এবং একটি নির্জন কুটির প্রার্থনা করেন। আমির সাইফুদদৌলা তার আবেদন মঞ্জুর করেন। ৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে আমির সাইফুদদৌলা দামেশক আক্রমণের সময় ফারাবিকে সঙ্গে নেন। কিন্তু জীর্ণদেহের বয়োবৃদ্ধ আলফারাবি সফরের ক্লান্তি সহ্য করতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। দামেশকে উপস্থিত হওয়ার কিছুদিন পরেই জ্ঞানবিজ্ঞানের জগতের এই মহান আলোকবর্তিকা ইন্তেকাল করেন। তাকে উমাইয়া বংশের পারিবারিক কবরস্থানে মুআবিয়া (রা.)-এর পাশে দাফন করা হয়।

মোহাম্মদ আলফারাবি হাজার বছরেরও আগে ইন্তেকাল করেছেন। কিন্তু কালের স্রোত তার দর্শন ও যুক্তিশাস্ত্রের দীপ্তি ম্লান করতে পারেনি। তার কাব্যদর্শন ও সংগীতচিন্তা আজও বিশ্বসাহিত্য ও মানুষের চিন্তাজগতে গভীর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন