করতলব খান মসজিদ

মোগল স্থাপনায় দাক্ষিণাত্যের ছাপ

এমডি হাবিবুল্লাহএমডি হাবিবুল্লাহ

মোগল স্থাপনায় দাক্ষিণাত্যের ছাপ

পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে করতলব খান মসজিদ একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। মোগল আমলে নির্মিত এই মসজিদটি শুধু ধর্মীয় ইবাদতখানাই, বরং বাংলার স্থাপত্য ঐতিহ্যের অনন্য সাক্ষ্য। এর ব্যতিক্রমধর্মী নকশা, পাঁচ গম্বুজের কাঠামো এবং বিরল ‘বাওলি’ বা ধাপকূপ একে দেশের অন্যান্য মসজিদ থেকে আলাদা করেছে।

মসজিদটি পুরান ঢাকার বেগমবাজার এলাকায় অবস্থিত। এটি ‘বেগমবাজার মসজিদ’ নামেও পরিচিত। মসজিদটি ১৭০১ থেকে ১৭০৪ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে নির্মিত হয়। এর নির্মাতা ছিলেন মুর্শিদকুলী খান। তাকে সম্রাট আওরঙ্গজেব ১৭০০ সালে সুবে বাংলার দেওয়ান নিযুক্ত করেন। তিনি মোগল প্রশাসনের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ছিলেন এবং সুবেদারের দায়িত্ব নেওয়ার পরে বাংলার ইতিহাসে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।

বিজ্ঞাপন

বাংলায় আগমনের আগে তিনি দীর্ঘ সময় দাক্ষিণাত্যে কর্মরত ছিলেন। গবেষকদের মতে, সেই অঞ্চলের স্থাপত্যধারার প্রভাব এই মসজিদের কিছু বৈশিষ্ট্যে, বিশেষ করে এর বাওলি বা ধাপকূপে প্রতিফলিত হয়েছে।

‘তলবমাত্র কর আদায়ে’র যোগ্যতার কারণে তাকে করতলব খান নামেও ডাকা হতো। তাই তার নির্মিত মসজিদটিকে বলা হয় করতলব খান মসজিদ। পরবর্তীকালে এলাকাটি বেগমবাজার নামে পরিচিত হওয়ায় স্থানীয়দের কাছে এটি বেগমবাজার মসজিদ নামেও পরিচিতি লাভ করে।

তখন বাংলার দেওয়ান ছিলেন মুর্শিদকুলী খান।

করতলব খান মসজিদ মোগল স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত হলেও এতে কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। মসজিদটি একটি উঁচু প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্মিত এবং এর ছাদে পাঁচটি গম্বুজ রয়েছে। কেন্দ্রীয় গম্বুজটি তুলনামূলকভাবে বড় আর চারপাশের গম্বুজগুলো অপেক্ষাকৃত ছোট।

মসজিদের চার কোনায় অষ্টভুজাকৃতির টাওয়ার রয়েছে, যা ভবনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। পূর্বপাশে পাঁচটি খিলানযুক্ত প্রবেশপথ এবং পশ্চিম দেয়ালে পাঁচটি মিহরাব নির্মিত হয়েছে। পুরো স্থাপনাটি ইট, বালু ও চুনের সমন্বয়ে নির্মিত।

মসজিদের উত্তর পাশে একটি দোচালা ঘরের মতো রয়েছে, যার নকশায় বাংলার ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ কুঁড়েঘরের ছাপ দেখা যায়। এছাড়া মসজিদের সঙ্গে সংযুক্ত বাওলি বা ধাপকূপটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি বাংলার মসজিদ স্থাপত্যে অত্যন্ত বিরল এবং অনেক গবেষকের মতে, এ ধরনের স্থাপত্য উপাদান দাক্ষিণাত্যের প্রভাব বহন করে।

অলংকরণের ক্ষেত্রে মসজিদটিতে অতিরিক্ত জাঁকজমকের পরিবর্তে স্থাপত্য সৌন্দর্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গম্বুজ, খিলান, মিনার, মিহরাব এবং বিভিন্ন আলংকারিক উপাদান মিলে ভবনটিকে একটি সুষম ও নান্দনিক রূপ দিয়েছে।

তিন শতাব্দীরও বেশি পুরোনো করতলব খান মসজিদ ঢাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং মোগল স্থাপত্যের এক মূল্যবান স্মারক। এর অনন্য স্থাপত্যরীতি, বিরল বাওলি এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব একে শুধু একটি ইবাদতখানা নয়, বরং বাংলাদেশের স্থাপত্য ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনে পরিণত করেছে। আজও এটি পুরান ঢাকার অতীত গৌরবের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...